Logo

বেঁচে থাকার লড়াই দুই বিধবার, চাওয়া শুধু একটু পানি

profile picture
উপজেলা প্রতিনিধি
কুড়িগ্রাম সদর, কুড়িগ্রাম
২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৪৬
বেঁচে থাকার লড়াই দুই বিধবার, চাওয়া শুধু একটু পানি
ছবি: সংগৃহীত

‘মুই মরলে মোর জাগা নাই মাটি দিবার। পানি খোয়াইয়া মানুষ নাই। মোর দুঃখ কোন মাইষোক কোইম।’ কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার নাজিমখান ইউনিয়নের ঝাড়িঝাড় গ্রামের ৭০ বছরের ফাতেমা বেগমের কণ্ঠে ফুটে ওঠে একাকিত্ব আর দীর্ঘদিনের অভাবের যন্ত্রণা।

বিজ্ঞাপন

মানুষের বাড়িতে কাজ করে খাবার জোটে তাঁর। কাজ না থাকলে জীবিকার জন্য ভিক্ষার পথ বেছে নিতে হয়। জীবনের শেষপ্রান্তে এসে নিরাপদ আশ্রয় কিংবা নিয়মিত সহায়তা—কোনোটিই তাঁর ভাগ্যে জোটেনি।

ফাতেমা বেগমের পাশের ঘরেই ৮০ বছরের সালেহা বেগমের বসবাস। মেয়ে শাহিদা বেগমকে নিয়ে ছোট্ট একটি জীর্ণ টিনের ঘরে দিন কাটে তাঁদের। রান্না, খাওয়া ও ঘুম—সবই একই ঘরে। ঘরের ভেতর তাঁদের সঙ্গী হয়ে থাকে একটি ছাগলও।

রাজারহাট উপজেলার নাজিমখান ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের রাঘব মৌজার ঝাড়িঝাড় গ্রামের এই দুই বিধবার জীবনযাপন প্রায় একই রকম। দুজনেরই বসবাস এক শতাংশ জমির ওপর তৈরি জীর্ণ টিনের ঘরে। নেই বিদ্যুৎ, নলকূপ, শৌচাগার কিংবা ঘর থেকে বাইরে যাওয়ার নিজস্ব রাস্তা।

বিজ্ঞাপন

একটি পুকুরের পাশে সালেহা বেগমের ঘরটি দাঁড়িয়ে আছে। বাইরে থেকে সাধারণ টিনের ঘর মনে হলেও ভেতরের অবস্থা আরও করুণ। টিনের বেড়ায় অসংখ্য ছিদ্র। দিনের আলো যেমন সেসব ফাঁক দিয়ে ঘরে ঢোকে, তেমনি বৃষ্টির সময় পানি ঢুকে পড়ে ঘরের ভেতর।

ঘরটিতে কোনো জানালা নেই। একটি দরজাই আলো-বাতাস ও চলাচলের একমাত্র পথ। এক পাশে রান্নার জায়গা, অন্য পাশে একটি চৌকি। মা-মেয়ে সেই চৌকিতেই থাকেন। টিনের বেড়ার ফাঁকে গুঁজে রাখা হয়েছে তাঁদের কাপড়চোপড়।

সালেহা বেগম বলেন, ‘এই ঘরোত দুই মায়-ছায় থাকি। আন্দি-বাড়ি খাই। ছাগল থাকে, হমরাও থাকি একসাথে।’

বিজ্ঞাপন

বয়সের ভারে এখন আর আগের মতো কাজ করতে পারেন না সালেহা। ফলে সংসারের বড় দায়িত্ব এসে পড়েছে মেয়ে শাহিদার ওপর। তিনি অন্যের বাড়িতে কাজ করেন। কখনো কাজের বিনিময়ে চাল পান, আবার কখনো সামান্য টাকা। অন্যদিকে সালেহা ভিক্ষা করে যা পান, তা দিয়েই চলে তাঁদের সংসার।

শাহিদা বেগম বলেন, ‘ভিক্ষা করি খাই। কল নাই, টয়লেট নাই। মানুষের বাড়িতে যাই, মানুষ চৌদ্দকুড়ি কথা কয়। আবাদ-সুবাদ নাই, কী করি খাই। মোর মাক কোটে ফেলে দেইম, বুকোত ধরিয়া থাকোং।’

তাঁদের দুর্ভোগ শুধু ঘর ও খাবারের সংকটেই সীমাবদ্ধ নয়। বাড়ি থেকে বাইরে যাওয়ার জন্যও নেই কোনো নিজস্ব রাস্তা। অন্যের জমি ও বাড়ির ভেতর দিয়ে তৈরি সরু পথই তাঁদের চলাচলের একমাত্র অবলম্বন। বৃষ্টি হলে সেই পথ কাদায় পরিণত হওয়ায় দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়।

বিজ্ঞাপন

প্রতিবেশী মোছা. সেমা বেগম বলেন, ‘এনাদের যাতায়াতের জন্য কোনো রাস্তা নেই। আমাদের বাড়ির ভিতরের রাস্তা ব্যবহার করে যাতায়াত করেন।’

সালেহা বেগমের ঘরের পাশেই ফাতেমা বেগমের বসতঘর। এক শতাংশ জমির ওপর তৈরি জীর্ণ টিনের ঘরটিতে দীর্ঘদিন ধরে একাই বসবাস করছেন তিনি। তাঁর ঘরেও নেই বিদ্যুৎ, নলকূপ ও শৌচাগার। পানির প্রয়োজন হলে যেতে হয় অন্যের বাড়িতে।

জীবিকা নির্বাহের জন্য কখনো মানুষের বাড়িতে কাজ করেন ফাতেমা। কাজ না পেলে ভিক্ষা করে দিন কাটে।

বিজ্ঞাপন

ফাতেমা বেগম বলেন, ‘মাইষের বাড়িত কর্ম করি। কাম না করবার পাইলে ভিক্ষা করি আনি খাই। মুই মরলে মোর জাগা নাই মাটি দিবার। পানি খাওয়াইয়া মানুষ নাই। মোর দুঃখ কোন মাইষোক কোইম।’

প্রতিবেশী মজিদ মিয়া বলেন, ‘তিনি এক ঘরেই রান্না করে, ওখানেই খায়, ওখানেই থাকে। ওই ঘরেই দুটি ভেঁড়া থাকে। মানুষের বাড়িতে কাজ করে করে খায়।’

দোলেনা বেগম বলেন, ‘মানুষ যখন খেতে দেয়, তখন খেতে পায়; না দিলে না খেয়ে থাকে।’

বিজ্ঞাপন

আরেক প্রতিবেশী মো. সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘তাদের নিজস্ব কেউ নাই। ছোট্ট একটি ঘরে থাকে। টিউবওয়েল নেই, টয়লেট নেই। খুব কষ্টে আছে এমরা।’

দুই বিধবার জীবনেই অভাব যেন স্থায়ী সঙ্গী। নিরাপদ ঘর নেই, নেই বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা কিংবা শৌচাগার। এমনকি ঘর থেকে বাইরে যাওয়ার জন্যও নিজেদের কোনো রাস্তা নেই। শেষ বয়সে তাঁদের জীবিকা নির্ভর করছে মানুষের বাড়িতে কাজ পাওয়া কিংবা ভিক্ষার ওপর।

সালেহা বেগম ও ফাতেমা বেগমের দাবি, তাঁরা কোনো সরকারি ভাতা বা সহায়তা পাচ্ছেন না। তাঁদের চাওয়া খুব বেশি নয়—নিরাপদ একটি ঘর, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, একটি শৌচাগার এবং চলাচলের জন্য একটি রাস্তা।

বিজ্ঞাপন

এ বিষয়ে রাজারহাট উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা এস.এম. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘সালেহা বেগম ও ফাতেমা বেগম মানবেতর জীবনযাপন করছেন। সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে যদি কোনো গৃহনির্মাণের বরাদ্দ পাওয়া যায়, তাহলে তাঁদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। তাঁরা যদি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আবেদন করে থাকেন, তবে তাঁদের বিষয়টি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনা করব।’

ঝাড়িঝাড় গ্রামের এই দুই বিধবার জীবন কেবল ব্যক্তিগত অভাব-অনটনের চিত্র নয়; এটি প্রত্যন্ত এলাকার প্রান্তিক মানুষের বার্ধক্যকালীন অনিশ্চয়তারও প্রতিচ্ছবি। জীবনের শেষ সময়ে তাঁদের চাওয়া তাই খুব সামান্য—নিরাপদ একটি আশ্রয়, একটু পানি, একটি শৌচাগার আর ঘর থেকে বের হওয়ার একটি পথ।

জেবি/আরএক্স

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD