হিমাগারে মজুত হাজার টন আলু, কেজি ১১ টাকাতেও মিলছে না ক্রেতা

কুড়িগ্রামের হিমাগারগুলোতে বিপুল পরিমাণ আলু মজুত থাকলেও বাজারে ক্রেতার দেখা মিলছে না। লোকসান কমাতে বাধ্য হয়ে প্রতি কেজি আলু ১১ থেকে ১২ টাকায় বিক্রি করছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। অথচ উৎপাদনের পাশাপাশি হিমাগারে সংরক্ষণের খরচ যোগ করলে প্রতি কেজি আলুর ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২০ টাকারও বেশি। ফলে কম দামে আলু বিক্রি করেও লোকসানের বোঝা কমাতে পারছেন না সংশ্লিষ্টরা।
বিজ্ঞাপন
এ পরিস্থিতিতে জেলার ছয়টি হিমাগারে বিপুল পরিমাণ আলু অবিক্রীত থেকে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সময়মতো এসব আলু বিক্রি করতে না পারলে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
কৃষক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে আলুর বাম্পার উৎপাদনের কারণে শুরু থেকেই বাজারে সরবরাহ বেশি ছিল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে খালি বস্তার সংকট, বস্তার বাড়তি দাম এবং হিমাগারের সংরক্ষণ খরচ বৃদ্ধি। বাজারে আলুর দাম বাড়বে, এমন প্রত্যাশায় অনেক কৃষক ও ব্যবসায়ী উৎপাদিত আলু বিক্রি না করে হিমাগারে রেখে দেন। কিন্তু প্রত্যাশার বিপরীতে বাজারে দাম ক্রমাগত কমতে থাকে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
এখন ঋণের কিস্তি, বস্তার দাম ও হিমাগারের ভাড়া পরিশোধ করতে গিয়ে বিপাকে পড়েছেন তারা। অনেক ক্ষেত্রে আলু বিক্রির অর্থ দিয়ে খরচের পুরোটা মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে লোকসান সামাল দিতে নিজেদের সঞ্চয় থেকেও টাকা দিতে হচ্ছে।
হিমাগারে আলু সংরক্ষণকারী কৃষক আব্দুল্লাহ বলেন, ভালো দাম পাওয়ার আশায় আলু হিমাগারে রেখেছিলেন তিনি। কিন্তু বর্তমানে যে দামে আলু বিক্রি হচ্ছে, তাতে উৎপাদন খরচই উঠছে না। এর সঙ্গে হিমাগার ভাড়া, বস্তা ও অন্যান্য ব্যয় যোগ হওয়ায় লোকসানের পরিমাণ আরও বেড়েছে।
বিজ্ঞাপন
স্থানীয় বাসিন্দা সেকেন্দার আলী বলেন, এ অঞ্চলে আলুর উৎপাদন বেশি হলেও একই সময়ে বিপুল পরিমাণ আলু বাজারে আসায় দাম কমে গেছে। বর্তমানে হিমাগার থেকে আলু বের করার জন্য কৃষকদের মধ্যে তাড়াহুড়া দেখা যাচ্ছে। কিন্তু পর্যাপ্ত পাইকার না থাকায় প্রত্যাশিত দামে আলু বিক্রি করতে পারছেন না তারা।
রোকন মিয়া বলেন, প্রতি কেজি ১১ থেকে ১২ টাকা দরে আলু বিক্রি করে কৃষকের কোনো লাভ হচ্ছে না। অনেকেই ঋণ নিয়ে আলু উৎপাদন ও সংরক্ষণ করেছেন। দ্রুত বাজারদর না বাড়লে তাদের আর্থিক সংকট আরও গভীর হবে।
এদিকে বাবর কোল্ড স্টোরেজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপক শরিফ আল মাসুদ জানান, চলতি বছর তাদের হিমাগারে মোট ১১ হাজার মেট্রিক টন আলু সংরক্ষণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত ছয় হাজার মেট্রিক টন বিক্রি হয়েছে। অবশিষ্ট রয়েছে আরও পাঁচ হাজার মেট্রিক টন। মজুত থাকা আলুর মধ্যে প্রায় এক হাজার মেট্রিক টন বীজ আলু।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
তিনি বলেন, বাকি আলু আগামী দুই মাসের মধ্যে বিক্রি করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। বাজারে ক্রেতার উপস্থিতি ও চাহিদা প্রত্যাশা অনুযায়ী না থাকায় হিমাগারে সংরক্ষিত আলু বিক্রি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
বিজ্ঞাপন
রাজারহাট উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তুষার কান্তি রায় বলেন, এ অঞ্চলের মাটি ও আবহাওয়া আলু চাষের জন্য বেশ উপযোগী। এ কারণে এখানে আলুর উৎপাদন তুলনামূলক বেশি হয়। পাশাপাশি উৎপাদন খরচও অন্য অনেক এলাকার তুলনায় কম। এসব কারণে কৃষকরা ব্যাপক পরিসরে আলু চাষে আগ্রহী হন। তবে একই সময়ে অতিরিক্ত উৎপাদন বাজারে এলে সরবরাহ বেড়ে যায় এবং স্বাভাবিকভাবেই দাম কমে যায়।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে হিমাগারগুলোতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আলু সংরক্ষিত রয়েছে। সঠিক ব্যবস্থাপনা ও বাজার পরিস্থিতির উন্নতির মাধ্যমে আলুর ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা সম্ভব হলে কৃষকদের দুর্ভোগ কমবে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন হিমাগারে পড়ে থাকা আলু নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও এড়ানো যাবে।
আলুর উৎপাদন বেশি হলেও ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় কুড়িগ্রামের কৃষকদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। উৎপাদন খরচ ও সংরক্ষণ ব্যয়ের সঙ্গে বাজারদরের বড় ব্যবধান থাকায় এখন লোকসান এড়ানোই তাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।








