মারধর-গ্রেপ্তার ইস্যুতে উত্তেজনা, যা ঘটেছিল রাবিতে

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এক শিক্ষার্থীকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিরোধ কয়েক দফা মারধর, দুইজনকে গ্রেপ্তার এবং ছাত্ররাজনীতি নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ঘটনাটিকে ঘিরে দেশজুড়ে আলোচনা-সমালোচনার পাশাপাশি ক্যাম্পাসেও তৈরি হয়েছে উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি। এদিকে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তদন্ত শুরু করেছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
আদালতের নির্দেশে মঙ্গলবার আটক দুইজনকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় কারাগারে পাঠানো হয়। এরপর থেকেই ছাত্রসংগঠনগুলোর পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে পরিস্থিতি আরও আলোচনায় আসে। বিভিন্ন শিক্ষার্থী সংগঠন ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের প্রবেশ ও সংঘবদ্ধ হামলার অভিযোগ তুলে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ দাবি করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, মঙ্গলবার পর্যন্ত নতুন করে কোনো সংঘর্ষের ঘটনা না ঘটলেও সার্বিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. মাহবুবুর রহমান জানান, ঘটনাটি তদন্তে একটি কমিটি কাজ করছে এবং আগামী ১০ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা রয়েছে। তদন্ত কমিটি ইতোমধ্যে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছে।
যেভাবে শুরু হয় পুরো ঘটনা
বিজ্ঞাপন
ঘটনার সূত্রপাত হয় সংস্কৃত বিভাগের এক নারী শিক্ষার্থীর অভিযোগকে কেন্দ্র করে। অভিযোগে তিনি একই বিভাগের এক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের পর হুমকি দেওয়ার কথা উল্লেখ করেন। বিষয়টি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আলোচনায় বসলে সেখানে কয়েকজন সাবেক শিক্ষার্থীও উপস্থিত হন এবং তর্ক-বিতর্কের সৃষ্টি হয়।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
পরদিন এ বিষয়ে আবার বৈঠক অনুষ্ঠিত হলে সেখানে ইতিহাস বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী আনাস আহমেদকে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের কর্মী বলে অভিযোগ করা হয়। এ সময় প্রক্টর কার্যালয়ের ভেতরেই তাকে মারধরের অভিযোগ ওঠে। প্রশাসনের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি সাময়িকভাবে শান্ত হলেও পরে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
পরে ছাত্রসংসদ ভবনে হামলার অভিযোগ ওঠার পর আনাস আহমেদ ও তার সহযোগীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষে আশ্রয় নেন। অভিযোগ রয়েছে, সেখানে গিয়েও তাদের ওপর হামলা চালানো হয়। এমনকি আহত এক ব্যক্তিকে অ্যাম্বুলেন্সে তোলার সময়ও তাকে নামিয়ে আবার মারধর করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
ঘটনার সময় উপস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিম ও কয়েকজন শিক্ষার্থী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলেও হামলা পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব হয়নি। এ ঘটনায় ছাত্রসংসদের সাধারণ সম্পাদক সালাহউদ্দিন আম্মারের ভূমিকা নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা প্রশ্ন উঠেছে। লাঠি হাতে তার উপস্থিতি এবং উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্যের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় বিষয়টি আরও আলোচিত হয়।
অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন মহল থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার পরিবর্তে ছাত্রসংসদ ও কিছু সংগঠনের নেতারা ঘটনায় সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছেন। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ছাত্রসংসদের সাধারণ সম্পাদক সালাহউদ্দিন আম্মার।
বিজ্ঞাপন
তার ভাষ্য, ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী প্রশাসনের পাশাপাশি ছাত্রসংসদের কাছেও অভিযোগ করেছিলেন। শিক্ষার্থীদের সমস্যা দেখার দায়িত্ব ছাত্রসংসদেরও রয়েছে এবং সেই দায়িত্ব থেকেই তারা পরিস্থিতির খোঁজখবর রেখেছেন।
অন্যদিকে, মারধরের শিকার দুইজন পুলিশ হেফাজতে থাকায় তাদের বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। তবে ঘটনার বিভিন্ন ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, যা নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা।
'রাজনৈতিক ট্যাগিং' নিয়ে নতুন বিতর্ক
বিজ্ঞাপন
ঘটনার পর সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে ‘রাজনৈতিক ট্যাগিং’-এর বিষয়টি। আটক দুইজনকে ছাত্রলীগের কর্মী হিসেবে চিহ্নিত করে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশ্ববিদ্যালয়ে পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি ফিরে আসছে কি না—এমন প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।
জানা গেছে, গ্রেপ্তার হওয়া আনাস আহমেদ ও মাহমুদুল হাসান ইতিহাস বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সূত্রের দাবি, তারা ছাত্রলীগের পদধারী নেতা ছিলেন না। যদিও অতীতে সংগঠনটির কিছু কর্মসূচিতে তাদের উপস্থিতি দেখা গেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এদিকে, অনেক শিক্ষার্থী বলছেন, কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয়ের অভিযোগ থাকলেও প্রশাসনিক তদন্ত ছাড়া তাকে মারধর করা গ্রহণযোগ্য নয়। তাদের মতে, এ ধরনের ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ ও নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী বলেন, অতীতে রাজনৈতিক পরিচয়ের অভিযোগ তুলে বিভিন্ন শিক্ষার্থীকে নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। সেই একই সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি হলে তা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অশনিসংকেত হবে।
ছাত্রসংগঠনগুলোর পাল্টাপাল্টি অবস্থান
ঘটনার পর ছাত্রদল, ছাত্রশিবির এবং ছাত্রসংসদের নেতারা একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন। ছাত্রদলের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, ছাত্রসংসদকে সামনে রেখে কিছু সংগঠন ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করছে এবং সংঘবদ্ধ হামলার পরিবেশ তৈরি করছে।
বিজ্ঞাপন
অন্যদিকে ছাত্রসংসদ ও ছাত্রশিবিরের নেতারা দাবি করেছেন, নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের কিছু কর্মীকে অন্য রাজনৈতিক পরিচয়ে আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। তাদের মতে, সাম্প্রতিক ঘটনায় আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার নানা তথ্য রয়েছে।
ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকেও হামলায় সংগঠনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। তাদের দাবি, হামলার খবর পেয়ে তারা ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন, তবে সংঘর্ষে অংশ নেননি।
তদন্তের অপেক্ষায় বিশ্ববিদ্যালয়
বিজ্ঞাপন
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, পুরো ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। তদন্তে কারও সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রক্টর ড. মাহবুবুর রহমান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব প্রশাসনের। কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা যাতে ভবিষ্যতে না ঘটে, সে বিষয়েও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এদিকে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ এবং আইনি প্রক্রিয়ার অগ্রগতির দিকে এখন নজর রয়েছে শিক্ষার্থী, শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্ট সবার। পুরো ঘটনার প্রকৃত চিত্র তদন্ত শেষ হওয়ার পরই আরও স্পষ্ট হবে।








