রোহিঙ্গা সংকটের ৯ বছর, ক্যাম্পের ৪ স্থানে সমাবেশ

রোহিঙ্গা সংকটের নয় বছর পূর্তিতে কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পৃথক চারটি স্থানে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব সমাবেশ থেকে দ্রুত সময়ের মধ্যে নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও মর্যাদাপূর্ণভাবে নিজভূমি মিয়ানমারের রাখাইনে ফিরে যাওয়ার আকুতি জানিয়েছেন রোহিঙ্গারা। তাদের মুখে ছিল একটাই স্লোগান—‘শেষ হতা এক্কান, ফিরত চাই আরাকান’ (শেষ কথা একটা, ফিরে যাব আরাকান)।
বিজ্ঞাপন
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সকাল থেকে উখিয়ার ৪ নম্বর এক্সটেনশন, ১৩ নম্বর ও ৯ নম্বর ক্যাম্প এবং টেকনাফের ২৬ নম্বর ক্যাম্পে এসব সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সমাবেশটি অনুষ্ঠিত হয় উখিয়ার ৪ নম্বর এক্সটেনশন ক্যাম্পের ফুটবল মাঠে। আয়োজকদের দাবি, এতে লাখের বেশি রোহিঙ্গা অংশ নেন। ‘ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গা’ (ইউসিআর)-এর ব্যানারে আয়োজিত সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনটির সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম। বক্তব্য দেন ইউসিআরের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছৈয়দ হোসেন, রোহিঙ্গা নেতা কামাল হোসেন, আরিফ উল্লাহ, মুজিব উল্লাহসহ ছাত্র, যুব ও বিভিন্ন কমিউনিটি সংগঠনের নেতারা।
সকাল থেকেই বিভিন্ন ব্লক থেকে নারী, পুরুষ ও শিশুরা ব্যানার-প্ল্যাকার্ড হাতে মিছিল নিয়ে সমাবেশে যোগ দেন। তাদের হাতে ছিল ‘আর নয় শরণার্থী জীবন’, ‘নিজ দেশে ফিরতে চাই’সহ বিভিন্ন স্লোগান লেখা ব্যানার ও ফেস্টুন।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
টেকনাফের শালবাগান মাঠেও ইউসিআরের আয়োজনে সকাল ৯টায় সমাবেশ শুরু হয়। শুরুতে রোহিঙ্গা মৌলভী মো. ইউছুপ নিজ ভাষায় তারানা পরিবেশন করে মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের চিত্র তুলে ধরেন। একই সঙ্গে দ্রুত প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
সমাবেশে ইউসিআরের সদস্য রোহিঙ্গা নেতা আবু তাহের বলেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিজস্ব ইতিহাস ও ঐতিহ্য রয়েছে। যারা রোহিঙ্গাদের ‘বাঙালি’ বলে দাবি করে, তাদের এ দাবির পক্ষে নথিপত্র ও প্রমাণ উপস্থাপন করতে হবে।
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, আমরা যে রোহিঙ্গা, তার ঐতিহাসিক ও নথিভুক্ত প্রমাণ আমাদের কাছে রয়েছে। মিয়ানমারকেও রোহিঙ্গাদের পরিচয় অস্বীকারের দাবির পক্ষে প্রমাণ দিতে হবে।
প্রত্যাবাসন নিয়ে দীর্ঘ অপেক্ষার কথা তুলে ধরে আবু তাহের বলেন, নয় বছরেও রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফেরার কার্যকর পথ দেখতে পাচ্ছেন না। আলোচনার মাধ্যমে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন সম্ভব না হলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি। একপর্যায়ে তিনি বলেন, “আলোচনায় ফেরত যাওয়া সম্ভব না হলে আমরা অস্ত্র হাতে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত।”
সমাবেশে টেকনাফের রোহিঙ্গা নেতা বদরুল ইসলাম বলেন, ২৫ আগস্ট আমাদের জন্য খুশির দিন নয়, অশান্তির দিন। ২০১৭ সালের এই দিনে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর গণহত্যা ও নির্যাতন চালানো হয়েছিল। লাখ লাখ মানুষকে ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করে দেশছাড়া করা হয়। আমরা সেই গণহত্যার বিচার চাই।
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশে আশ্রয় দেওয়ায় কৃতজ্ঞতা জানিয়ে লেদা ক্যাম্পের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলম বলেন, আমরা এ দেশের অতিথি। কিন্তু অনেক দিন হয়ে গেছে। এখন আমাদের জন্মভূমিতে ফিরে যাওয়া উচিত। আমরা মিয়ানমারেই ফিরে যেতে চাই। অন্য কোনো দেশে গেলে রোহিঙ্গাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে। তাই নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনে বিশ্ববাসীর সহযোগিতা চাই।
উখিয়ার আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যানিটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জোবায়ের বলেন, “আমরা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ দেশ গড়তে চাই। বাংলাদেশে শরণার্থী জীবনের নয় বছর কেটেছে। এই ভাসমান জীবন থেকে মুক্তি চাই। নিজ দেশে নিরাপদ পরিবেশে ফিরে যেতে চাই।”
এদিকে সমাবেশকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন)।
বিজ্ঞাপন
১৬-আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের অতিরিক্ত ডিআইজি মুহাম্মদ কাউছার সিকদার বলেন, তাঁর আওতাধীন কয়েকটি ক্যাম্পে রোহিঙ্গারা শান্তিপূর্ণভাবে গণহত্যা দিবসের কর্মসূচি পালন করেছেন। সমাবেশে তাঁরা শরণার্থী জীবন থেকে মুক্তি, নাগরিক অধিকার এবং সম্মানজনক প্রত্যাবাসনের দাবি জানিয়েছেন।








