Logo

মৃত্যুকে হারিয়ে সেই স্বপ্ন পূরণ করলেন তাইজুল

profile picture
জেলা প্রতিনিধি
মাদারীপুর
২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২০:৪৭
মৃত্যুকে হারিয়ে সেই স্বপ্ন পূরণ করলেন তাইজুল
ছবি প্রতিনিধি।

মাত্র আড়াই বছর বয়সে বাবাকে হারিয়েছিলেন এস এম তাইজুল ইসলাম। স্বামীকে হারিয়ে তিন সন্তানকে নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েন মা হাওয়া বেগম। অভাবের সংসারে কখনো একবেলা খাবার জোটেনি, কখনো সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে না পেরে কেঁদেছেন তিনি। তবু হাল ছাড়েননি। একটাই স্বপ্ন ছিল—ছেলেকে পড়াশোনা করিয়ে একদিন বিচারকের আসনে বসাবেন।

বিজ্ঞাপন

মায়ের সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। তবে বিচারকের আসনে বসার পথটি মোটেও সহজ ছিল না। দারিদ্র্য, পিতৃহীন শৈশয় ও কঠোর সংগ্রামের পর যখন স্বপ্ন পূরণের পথে এগোচ্ছিলেন তাইজুল, তখনই নেমে আসে জীবনের সবচেয়ে কঠিন বিপর্যয়। একে একে অকেজো হয়ে যায় তাঁর দুই কিডনি। শুরু হয় নিয়মিত ডায়ালাইসিস। প্রয়োজন পড়ে কিডনি প্রতিস্থাপনের। চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেতে হয় পরিবারকে।

একসময় হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে মৃত্যুর প্রহর গুনছিলেন তাইজুল। যে পরিবারে একবেলা খাবার জোগাড় করাই কঠিন ছিল, তাদের কাছে চিকিৎসার জন্য ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা জোগাড় করা ছিল প্রায় অসম্ভব। তখন পাশে দাঁড়ান বন্ধু, সহপাঠী, বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ভাই, আত্মীয়স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা। মায়ের অক্লান্ত চেষ্টা আর মানুষের সহযোগিতায় শেষ পর্যন্ত ২০১৭ সালে ভারতে গিয়ে কিডনি প্রতিস্থাপন করান তিনি।

মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আবার পড়াশোনায় ফেরেন তাইজুল। দীর্ঘ লড়াই শেষে ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় ১২০তম স্থান অর্জন করে চূড়ান্তভাবে সিভিল জাজ হিসেবে উত্তীর্ণ হয়েছেন তিনি। হাসপাতালের বিছানা থেকে বিচারকের আসনে পৌঁছানোর এই গল্পে মিশে আছে একজন মায়ের ত্যাগ, সন্তানের অদম্য লড়াই এবং মানুষের মানবিক সহযোগিতার অনন্য দৃষ্টান্ত।

বিজ্ঞাপন

মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার পূর্ব এনায়েতনগর ইউনিয়নের পূর্ব আলীপুর গ্রামের সন্তান তাইজুল ইসলাম। মাত্র আড়াই বছর বয়সে বাবাকে হারান তিনি। এরপর তিন সন্তানকে মানুষ করার পুরো দায়িত্ব এসে পড়ে মা হাওয়া বেগমের ওপর।

সংসারে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী। সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে নিতে কঠোর পরিশ্রম করেছেন হাওয়া বেগম। কখনো মাঠে কাজ করেছেন, কখনো নিজের প্রয়োজনের কথা ভুলে সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিয়েছেন। বিভিন্ন সময়ে সহযোগিতা নিয়েছেন নিজের ভাইদের কাছ থেকেও।

হাওয়া বেগম বলেন, “স্বামী মারা যাওয়ার পর সন্তানদের নিয়ে অনেক কষ্ট করেছি। কখনো এমনও হয়েছে, ছেলেমেয়েদের মুখে খাবার দিতে পারিনি। আমার ভাইয়েরা তখন আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। মাঠে কাজ করেছি, পরিশ্রম করেছি। আমার একটাই স্বপ্ন ছিল—আমার ছেলে একদিন জজ হবে।”

বিজ্ঞাপন

প্রায় ৩১ বছর ধরে একাই সন্তানদের জন্য সংগ্রাম করেছেন এই মা। তাঁর সেই দীর্ঘ ত্যাগের যেন পূর্ণতা এসেছে ছেলের বিচারক হওয়ার মধ্য দিয়ে।

অভাব-অনটনের মধ্যেও পড়াশোনায় মেধার স্বাক্ষর রাখেন তাইজুল। ২০০৮ সালে আলীপুর দাখিল মাদ্রাসা থেকে দাখিল পরীক্ষায় গোল্ডেন এ+ অর্জন করেন তিনি। মাদ্রাসাটির ইতিহাসে তিনিই প্রথম গোল্ডেন এ+ পাওয়া শিক্ষার্থী।

পরে ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ঢাকা কলেজে মানবিক বিভাগে ভর্তি হন। ২০১০ সালের এইচএসসি পরীক্ষাতেও এ+ অর্জন করেন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি পরীক্ষায় মেধাক্রমে ৫৮তম স্থান অর্জন করে আইন বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। ২০১৫ সালে এলএলবি এবং ২০১৮ সালে এলএলএম সম্পন্ন করেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

তখন স্বপ্নের পথ অনেকটাই পরিষ্কার। কিন্তু এর মধ্যেই শুরু হয় তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়।

২০১৩ সাল থেকে শারীরিক নানা জটিলতায় ভুগতে শুরু করেন তাইজুল। প্রথমে কোমর ও পিঠে ব্যথা, পরে ২০১৫ সালে কিডনির সমস্যা ধরা পড়ে। একপর্যায়ে চিকিৎসকেরা জানান, তাঁর দুই কিডনিই অকেজো হয়ে গেছে।

শুরু হয় নিয়মিত ডায়ালাইসিস। বাড়তে থাকে চিকিৎসার ব্যয়। একসময় চিকিৎসকেরা কিডনি প্রতিস্থাপনের পরামর্শ দেন। প্রয়োজন হয় প্রায় ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা। কিন্তু পরিবারের আর্থিক অবস্থার কারণে এই অর্থ জোগাড় করা ছিল দুঃসাধ্য।

বিজ্ঞাপন

তাইজুল বলেন, “আমার দুটি কিডনি যখন ড্যামেজ হয়ে গেল, তখন লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। আমি তখন অনার্স তৃতীয় বর্ষে। আমাদের ঘরে খাওয়ার মতো চালও থাকত না। এমন অবস্থায় ৩০ লাখ টাকা চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন হলো। তখন মনে হয়েছিল, আমি হয়তো আর বাঁচব না, মায়ের স্বপ্নও পূরণ করতে পারব না।”

তাইজুলের অসুস্থতার খবর ছড়িয়ে পড়লে পাশে দাঁড়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু, সহপাঠী, বড় ভাই, আত্মীয়স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা। যে যার সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন।

ছেলের চিকিৎসার জন্য নিজের জমিজমা ও যা কিছু ছিল, তা বিক্রি করেও অর্থ জোগাড়ের চেষ্টা করেন হাওয়া বেগম। তাতেও প্রয়োজনীয় অর্থ পূরণ হচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত মানুষের সহযোগিতায় চিকিৎসার অর্থ জোগাড় হয়। ২০১৭ সালে ভারতে গিয়ে কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয় তাইজুলের।

বিজ্ঞাপন

হাওয়া বেগম বলেন, “আমার ছেলে এমন রোগে পড়েছিল যে মনে হয়েছিল, তাকে আর বাঁচাতে পারব না। কিন্তু আল্লাহর রহমতে আর মানুষের সহযোগিতায় সে ফিরে এসেছে। আমার ছেলে আজ জজ হয়েছে। আমার সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। আল্লাহর কাছে আমি কৃতজ্ঞ।”

সেই দুঃসহ সময়ের কথা মনে করে তাইজুল বলেন, “একদিকে আমার জীবন, অন্যদিকে আমার ক্যারিয়ার—সবকিছু শেষের দিকে চলে গিয়েছিল। তখন মনে হতো, আমি যদি মারা যাই, তাহলে কীভাবে জজ হব? এই চিন্তা আমাকে আরও ভেঙে দিত। কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি।”

কিডনি প্রতিস্থাপনের পর ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে আবার পড়াশোনায় ফেরেন তিনি। শারীরিক নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও নিজের স্বপ্নকে সামনে রেখে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে থাকেন।

বিজ্ঞাপন

তাইজুল বলেন, “আমি মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে ফিরেছি। আমার মা চেয়েছিলেন আমি জজ হই। বন্ধুবান্ধব, বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ভাই, আত্মীয়স্বজন—অনেকে আমাকে সহযোগিতা করেছেন। তাঁরা যদি সেদিন পাশে না দাঁড়াতেন, হয়তো আমি আজ এখানে থাকতাম না। আল্লাহর রহমতে আমি বেঁচে আছি এবং আজ জজ হতে পেরেছি। আমি সবার প্রতি কৃতজ্ঞ।”

অবশেষে আসে সেই কাঙ্ক্ষিত দিন। ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় ১২০তম স্থান অর্জন করে সিভিল জাজ হিসেবে উত্তীর্ণ হন এস এম তাইজুল ইসলাম।

যে মা একসময় ছেলের চিকিৎসার জন্য মানুষের দ্বারে দ্বারে সহযোগিতা চেয়েছেন, সেই মায়ের চোখে এখন আনন্দের অশ্রু। দীর্ঘ ৩১ বছরের সংগ্রামের পর ছেলের সাফল্য যেন তাঁর সব কষ্টকে সার্থক করে দিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

তাইজুলের ভাই নাজমুল ও বোন খুরশিদা বলেন, “আমরা কখনো ভাবিনি ভাই আবার সুস্থ হয়ে সংসারের হাল ধরবে। এমন রোগ হয়েছিল যে সবাই ভেবেছিল, সে হয়তো আর বাঁচবে না। কিন্তু আল্লাহর রহমত আর মানুষের সহযোগিতায় ভাই বেঁচে ফিরেছে। আজ সে জজ হয়েছে, মায়ের স্বপ্ন পূরণ করেছে। এটা আমাদের জন্য অনেক বড় আনন্দের।”

তাইজুলের সাফল্যে আনন্দিত তাঁর এলাকার মানুষও। তাঁদের ভাষ্য, একসময় যে ছেলেকে নিয়ে সবাই শঙ্কায় ছিলেন, সেই ছেলেই আজ এলাকার গর্ব।

তাইজুল ইসলামের গল্প শুধু একজন মেধাবী শিক্ষার্থীর সাফল্যের গল্প নয়। এটি একজন মায়ের দীর্ঘ ত্যাগ, একজন সন্তানের অদম্য লড়াই এবং মানুষের সম্মিলিত সহযোগিতায় ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প।

বিজ্ঞাপন

পিতৃহীন শৈশব, দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা, দুই কিডনি অকেজো হয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়া, নিয়মিত ডায়ালাইসিস, কিডনি প্রতিস্থাপন—জীবনের প্রতিটি ধাপেই নতুন পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছেন তিনি।

একসময় হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে যে তরুণের একমাত্র আকুতি ছিল বেঁচে থাকা, সেই তাইজুলই আজ বিচারকের আসনে বসার অপেক্ষায়। তাঁর এই পথচলায় পূরণ হয়েছে মায়ের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন; আর প্রমাণিত হয়েছে—কঠিন সময় যত দীর্ঘই হোক, মানুষের সহযোগিতা ও অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে ঘুরে দাঁড়ানোর পথ তৈরি করা সম্ভব।

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD