Logo

বানারীপাড়ায় মাটি খেকোদের দৌরাত্ম্য

profile picture
জেলা প্রতিনিধি
বরিশাল
২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২২:০৩
বানারীপাড়ায় মাটি  খেকোদের দৌরাত্ম্য
ছবি প্রতিনিধি।

বরিশালের বানারীপাড়ায় সন্ধ্যা নদী ঘিরে অবৈধ মাটি উত্তোলনের ভয়াবহ দৌরাত্ম্যের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রভাবশালী একটি চক্রের ছত্রচ্ছায়ায় নদীর চর ও দুই তীর থেকে নির্বিচারে মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছে ইটভাটাগুলো।

বিজ্ঞাপন

দিনের আলোয় কিংবা গভীর রাতের আঁধারে চলমান এই মাটি লুণ্ঠনে নদীর স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ, তীরের স্থিতিশীলতা এবং জনবসতির অস্তিত্ব ক্রমেই বিপন্ন হয়ে পড়ছে। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে চলা এ অবৈধ কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে উঠছে না। ফলে নদীভাঙনের অভিঘাতে একের পর এক বসতভিটা, ফসলি জমি ও সরকারি সম্পত্তি নদীগর্ভে বিলীন হলেও সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে দেখা দিয়েছে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্ন।

স্থানীয় সূত্রের দাবি, প্রতিদিন গভীর রাত থেকে পরদিন বেলা ১১টা পর্যন্ত সন্ধ্যা নদীর বিভিন্ন চর ও তীরবর্তী এলাকা থেকে ট্রলারে করে মাটি উত্তোলন করা হয়। সম্প্রতি উপজেলার উত্তর নাজিরপুর ধানহাট খোলা সংলগ্ন সন্ধ্যা নদীর চর থেকে ৫-৬টি ট্রলারে মাটি উত্তোলনের সময় প্রশাসন একটি ট্রলার আটক করে। তবে পরে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা না নিয়ে নামমাত্র মুচলেকায় ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, এমন ঘটনায় অবৈধ মাটি উত্তোলনকারীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীতীরবর্তী মানুষ অবৈধ মাটি কাটা বন্ধে পুলিশকে অবহিত করলেও অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। এমনকি অতিষ্ঠ হয়ে এলাকাবাসী নিজেরাই কোনো কোনো মাটিবাহী ট্রলার আটক করলে তাদের বিরুদ্ধেই নানা অভিযোগ তোলার ঘটনাও ঘটছে বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা।

বিজ্ঞাপন

অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট স্থানীয়দের দাবি, একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট অর্থের বিনিময়ে নদীর চর ও সরকারি সম্পত্তির মাটি ইটভাটার মালিকদের কাছে সরবরাহ করছে। উপজেলার বাইশারী ইউনিয়নের বউসের হাটের চর, জম্বদ্বীপের চর, ধানহাট খোলার চর, খেজুরবাড়ির চর, চাখারের চর ও মীরের হাটের চরসহ বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতিনিয়ত মাটি কেটে নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

জানা গেছে, বানারীপাড়ার বিভিন্ন ইটভাটায় প্রতিদিন একাধিক মাটিবাহী ট্রলার যাতায়াত করছে। এতে সন্ধ্যা নদীর তীরবর্তী নাজুক ভূপ্রকৃতি আরও ভঙ্গুর হয়ে পড়ছে। নির্বিচারে মাটি অপসারণের ফলে নদীতীরের মাটি ধসে পড়ার ঝুঁকি বাড়ছে এবং ভাঙনের তীব্রতাও বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে স্থানীয়দের আশঙ্কা। ইতোমধ্যে এর ভয়াবহ পরিণতির শিকার হয়েছেন নদীতীরবর্তী বহু পরিবার। স্থানীয়দের দাবি, সম্প্রতি ব্রাহ্মণকাঠী সংলগ্ন নদীতীরের প্রায় ৩০-৩৫টি পরিবারের ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ব্রাহ্মণকাঠী বালির খোলা এলাকার বিস্তীর্ণ অংশও নদীগর্ভে হারিয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। এমনকি এক অসহায় নারীর শেষ সম্বল স্বামীর কবরটিও নদীর ভাঙনে বিলীন হয়ে যাওয়ার হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অন্যদিকে, সম্প্রতি জম্বদ্বীপ এলাকায় গাছপালাসহ একটি বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার ঘটনাও প্রত্যক্ষ করেছেন স্থানীয়রা। একের পর এক বসতভিটা ও আবাদি জমি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন নদীপাড়ের মানুষ। ভাঙনের সঙ্গে অবৈধভাবে মাটি উত্তোলনের যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয়দের অভিযোগ, কোটি কোটি টাকার সরকারি সম্পত্তি এবং নদীতীরবর্তী মানুষের জীবন-জীবিকা ঝুঁকির মুখে পড়লেও অবৈধ মাটি উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও টেকসই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা পরিলক্ষিত হচ্ছে না। এর ফলে প্রশাসনিক নজরদারি, আইন প্রয়োগের কার্যকারিতা এবং সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।

ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দারা অবিলম্বে সন্ধ্যা নদী থেকে অবৈধভাবে মাটি উত্তোলন বন্ধ, নদীতীর রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ, মাটি উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় কঠোর নজরদারির দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে অবৈধ মাটি উত্তোলনের সঙ্গে কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি বা চক্রের সম্পৃক্ততা থাকলে তদন্তের মাধ্যমে তা উদ্ঘাটন করে ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।

কোটি কোটি টাকার সরকারি সম্পত্তি ও নদীপাড়ের মানুষের জীবন-জীবিকা ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়ে প্রভাবশালী চক্র, পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের এই ‘ম্যানেজড’ নীরবতা ও অপরাধীদের প্রশ্রয় দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সর্বস্তরের জনগণ। তবে অবৈধ মাটি উত্তোলন, প্রশাসন বা পুলিশের যোগসাজশ এবং মাটি উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও পুলিশের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD