Logo

কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস নিয়ে বিএনপির দুই পক্ষের রশি টানাটানি

profile picture
জেলা প্রতিনিধি
শরীয়তপুর
২ নভেম্বর, ২০২৬, ১৯:৩৯
কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস নিয়ে বিএনপির দুই পক্ষের রশি টানাটানি
ছবি: সংগৃহীত

শরীয়তপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস কোথায় স্থাপন করা হবে, তা নিয়ে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে বিরোধ ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। জেলা শহরের কাছাকাছি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবিতে সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব মোর্শেদ টিপু মাদবরের নেতৃত্বে আন্দোলন চলছে। অন্যদিকে জাতীয় সংসদের হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহম্মেদ অপুকে নিয়ে কটূক্তির অভিযোগে টিপুর বিরুদ্ধে পাল্টা বিক্ষোভে নেমেছে বিএনপির আরেকটি অংশ।

বিজ্ঞাপন

এ ঘটনায় জেলা যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের একাংশের নেতাকর্মীরা টিপু মাদবরকে দল থেকে বহিষ্কার এবং গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন। পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান নির্ধারণের দাবির পাশাপাশি বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধও প্রকাশ্যে এসেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান নিয়ে আন্দোলন

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২১ সালে শরীয়তপুরে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ওই বছরের অক্টোবরে সরকার বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়। শুরুতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নামে প্রতিষ্ঠানটির নামকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। পরে ২০২৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আইন চূড়ান্ত অনুমোদন পায় এবং একই বছরের ১৩ নভেম্বর গেজেট প্রকাশিত হয়।

বিজ্ঞাপন

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার বিশ্ববিদ্যালয়টির নাম পরিবর্তন করে শরীয়তপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় রাখে। চলতি বছরের ৮ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. হোসেন উদ্দিন শেখরকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাসের স্থান নির্ধারণ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।

গত ১৬ অক্টোবর জাতীয় সংসদের হুইপ ও শরীয়তপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মিয়া নুরুদ্দিন আহম্মেদ অপু বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং জেলা প্রশাসককে সঙ্গে নিয়ে ডামুড্যা উপজেলার পূর্ব ডামুড্যা এলাকায় একটি জমি পরিদর্শন করেন। সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস স্থাপনের পরিকল্পনার কথা জানানো হয়। প্রস্তাবিত স্থানটি জেলা শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে।

এ সিদ্ধান্তের পর বিশ্ববিদ্যালয়টি জেলা সদরের আশপাশে স্থাপনের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। গত ২৩ অক্টোবর শরীয়তপুর-ঢাকা মহাসড়কের কোটাপাড়া ব্রিজসংলগ্ন এলাকায় মানববন্ধন করেন তাঁরা।

বিজ্ঞাপন

এরপর ২৮ অক্টোবর সদর উপজেলা পরিষদের সামনে থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে মিছিলটি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়ে শেষ হয়। পরে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়।

সর্বশেষ ১ নভেম্বর সন্ধ্যায় তৃতীয় দফায় কর্মসূচি পালন করেন আন্দোলনকারীরা। এদিন মানববন্ধন, বিক্ষোভ ও মশাল মিছিলের পাশাপাশি প্রায় ৩০ মিনিট সড়ক অবরোধ করা হয়।

আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বিএনপির দুই পক্ষ মুখোমুখি

বিজ্ঞাপন

স্থানীয় সূত্র জানায়, ২৮ অক্টোবরের বিক্ষোভ কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেন সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব মোর্শেদ টিপু মাদবর। তাঁর সঙ্গে জেলা যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম লিটন মুন্সিসহ বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা অংশ নেন। টিপুর নেতৃত্বে সদর, জাজিরা ও নড়িয়াসহ বিভিন্ন এলাকার কয়েক হাজার মানুষ কর্মসূচিতে যোগ দেন।

এই কর্মসূচির পর সাবেক ছাত্রদল নেতা মিজানের সঙ্গে টিপু মাদবরের মুঠোফোনে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়। ওই কথোপকথনে জাতীয় সংসদের হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহম্মেদ অপুকে নিয়ে আপত্তিকর শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিএনপির অন্য একটি অংশের নেতাকর্মীরা টিপুর বিরুদ্ধে অবস্থান নেন।

এর ধারাবাহিকতায় ১ নভেম্বর সকালে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন জেলা যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের একাংশের নেতাকর্মীরা। এতে নেতৃত্ব দেন জেলা যুবদলের সভাপতি জামাল উদ্দিন বিদ্যুৎ, জেলা ছাত্রদলের সভাপতি জাকির হাওলাদার এবং জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি আমানুল্লাহ আমান।

বিজ্ঞাপন

বিক্ষোভ শেষে টিপু মাদবরকে দল থেকে বহিষ্কার ও গ্রেপ্তারের দাবিতে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সরদার নাসির উদ্দিন কালুর কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়। এ সময় বিষয়টি দলের ঊর্ধ্বতন নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

অভিযোগ অস্বীকার করে যা বললেন টিপু

হুইপকে নিয়ে কটূক্তির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব মোর্শেদ টিপু মাদবর। তাঁর দাবি, আন্দোলন বা বিক্ষোভের কোনো পর্যায়েই তিনি মিয়া নুরুদ্দিন আহম্মেদ অপুকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেননি।

বিজ্ঞাপন

টিপু বলেন, মিজান নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর আগে থেকেই বিরোধ রয়েছে। ওই ব্যক্তি তাঁকে নিয়ে লেখালেখি করায় ফোনে তাঁর সঙ্গে বাকবিতণ্ডা হয়। সেখানে ভুলবশত কিছু বলে থাকলেও থাকতে পারে।

তিনি বলেন, ‘মূলত আমি অপু (হুইপ) ভাইকে সম্মান করি। তার বিরুদ্ধে আমি কেন কথা বলব? আমি তর্ক করেছি মিজানের সঙ্গে। দলের একটি অংশ মিজানের সঙ্গে হওয়া কথোপকথনকে ভুলভাবে উপস্থাপন করে দাবি করেছে, আমি হুইপ মহোদয়কে নিয়ে কটূক্তি করেছি।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান নিয়ে আন্দোলনের কারণ ব্যাখ্যা করে টিপু বলেন, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়টি ঢাকা-শরীয়তপুর মহাসড়কের পাশে কোনো সুবিধাজনক স্থানে স্থাপন করা হলে শিক্ষার্থীরা বেশি উপকৃত হবেন। জেলা শহরের কাছাকাছি হলে যোগাযোগ, স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষার্থীদের টিউশনের সুযোগ বাড়বে।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া সব শিক্ষার্থী ধনী পরিবারের নয়। জেলা শহরে একটি প্রাইভেট পড়িয়ে শিক্ষার্থীরা পাঁচ হাজার টাকা পেতে পারে। আর যেখানে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের কথা বলা হচ্ছে, সেখানে একটি প্রাইভেটের দাম ৫০০ টাকা হবে।’

প্রস্তাবিত স্থানটির অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরে তিনি আরও বলেন, সেখানে যোগাযোগব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সন্তোষজনক নয়। এ কারণে সরকারের কাছে বিষয়টি যাচাই করে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

টিপু জানান, এ বিষয়ে সরকারকে নির্ধারিত সময়সীমা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সমাধান না এলে পরবর্তী আন্দোলন কর্মসূচি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

বিজ্ঞাপন

টিপুর বিরুদ্ধে যা বলছে বিক্ষোভকারী

জেলা যুবদলের সভাপতি জামাল উদ্দিন বিদ্যুৎ বলেন, হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহম্মেদ অপুকে নিয়ে টিপু মাদবরের আপত্তিকর বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। বক্তব্যটি শুনলেই এর ধরন বোঝা যাবে। এ কারণেই তাঁর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে বিক্ষোভ করা হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান নিয়ে চলমান আন্দোলন প্রসঙ্গে জামাল উদ্দিন বিদ্যুৎ বলেন, টিপু একটি ফটোকার্ড শেয়ার করেছেন, যেখানে নড়িয়া, জাজিরা ও সদর উপজেলার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, এভাবে অন্য উপজেলাগুলোকে বাদ দিয়ে বিভাজন তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

তিনি আরও বলেন, ‘আওয়ামী লীগের লোকজন উসকানি দিয়ে শরীয়তপুরের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নষ্ট করতে চাচ্ছেন। তারা আমাদের নেতা জাতীয় সংসদের হুইপ মিয়া নুরুদ্দিন আহম্মেদ অপুর উন্নয়নমূলক কাজ বাধাগ্রস্ত করার ষড়যন্ত্র করছেন। বিএনপির কিছু লোক এতে পা দিয়েছেন।’

বিরোধ মেটাতে আলোচনার উদ্যোগ জেলা বিএনপির

বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের স্থান নিয়ে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে মতবিরোধের বিষয়টি স্বীকার করেছেন জেলা বিএনপির সভাপতি ও শরীয়তপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য শফিকুর রহমান কিরণ।

বিজ্ঞাপন

তিনি জানান, এ বিষয়ে জেলার বিশিষ্ট ব্যক্তি, বিভিন্ন উপজেলার শিক্ষিত জনগোষ্ঠী এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা করে মতামত নেওয়া হবে।

শফিকুর রহমান কিরণ বলেন, ‘আমরা তিন স্থানীয় সংসদ সদস্য ও সাবেক সংসদ সদস্যরা মিলে সুষ্ঠু ও সুন্দর একটি সমাধানের লক্ষ্যে এগোব, যাতে এটি সার্বজনীন হয়।’

টিপু মাদবরের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এবং তাঁকে বহিষ্কারের দাবিতে দেওয়া স্মারকলিপি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের নির্দেশনা পেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দলের অভ্যন্তরে মতপার্থক্য দেখা দিলে সংশ্লিষ্টদের নিয়ে আলোচনার টেবিলে বসেও তা সমাধান করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

এদিকে হুইপকে নিয়ে কটূক্তির অভিযোগের বিষয়ে জানতে জাতীয় সংসদের হুইপ ও শরীয়তপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মিয়া নুরুদ্দিন আহম্মেদ অপুর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।

একই বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. হোসেন উদ্দিন শেখরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

সব মিলিয়ে শরীয়তপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাসের অবস্থান নির্ধারণের দাবি ঘিরে জেলায় রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। একদিকে বিশ্ববিদ্যালয় কোথায় হলে শিক্ষার্থীরা বেশি সুবিধা পাবেন, তা নিয়ে বিতর্ক চলছে; অন্যদিকে একই ইস্যুতে বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধও সামনে চলে এসেছে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD