Logo

১৫ বছর ধরে অসুস্থ জুঁই, বন্ধ স্কুল-চিকিৎসা

profile picture
উপজেলা প্রতিনিধি
বাগাতিপাড়া, নাটোর
৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:১৬
১৫ বছর ধরে অসুস্থ জুঁই, বন্ধ স্কুল-চিকিৎসা
ছবি: সংগৃহীত

বয়স মাত্র ১৫ বছর। এ বয়সে বই-খাতা হাতে স্কুলে যাওয়ার কথা, বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা আর আনন্দে সময় কাটানোর কথা। অথচ জীবনের শুরু থেকেই অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করছে নাটোরের বাগাতিপাড়ার জুঁই খাতুন। মাত্র সাত মাস বয়সে জটিল কিডনি রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর থেকে প্রায় ১৫ বছর ধরে চিকিৎসা ও শারীরিক নানা সমস্যার মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠছে সে।

বিজ্ঞাপন

দীর্ঘদিনের অসুস্থতায় এখন নিয়মিত স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে জুঁইয়ের। এবার অর্ধবার্ষিক পরীক্ষাতেও অংশ নিতে পারেনি। এর মধ্যে অর্থসংকটে প্রায় তিন মাস ধরে বন্ধ রয়েছে তার চিকিৎসা।

জুঁই উপজেলার পাঁকা ইউনিয়নের চকগোয়াস (কুলপাড়া) গ্রামের দিনমজুর জুব্বার আলী ও রিনা বেগম দম্পতির মেজ মেয়ে। সে বাগাতিপাড়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী।

পরিবারের ভাষ্য, বর্তমানে জুঁইয়ের শরীর ও পেট অস্বাভাবিকভাবে ফুলে থাকে। প্রস্রাবের জটিলতা দেখা দিলে তার শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হয়। রাতে ঘুমাতে পারে না, শ্বাসকষ্ট হয় এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে ব্যথা অনুভব করে। বয়স অনুযায়ী তার স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধিও হয়নি বলে জানিয়েছে পরিবার।

বিজ্ঞাপন

অসুস্থতার মধ্যেও জুঁইয়ের চোখে ভবিষ্যতের স্বপ্ন। আবার স্কুলে যেতে চায় সে। বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে ও ঘুরতে যেতে চায়। কিন্তু অসুস্থতা আর পরিবারের আর্থিক সংকট বারবার সেই স্বপ্নের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

জুঁই বলে, তার পেট ফুলে গেছে এবং পেট ও শরীরের পাশে ব্যথা করে। শ্বাস নিতেও কষ্ট হয়। দ্রুত সুস্থ হয়ে আবার স্কুলে যেতে ও বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে চায় সে। সুস্থতার জন্য সবার কাছে দোয়া ও সহযোগিতাও চেয়েছে কিশোরীটি।

বিজ্ঞাপন

জুঁইয়ের মা রিনা বেগম বলেন, সাত মাস বয়স থেকেই মেয়ের অসুস্থতা শুরু। তখন তার পেট ও চোখ-মুখ ফুলে যেত, তীব্র ব্যথা হতো এবং প্রস্রাবে বারবার সংক্রমণ দেখা দিত। চিকিৎসকদের কাছ থেকে মেয়ের মূত্রনালিতে জটিলতার কথা জানতে পেরেছেন তারা।

রিনা বেগম বলেন, অর্থের অভাবে প্রায় তিন মাস ধরে জুঁইয়ের চিকিৎসা বন্ধ রয়েছে। প্রস্রাব বন্ধ হয়ে গেলে তার পেট আরও ফুলে যায়। তখন বসা, শোয়া এমনকি ঘুমানোও কঠিন হয়ে পড়ে। দীর্ঘদিন চিকিৎসা করাতে গিয়ে পরিবারের সঞ্চয় ও সম্পদের বড় অংশ শেষ হয়ে গেছে। এখন হাসপাতালে ভর্তি করানোর মতো অর্থও তাদের হাতে নেই।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “আমার মেয়েটা অনেক কষ্ট করছে। আমি চাই, মানুষ আমার মেয়ের পাশে দাঁড়াক। ও যেন আবার সুস্থ হয়ে স্কুলে যেতে পারে।”

বিজ্ঞাপন

জুঁইয়ের বাবা জুব্বার আলী অন্যের জমিতে দিনমজুরের কাজ করে সংসার চালান। মেয়ের চিকিৎসার খরচ জোগাতে নিজের সামান্য সম্পদও বিক্রি করতে হয়েছে বলে জানিয়েছে পরিবার। ঢাকা ও রাজশাহীর বিভিন্ন হাসপাতালে মেয়ের চিকিৎসা করিয়েছেন তিনি। দীর্ঘদিনের চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে গিয়ে এখন প্রায় নিঃস্ব অবস্থায় রয়েছেন বলে পরিবারের দাবি।

জুঁইয়ের বড় মা ঝরণা বেগম বলেন, ছোটবেলা থেকেই তারা মেয়েটিকে অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করতে দেখছেন। চিকিৎসার পেছনে পরিবারের প্রায় সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। বর্তমানে জুঁইয়ের পেট ও চোখ-মুখ ফুলে আছে এবং অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করে। রাতে ঠিকমতো ঘুমাতেও পারে না।

চাচী লিপি খাতুন বলেন, জুঁইয়ের কষ্ট দেখলে তাদের খারাপ লাগে। রাতে ঘুমাতে পারে না এবং শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। আত্মীয়স্বজন মিলে যতটা সম্ভব সহযোগিতা করেছেন, কিন্তু এখন আর তাদের পক্ষেও সহায়তা করা সম্ভব হচ্ছে না।

বিজ্ঞাপন

চাচা শামিম বলেন, জুঁইয়ের চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে পরিবারের জমিজমা, গাছপালাসহ বিভিন্ন সম্পদ বিক্রি করতে হয়েছে। এখন তাদের আর্থিক সামর্থ্য নেই। তাই মানুষের সহযোগিতাই পরিবারের শেষ ভরসা।

বাগাতিপাড়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বাবর আলী বলেন, জুঁই বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। অসুস্থতার কারণে সে নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসতে পারে না। এবার অর্ধবার্ষিক পরীক্ষাতেও অংশ নিতে পারেনি। জুঁই দ্রুত সুস্থ হয়ে আবার শ্রেণিকক্ষে ফিরবে—এটাই তাদের প্রত্যাশা। সহৃদয় মানুষ তার চিকিৎসায় এগিয়ে এলে মেয়েটি স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

পাঁকা ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান হেলাল উদ্দিন বলেন, জুঁইয়ের পরিবার অত্যন্ত অসচ্ছল। দীর্ঘদিন ধরে মেয়েটি অসুস্থ। তার চিকিৎসায় সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, প্রবাসী ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

বাগাতিপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সৈকত মো. রেজওয়ানুল হক বলেন, নেফ্রোটিক সিনড্রোম একটি পরিচিত রোগ। এটি বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। বায়োপসির মাধ্যমে রোগের ধরন সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়। রোগের ধরন তুলনামূলক কম জটিল হলে চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে জটিল ধরনের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।

জুঁইয়ের এখন একটাই স্বপ্ন—আবার বই-খাতা হাতে স্কুলে যাওয়া, বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা করা এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা। সেই স্বপ্ন পূরণে প্রয়োজন দ্রুত চিকিৎসা ও আর্থিক সহায়তা। জুঁইয়ের চিকিৎসায় সহযোগিতা করতে ইচ্ছুক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।

জেবি/আরএক্স

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD