Logo

টুপটুপ রিসোর্টে আগুন লাগার পরপরই বের করে আনা হয় মালিকের কুকুর-বিড়াল

profile picture
জেলা প্রতিনিধি
কক্সবাজার
১৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১৪:৪০
টুপটুপ রিসোর্টে আগুন লাগার পরপরই বের করে আনা হয় মালিকের কুকুর-বিড়াল
ছবি: সংগৃহীত

কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে টুপটুপ রেস্ট্রো অ্যান্ড রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ১০ পর্যটকের মরদেহ উদ্ধার করেছে ফায়ার সার্ভিস। ঘটনার ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও যশোরের একই পরিবারের চার সদস্যের সন্ধান পাওয়া যায়নি। আগুন ছড়িয়ে পড়ার পর রিসোর্টের কর্মীরা প্রাণ বাঁচাতে দ্রুত বাইরে বেরিয়ে যান। এ সময় মালিকের পোষা দুটি কুকুর ও চারটি বিড়ালও রিসোর্ট থেকে বের করে আনা হয়।

বিজ্ঞাপন

শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৬টার দিকে রিসোর্টটির রান্নাঘরে গ্যাসের চুলায় চা বসিয়ে এক কর্মী ঘুমিয়ে পড়েছিলেন বলে প্রত্যক্ষদর্শী ও কর্মীদের বরাতে জানা গেছে। কিছুক্ষণ পর রান্নাঘর থেকে বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। এরপর দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ে তিনতলা কাঠের ভবনটিতে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, আগুন লাগার পর রিসোর্টের অধিকাংশ কর্মী ও কয়েকজন অতিথি দ্রুত বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন। তবে কয়েকজন অতিথি কক্ষের ভেতরে আটকা পড়েন। রিসোর্টের দ্বিতীয় তলায় মালিকের পোষা কুকুর ও বিড়াল রাখা ছিল। আগুন ছড়িয়ে পড়ার পর চার থেকে পাঁচজন কর্মী প্রাণীগুলো নিয়ে বাইরে চলে আসেন।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

রিসোর্টের কাছাকাছি বসবাসকারী এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, বিস্ফোরণের শব্দে তাঁর ঘুম ভেঙে যায়। বাইরে এসে তিনি রিসোর্টটিতে আগুন জ্বলতে দেখেন। এ সময় কয়েকজন কর্মীকে কুকুর ও বিড়াল নিয়ে ছোটাছুটি করতে দেখা যায়। তাঁর ভাষ্য, রিসোর্টের মালিক তানভীর সুলতান মিয়াকে প্রায়ই পোষা কুকুর নিয়ে সমুদ্রসৈকতে হাঁটতে দেখেছেন।

অগ্নিকাণ্ড ও প্রাণহানির ঘটনায় উখিয়া থানায় একটি মামলা করেছে পুলিশ। মামলায় রিসোর্টের মালিক তানভীর সুলতান মিয়াকে প্রধান আসামি করে চারজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর ব্যবসায়িক অংশীদার নিয়াজ মোরশেদকেও আসামি করা হয়েছে। ঘটনার দিন শনিবার সন্ধ্যায় আটক রেস্তোরাঁর ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সুমনকে মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে অপর এক আসামির পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।

বিজ্ঞাপন

গ্রেপ্তারের আগে সাংবাদিকদের সুমন জানান, অগ্নিকাণ্ডের সময় রিসোর্টে তিনি ছাড়াও ১৮ জন কর্মী ছিলেন। আগুন লাগার পর তাঁরা দ্রুত বাইরে বেরিয়ে আসেন। এ ছাড়া রিসোর্টের নয়টি কক্ষের মধ্যে ছয়টিতে ২১ জন অতিথি অবস্থান করছিলেন বলে জানান তিনি।

অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে রিসোর্টের মালিক তানভীর সুলতান মিয়া পলাতক রয়েছেন বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। তাঁর ব্যবসায়িক অংশীদার নিয়াজ মোরশেদেরও কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

২০২২ সালের জুনে চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার বাসিন্দা টিপু সুলতান মিয়ার ছেলে তানভীর সুলতান মিয়া উখিয়ার ইনানী মৌজায় গিয়াস উদ্দিন গংয়ের কাছ থেকে মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন প্রায় ১০ শতক জমি কেনেন। জমিটির মূল্য ছিল প্রায় এক কোটি টাকা। পরে ব্যবসায়িক অংশীদার নিয়াজ মোরশেদকে সঙ্গে নিয়ে সেখানে টুপটুপ রিসোর্ট গড়ে তোলেন তিনি। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে প্রতিষ্ঠানটির বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু হয়।

বিজ্ঞাপন

রিসোর্ট ব্যবসার পাশাপাশি তানভীরের ‘সার্ফনেট’ নামে একটি ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। পর্যটকদের আকর্ষণ করতে রিসোর্টে বিভিন্ন প্রজাতির কুকুর ও বিড়াল রাখা হয়েছিল। এর মধ্যে ইতালীয় ও জার্মান প্রজাতির কুকুর ছাড়াও পার্সিয়ানসহ বিদেশি প্রজাতির বিড়াল ছিল। প্রাণীগুলো পোষার পাশাপাশি কেনাবেচার সঙ্গেও তিনি জড়িত ছিলেন বলে জানা গেছে।

ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ জানান, রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তা ছাড়পত্র ছিল না। গত জুনে পরিদর্শনের পর ভবনটিকে অনিরাপদ হিসেবে চিহ্নিত করে সতর্কতামূলক নোটিশ দেওয়া হয়েছিল।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

তিনি জানান, তিনতলা কাঠের ভবনটির নিচতলায় রেস্তোরাঁ এবং ওপরের দুই তলায় পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা ছিল। প্রয়োজনীয় অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা ও অনুমোদন ছাড়া এ ধরনের স্থাপনা পরিচালনা ঝুঁকিপূর্ণ।

অন্যদিকে, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী জসিম উদ্দিন জানান, রিসোর্টটির বৈধ অনুমোদন ছিল না। এ বিষয়ে নোটিশ দেওয়ার পরও মালিকপক্ষ প্রতিষ্ঠানটি সরিয়ে নেয়নি; বরং কার্যক্রম চালিয়ে গেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

অগ্নিকাণ্ডের কারণ ও সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো খতিয়ে দেখতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক আব্দুল মান্নান জানান, মঙ্গলবারের মধ্যে কমিটিকে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান জানান, মামলার প্রধান আসামি তানভীর সুলতান মিয়াসহ অন্য আসামিদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশের অভিযান ও তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।

ভয়াবহ এই অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির পাশাপাশি রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় অনুমোদন এবং সতর্কতামূলক নোটিশের পরও কার্যক্রম চালু রাখার বিষয়গুলো সামনে এসেছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন ও পুলিশের তদন্তে এসব বিষয়ে আরও তথ্য উঠে আসতে পারে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD