Logo

ঢাবিতে ভর্তি হয়েও থমকে যাচ্ছে আলামিনের পড়াশোনা

profile picture
জেলা প্রতিনিধি
কুষ্টিয়া
২২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৫৫
ঢাবিতে ভর্তি হয়েও থমকে যাচ্ছে আলামিনের পড়াশোনা
ছবি: সংগৃহীত

কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার পান্টি ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রামের জরাজীর্ণ টিনশেড ঘরেই এখন কাটছে মো. আলামিন হোসেনের দিন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রথম বর্ষের এই শিক্ষার্থীর স্বপ্ন ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়া।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু অর্থসংকটে ঢাকায় থাকা-খাওয়ার খরচ চালাতে না পেরে গ্রামে ফিরে আসতে হয়েছে তাকে। ফলে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে তার পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া।

সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) আলামিনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পড়াশোনার জন্য প্রয়োজনীয় ভালো চেয়ার-টেবিল কিংবা পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থাও নেই। নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেই বই নিয়ে বসতে হচ্ছে তাকে।

আলামিন জানান, ভর্তির প্রায় দুই মাস পর তিনি হলে উঠেছিলেন। সেখানে থাকা, খাওয়া ও পড়াশোনাসহ মাসে প্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা প্রয়োজন হতো। কিন্তু ভ্যান চালিয়ে বাবার সামান্য আয় দিয়ে সংসার চালানোই কঠিন। তাই ঢাকায় টিকে থাকতে না পেরে গত বৃহস্পতিবার রাতে গ্রামে ফিরে আসেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

আলামিন বলেন, “বন্ধুরা এখন সেমিস্টার ফাইনালের প্রস্তুতি নিচ্ছে, আর আমি বাড়িতে বসে আছি। অথচ নানা সংকট মোকাবিলা করে বুকভরা স্বপ্ন নিয়ে ঢাবিতে ভর্তি হয়েছিলাম।”

বিজ্ঞাপন

আলামিনের বাবা আলেফ আলী পেশায় ভ্যানচালক। পরিবারের বড় ছেলে হিসেবে আলামিনের পাশাপাশি সংসারে রয়েছেন তার সৎমা রোকসানা বেগম, বৃদ্ধ দাদি চন্দনা খাতুন এবং স্কুলপড়ুয়া দুই মেয়ে ও এক ছেলে।

শিক্ষাজীবনে আলামিন বরাবরই মেধার পরিচয় দিয়েছেন। ২০২৩ সালে ডাঁসা মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে বাণিজ্য বিভাগে জিপিএ-৫ পেয়ে এসএসসি এবং ২০২৫ সালে শৈলকুপার কাতলাগাড়ি ডিগ্রি কলেজ থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে এইচএসসি পাস করেন। পরে একটি বৃত্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ঢাকার একটি কোচিং সেন্টারে বিনা খরচে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি প্রস্তুতির সুযোগ পান।

ভর্তি পরীক্ষাতেও সাফল্য দেখান আলামিন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সি ইউনিটে ২০তম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগে ৯৫তম এবং বি ইউনিটে ৫২৬তম স্থান অর্জন করেন তিনি। স্থানীয়দের সহযোগিতা ও ধারদেনার মাধ্যমে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তবে ভর্তি হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই অর্থসংকট তার সেই পথ কঠিন করে তুলেছে।

বিজ্ঞাপন

আলামিনের বাবা আলেফ আলী বলেন, “ভ্যান চালাইয়া দিনে ৪০০-৫০০ টাকা পাই। এই দিয়া সংসার চালাই, ছেলের পড়ার খরচ কীভাবে দেব? ছেলের এই খরচ-খরচাটা এখন জুলুম হয়ে যাচ্ছে আমার কাছে। টাকার অভাবে ছেলে ঢাকা থেকে চলে আসছে। সরকার যদি একটু সহযোগিতা করতো।”

সৎমা রোকসানা বেগম বলেন, আলামিন পড়াশোনায় ভালো এবং অনেকের সহায়তায় এতদূর এসেছে। তারা চান ছেলে পড়াশোনা চালিয়ে যাক, কিন্তু পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য নেই। সরকারি সহযোগিতা পেলে আলামিন পড়াশোনা শেষ করে নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে পারবে বলে আশা করেন তিনি।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

পারিবারিক সংকটের মধ্যেও আলামিন পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। কয়েক বছর আগে তার মা মারা যাওয়ার পরও গ্রামের মানুষ ও স্বজনদের সহযোগিতায় তিনি শিক্ষাজীবন ধরে রাখেন। প্রতিবেশীদের ভাষ্য, প্রতিকূলতার মধ্যেও আলামিন পড়াশোনার প্রতি মনোযোগী এবং অত্যন্ত বিনয়ী।

প্রতিবেশী সাগর আলী বলেন, “আমাদের গ্রামে এমন মেধাবী ছেলে আর একটাও নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়া চারটিখানি কথা না। আমরা চাই সকলেই ওর পাশে দাঁড়াক।”

বিজ্ঞাপন

আরেক প্রতিবেশী খাইরুল ইসলাম বলেন, “ওর মা মারা যাওয়ার পরও ছেলেটা হাল ছাড়েনি। এখন টাকার জন্য যদি ওর পড়া বন্ধ হয়ে যায়, এটা খুবই দুঃখজনক। বিত্তবানদের এগিয়ে আসা উচিত।”

আলামিনের আর্থিক সংকটের কথা জানতে পেরে ভর্তির সময় তাকে ২০ হাজার টাকা সহযোগিতার কথা জানান পান্টি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. হাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, আলামিনের স্বপ্ন পূরণে সমাজের সামর্থ্যবান মানুষদের এগিয়ে আসা প্রয়োজন।

কুমারখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আখতার বলেন, বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এসেছে। আলামিন লিখিত আবেদন করলে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এবং বিভিন্ন সরকারি বৃত্তির আওতায় তাকে সাধ্যমতো সহযোগিতা করার চেষ্টা করা হবে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD