সার্কাসে রঙিন পোশাকের আড়ালে জোকারের সাদাকালো জীবন

মঞ্চে উঠেই অদ্ভুত ভঙ্গিতে হাঁটেন। কখনো পড়ে যাওয়ার অভিনয় করেন, কখনো নকল নাক পরে দর্শকদের দিকে তাকিয়ে থাকেন। মুখে কোনো সংলাপ নেই, অথচ তাঁর কাণ্ড দেখে হাসিতে ফেটে পড়েন শিশুরা। বিচিত্র পোশাক, মুখে রঙ-বেরঙের মেকআপ—হাসির এই মানুষটির নাম মো. রিপন।
বিজ্ঞাপন
বগুড়ার শেরপুর উপজেলার সুঘাট ইউনিয়নের কল্যাণী এলাকায় দ্য লায়ন সার্কাসের তাঁবুতে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। নাটোরের বনলতা সেন এলাকার বাসিন্দা রিপন প্রায় ৩৫ বছর ধরে সার্কাসের সঙ্গে যুক্ত। সার্কাসের তাঁবুতেই তাঁর বেড়ে ওঠা। ১২০ বছরের বেশি সময় ধরে চলে আসা এই সার্কাসের সঙ্গে এখন দেশের বিভিন্ন মেলা ও অনুষ্ঠানে ঘুরে বেড়ান তিনি।
সার্কাসের মঞ্চে রিপনের কোনো সংলাপ নেই। শরীরী কসরত, পড়ে যাওয়ার অভিনয়, অদ্ভুত হাঁটাচলা আর নানা অঙ্গভঙ্গিই তাঁর ভাষা। কখনো বল, কখনো রিং, আবার কখনো নানা জিনিস বাতাসে ছুড়ে দিয়ে দেখান জাগলিং। করেন ভারসাম্যের খেলাও। দর্শকের হাসিই তাঁর কাছে সাফল্যের মাপকাঠি।
রিপন বলেন, ‘আমরা শিল্পীগোষ্ঠী এই জগতটা ধরে রাখতে চাই। জোকারি করতে আমার ভালো লাগে। মানুষ হাসানো আমাদের দায়িত্ব। আমাদের অভিনয় দেখে দর্শক হাসে, এটা আমাদের ভালো লাগা।’
বিজ্ঞাপন
মানুষকে হাসানোর পাশাপাশি হাই জাম্প, লং জাম্প, ডিগবাজি, রডের খেলাসহ আরও নানা কসরত জানেন তিনি। ব্যক্তিগত জীবনেও ভালো আছেন বলে জানান রিপন। তবে খেলা না থাকলে মন খারাপ হয়ে যায় তাঁর।
‘১০-১৫ বছর আগে অনেক কাজ থাকত। এখন খেলা অনেক কমে গেছে। মেলা ভালো চলে না, সার্কাস মানুষ কম দেখে। কাজ থাকলে দিনে এক হাজার টাকা সম্মানি পাই,’ বলেন রিপন।
রিপনের মতোই প্রায় ৩০ বছর ধরে সার্কাসের সঙ্গে যুক্ত রুহুল আমিন। তাঁর কাছেও সার্কাস শুধু একটি পেশা নয়; মানুষের আনন্দের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক জীবন।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
রুহুল আমিন বলেন, আমরা মানুষকে আনন্দ দিই, নিজেরাও আনন্দ পাই। কিন্তু সার্কাসের আগের সেই জৌলুস আর নেই।
একসময় বছরের প্রায় ১০ মাসই সার্কাসে কাজ করতেন তিনি। ১৫ বছর আগেও ছিল সেই ব্যস্ততা। এখন কাজের সুযোগ কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় পাঁচ মাসে। বাকি সময়টা বাড়িতে বসেই কাটাতে হয়। ছোটখাটো কাজ পেলে তা করে কোনোরকমে সংসার চালান তিনি।
বিজ্ঞাপন
মেলা ও সার্কাসের অনুমতি নিয়েও নানা সমস্যার কথা জানান রুহুল আমিন। তাঁর ভাষায়, ‘মেলার অনুমতি পেলে সার্কাসের অনুমতি পাওয়া যায় না। আবার সার্কাসের অনুমতি পেলে মেলার অনুমতি মেলে না। এভাবেই চলছে।’
তাঁর কথায় হতাশার সুর স্পষ্ট। রুহুল আমিন বলেন, ‘আগের মতো আনন্দ নেই। সার্কাসের বিনোদন দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। এই শিল্প এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে।’
একসময় সার্কাস মানেই ছিল অন্যরকম এক আকর্ষণ। তাঁবু দেখলেই মানুষের মনে তৈরি হতো কৌতূহল। শিশুদের সঙ্গে বড়রাও ছুটে যেতেন সার্কাস দেখতে।
বিজ্ঞাপন
দাঁতের খেলা, ভার উত্তোলন, রশির ওপর হাঁটা, ট্র্যাপিজ ও ঝুলন্ত খেলা, জাগলিং, জোকারের কৌতুক, জাদুকরের ভেলকি, চাকা ও রিংয়ের খেলা কিংবা মোটরসাইকেলের ‘গ্লোব অব ডেথ’—সব মিলিয়ে সার্কাস ছিল চোখধাঁধানো বিনোদনের এক জগৎ।
সময় বদলেছে। বদলেছে মানুষের বিনোদনের ধরনও। প্রযুক্তির বিস্তার এবং বিনোদনের নতুন নতুন মাধ্যমের কারণে সার্কাসের দর্শক কমেছে। মেলার পরিবেশের পরিবর্তন, পৃষ্ঠপোষকতার অভাব এবং প্রশাসনিক অনুমতির জটিলতাও এই শিল্পের সংকট বাড়িয়েছে। দর্শক কমার সঙ্গে সঙ্গে কমেছে শিল্পীদের কাজের সুযোগ।
একসময় বন্য পশুপাখির খেলা ছিল সার্কাসের অন্যতম বড় আকর্ষণ। আইনি জটিলতার কারণে এখন সেই খেলা নেই। ফলে পুরোনো সার্কাসের একটি পরিচিত অধ্যায়ও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
সার্কাসের তাঁবুর ভেতরে আলো জ্বলে। দর্শকেরা হাসেন, হাততালি দেন। জোকারেরা পড়ে যান, আবার উঠে দাঁড়ান। কখনো অদ্ভুত ভঙ্গিতে হাঁটেন, কখনো এমন সব কাণ্ড করেন যাতে দর্শকের মুখে হাসি ফুটে ওঠে। কয়েক মিনিটের জন্য তাঁরা মানুষকে দুশ্চিন্তা ভুলিয়ে দেন।
কিন্তু খেলা শেষ হলে সেই আলো নিভে যায়। তাঁবু গুটিয়ে যায়। দর্শকেরা বাড়ি ফেরেন। আর শিল্পীদের সামনে থেকে যায় পরের দিনের অনিশ্চয়তা।
রুহুল আমিনের কথায় সেই বাস্তবতাই উঠে আসে, এখন মঞ্চে মানুষ হাসালেও দিন শেষে নিরব কান্না চলে আসে। ৩৫ বছরের রিপন কিংবা ৩০ বছরের রুহুল আমিনের গল্প শুধু দুই জোকারের গল্প নয়। এটি হারিয়ে যেতে বসা একটি বিনোদনশিল্পের গল্প। যে শিল্প একসময় হাজারো মানুষকে আনন্দ দিয়েছে, সেই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষগুলোর জীবনেই এখন অনিশ্চয়তার ছায়া।
বিজ্ঞাপন
মঞ্চে তাঁরা হাসি বিলিয়ে দেন। আর মঞ্চের বাইরে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবেন। তাঁদের চাওয়া খুব বেশি নয়—শুধু খেলার সুযোগ, মানুষের সামনে দাঁড়ানোর সুযোগ এবং প্রিয় শিল্পটিকে টিকিয়ে রাখার সুযোগ।








