Logo

গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে রূপগঞ্জের শিল্পকারখানায় নেমেছে উৎপাদন ধস

profile picture
উপজেলা প্রতিনিধি
রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ
২৪ আগস্ট, ২০২৬, ১৪:২৯
গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে রূপগঞ্জের শিল্পকারখানায় নেমেছে উৎপাদন ধস
ছবি: প্রতিনিধি

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে বিপাকে পড়েছে শিল্পকারখানাগুলো। প্রয়োজনীয় গ্যাসের চাপ না থাকায় অনেক কারখানায় উৎপাদন কমিয়ে দিতে হচ্ছে। এর সঙ্গে ঘনঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও লো-ভোল্টেজ যুক্ত হওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে মেশিনের স্বাভাবিক কার্যক্রম। ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় লোকসানের আশঙ্কায় পড়েছেন শিল্পমালিকরা।

বিজ্ঞাপন

দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিচিত রূপগঞ্জে তৈরি পোশাক, টেক্সটাইল, ডাইং, প্লাস্টিক, খাদ্যপণ্যসহ বিভিন্ন ধরনের শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ব্যবস্থা অনেকাংশেই গ্যাস ও বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে গ্যাসের চাপ কম থাকায় বয়লার, ডাইং ইউনিট ও অন্যান্য উৎপাদন মেশিন স্বাভাবিক ক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না।

শিল্পসংশ্লিষ্টরা জানান, গ্যাসের চাপ কম থাকায় অনেক কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম সীমিত করতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও উৎপাদন চালু রাখতে বিকল্প জ্বালানি ও জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে স্বাভাবিক উৎপাদনের তুলনায় ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ও ভোল্টেজের ওঠানামার কারণে মেশিন চালু রাখাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

একাধিক কারখানা মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে নির্ধারিত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। উৎপাদন কমে যাওয়ায় পণ্যের সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী কারখানাগুলোতে নির্ধারিত সময়ে বিদেশি ক্রেতাদের অর্ডার সরবরাহ করতে না পারলে ব্যবসায়িক ক্ষতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

শিল্পকারখানার পাশাপাশি রূপগঞ্জের সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে। স্থানীয়ভাবে জানা গেছে, পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় কয়েকটি স্টেশন সীমিত সক্ষমতায় কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কোথাও গ্যাসের চাপ ৩০ থেকে ৫০-এর মধ্যে থাকছে বলে স্টেশন সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। কোনো কোনো স্টেশন স্বাভাবিকভাবে পরিচালনা করাই কঠিন হয়ে পড়েছে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

সিএনজি নিতে আসা চালকদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। প্রয়োজনীয় চাপ না থাকায় একটি গাড়িতে গ্যাস সরবরাহ করতেই স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি সময় লাগছে। ফলে বিভিন্ন স্টেশনের সামনে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

সিএনজিচালক নুরুল ইসলাম বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে আগের তুলনায় তাঁর আয় অর্ধেকেরও কমে গেছে। দীর্ঘ সময় গ্যাসের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। এতে প্রতিদিন কর্মঘণ্টা কমে যাওয়ায় সংসার চালাতে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।

স্থানীয় সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও অন্যান্য যানবাহনের চালকেরা জানান, আগে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গ্যাস নিয়ে তারা কাজে বের হতে পারতেন। বর্তমানে গ্যাসের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এতে রাস্তায় গাড়ি চালানোর সময় কমে যাচ্ছে এবং দৈনিক আয়েও তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে।

চালকদের অভিযোগ, গ্যাসের সংকট শুধু তাদের আয় কমাচ্ছে না, যাত্রীদেরও ভোগান্তিতে ফেলছে। দীর্ঘ সময় স্টেশনে অপেক্ষা করার কারণে অনেক চালক নির্ধারিত সময়ে যাত্রী পরিবহন করতে পারছেন না।

বিজ্ঞাপন

গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব পড়েছে শিল্পকারখানার শ্রমিকদের ওপরও। উৎপাদন কমে যাওয়ায় অনেক কারখানায় কাজের সময় কমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে কমছে অতিরিক্ত কাজের সুযোগ। ফলে শ্রমিকদের আয়ও কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

শ্রমিকদের কেউ কেউ জানান, সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে কারখানাগুলো উৎপাদন আরও কমিয়ে দিতে পারে। এতে কর্মঘণ্টা কমার পাশাপাশি ভবিষ্যতে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, রূপগঞ্জের শিল্পাঞ্চলের সঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত। উৎপাদন ব্যাহত হলে শুধু শিল্পমালিক নয়, শ্রমিক, পরিবহন খাত, সরবরাহকারী এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

বিজ্ঞাপন

গ্যাসের স্বাভাবিক চাপ না থাকায় কারখানাগুলোকে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠানকে জেনারেটর চালিয়ে উৎপাদন সচল রাখতে হচ্ছে। এতে জ্বালানি খরচ বাড়ছে, পাশাপাশি মেশিনের উৎপাদনক্ষমতাও স্বাভাবিক থাকছে না।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, উৎপাদন খরচ বাড়লেও বাজারে প্রতিযোগিতার কারণে সবসময় পণ্যের দাম বাড়ানো সম্ভব হয় না। ফলে অতিরিক্ত ব্যয়ের বড় একটি অংশ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকেই বহন করতে হচ্ছে। দীর্ঘদিন এ অবস্থা চলতে থাকলে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান আর্থিক চাপে পড়তে পারে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী ও শিল্পসংশ্লিষ্টরা জানান, রূপগঞ্জের শিল্পাঞ্চল দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। এ অঞ্চলের কারখানাগুলোতে উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে পর্যাপ্ত গ্যাসের চাপ এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।

বিজ্ঞাপন

তাঁদের দাবি, শিল্পকারখানার পাশাপাশি সিএনজি স্টেশনগুলোর গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতিও স্বাভাবিক করতে হবে। অন্যথায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি পরিবহন খাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব আরও বাড়তে পারে।

শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট দ্রুত নিরসন করা না গেলে রূপগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার প্রভাব জাতীয় অর্থনীতিতেও পড়তে পারে। তাই শিল্পকারখানায় প্রয়োজনীয় গ্যাসের চাপ নিশ্চিত করা, বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।

জেবি/আরএক্স

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD