এক হাজার প্রজাতির গাছ নিয়ে রাখির স্বপ্নের নার্সারি, মাসে আয় লাখ টাকা

শুরুটা হয়েছিল নিছক শখ থেকে। ঘর সাজাতে ২০২০ সালে মাত্র এক হাজার টাকা দিয়ে কিনেছিলেন দুই জোড়া ক্যাকটাসের চারা। এরপর গাছের প্রতি ভালোবাসা আর নতুন নতুন প্রজাতি সংগ্রহের নেশা ধীরে ধীরে তাঁকে নিয়ে যায় উদ্যোক্তা হওয়ার পথে। শখের সেই বাগানই এখন পরিণত হয়েছে বাণিজ্যিক নার্সারিতে। সেখানে দেশি-বিদেশি প্রায় এক হাজার প্রজাতির গাছের সংগ্রহ। গাছের চারা বিক্রি করে মাসে আয় হচ্ছে প্রায় লাখ টাকা।
বিজ্ঞাপন
নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার গয়াবাড়ী গ্রামের উদ্যোক্তা আতিফা নাসরিন রাখির এই নার্সারির নাম ‘প্লান্টোলজি’। ক্যাকটাস, সাকুলেন্ট, স্যানসেভেরিয়া, অ্যালোভেরা, আগলোনেমা, কোলিয়াস, ট্রেডেস্কান্টিয়া, মনস্টেরা, ফিলোডেনড্রন, মানিপ্ল্যান্ট, বাগানবিলাস, কাঁটামুকুট, অর্কিডসহ নানা ধরনের ইনডোর প্ল্যান্ট, ফুল ও পাতাবাহার গাছে ভরে আছে নার্সারিটি।
নার্সারিতে বিভিন্ন আকারের টব ও ঝুলন্ত পাত্রে সাজানো রয়েছে নানা প্রজাতির গাছ। ছাউনি ও মাচার নিচে সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়েছে ক্যাকটাস, সাকুলেন্ট, স্যানসেভেরিয়া ও পাতাবাহার। রঙিন পাতার আগলোনেমা, কোলিয়াস, মনস্টেরা ও ফিলোডেনড্রনের পাশাপাশি রয়েছে জেড প্ল্যান্ট, ইকেভেরিয়া ও হাওর্থিয়াসহ বিভিন্ন জাতের সাকুলেন্ট। বৈচিত্র্যময় আকৃতি ও রঙের ক্যাকটাসও নজর কাড়ে দর্শনার্থীদের।
রাখি জানান, ছোটবেলা থেকেই ফুল ও গাছের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল। বাড়ির আঙিনায় বিভিন্ন ধরনের গাছ লাগানোর মধ্য দিয়ে শুরু হয় বাগান করার অভ্যাস। ২০২০ সালে ঘর সাজানোর জন্য এক হাজার টাকা দিয়ে দুই জোড়া ক্যাকটাস কেনেন। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন নার্সারির পেজ ও গাছের ছবি দেখতে দেখতে গাছের ব্যবসার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। এরপর নতুন নতুন গাছ সংগ্রহ, চারা উৎপাদন ও বিক্রি শুরু করেন। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে গাছের সংখ্যা। একপর্যায়ে গড়ে তোলেন ‘প্লান্টোলজি’।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
বর্তমানে নার্সারিতে রয়েছে প্রায় ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা মূল্যের গাছের চারা। অনলাইনের পাশাপাশি নার্সারি থেকেও সরাসরি চারা বিক্রি করেন তিনি। ‘প্লান্টোলজি’ নামে তাঁর একটি অনলাইন পেজ রয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের বাগানপ্রেমীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গাছের ছবি ও ভিডিও দেখে অর্ডার করেন। পরে কুরিয়ারের মাধ্যমে বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে দেওয়া হয় গাছের চারা।
শখের এ উদ্যোগকে আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে দিতে বিভিন্ন মেলা ও প্রদর্শনীতেও অংশ নিচ্ছেন রাখি। সম্প্রতি রংপুরের একটি বাণিজ্য মেলায় দুটি স্টল নিয়ে অংশ নেন তিনি। সেখানে বিভিন্ন প্রজাতির গাছ ও চারা প্রদর্শন ও বিক্রি করেন। দর্শনার্থী ও বাগানপ্রেমীদের কাছ থেকে ভালো সাড়া পাওয়ার পাশাপাশি আশানুরূপ বিক্রিও হয়েছে বলে জানান তিনি।
বিজ্ঞাপন
রাখি বলেন, “শুরুতে শুধুই শখ ছিল। নিজের জন্য কয়েকটি ফুলের গাছ লাগিয়েছিলাম। পরে গাছের সংখ্যা বাড়তে থাকে। মানুষ গাছ কিনতে চাইলে চারা তৈরি করে বিক্রি শুরু করি। এখন এটি আমার ভালো লাগার পাশাপাশি আয়েরও একটি বড় উৎস।”
নার্সারি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে পরিবারের সহযোগিতার কথাও জানান তিনি। তাঁর স্বামী শাকিল খান ও শাশুড়ি সাজেদা বেগম শুরু থেকেই তাঁকে সহযোগিতা করেছেন। প্রথম দিকে একাই নার্সারির কাজ সামলালেও বর্তমানে দুই থেকে তিনজন কর্মচারী নিয়মিত তাঁর সঙ্গে কাজ করছেন।
রাখি জানান, গাছের পরিচর্যা ও অন্যান্য খরচ বাদ দিয়ে বর্তমানে প্রতি মাসে প্রায় ৮০ হাজার টাকা লাভ থাকে। বিক্রি ভালো হলে মাসিক আয় লাখ টাকা পর্যন্ত হয়। তবে গাছের ব্যবসায় লাভ করতে হলে ধৈর্য ও নিয়মিত পরিচর্যার বিকল্প নেই বলে মনে করেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, “প্রতিটি গাছের জন্য আলাদা পরিচর্যা প্রয়োজন। কোন গাছে কতটুকু পানি, কী ধরনের মাটি ও সার প্রয়োজন—এসব বিষয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হয়েছে। গাছের রোগবালাই শনাক্ত করে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হয়।”
রাখির মতে, অল্প জায়গা নিয়েও এ ধরনের নার্সারি গড়ে তোলা সম্ভব। বাড়ির আঙিনা, ছাদ কিংবা পতিত জমি কাজে লাগিয়ে সামান্য প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতার মাধ্যমে শুরু করা যায়। সঠিক পরিচর্যা ও ব্যবস্থাপনা করতে পারলে এটি বাড়তি আয়ের ভালো উৎস হতে পারে। বিশেষ করে নারীরা সংসারের কাজের পাশাপাশি এ ধরনের উদ্যোগ নিয়ে নিজেদের কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারেন।
নার্সারিটি পরিদর্শন করে ডিমলা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মীর হাসান আল বান্না বলেন, আতিফা নাসরিন রাখির উদ্যোগটি প্রশংসনীয়। তিনি শখকে কাজে লাগিয়ে একটি সম্ভাবনাময় নার্সারি গড়ে তুলেছেন। এখানে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রজাতির গাছের চারা রয়েছে, যা এলাকার মানুষের মধ্যে বাগান করার আগ্রহও তৈরি করছে। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে তাঁকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হবে।
বিজ্ঞাপন
কৃষি কর্মকর্তা আরও বলেন, বাণিজ্যিকভাবে ফুল ও শোভাবর্ধক গাছের নার্সারি গড়ে তোলার মাধ্যমে গ্রামীণ নারীদের স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ রয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও পরিবেশের সৌন্দর্য বৃদ্ধিতেও এ ধরনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
মাত্র এক হাজার টাকার ক্যাকটাস দিয়ে শুরু করা রাখির সেই শখ এখন ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকার গাছের সংগ্রহে পরিণত হয়েছে। প্রায় এক হাজার প্রজাতির গাছের চারা সংগ্রহ, উৎপাদন ও বিক্রির মধ্য দিয়ে ‘প্লান্টোলজি’ এখন শুধু একটি নার্সারি নয়, বরং রাখির স্বপ্ন, কর্মসংস্থান ও স্বাবলম্বী হওয়ার গল্প।








