Logo

চিকিৎসার জন্য চাঁদা তোলেন কুবির অসুস্থ শিক্ষার্থীরা

profile picture
ক্যাম্পাস প্রতিনিধি
৩ অক্টোবর, ২০২৬, ১৬:০৪
চিকিৎসার জন্য চাঁদা তোলেন কুবির অসুস্থ শিক্ষার্থীরা
ছবি: সংগৃহীত

গুরুতর অসুস্থতায় চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে কোথাও জমি বিক্রি করতে হচ্ছে, কোথাও বাড়ি তৈরির জন্য রাখা জায়গা বিক্রি করতে হচ্ছে। আবার কোনো শিক্ষার্থীর চিকিৎসার জন্য সহপাঠীদের ছুটতে হচ্ছে বিভিন্ন জায়গায়, তুলতে হচ্ছে চাঁদা বা সংগ্রহ করতে হচ্ছে অর্থ। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) শিক্ষার্থীদের জন্য স্বাস্থ্যবীমা না থাকায় এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন গুরুতর অসুস্থ শিক্ষার্থীরা।

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা স্বাস্থ্যবীমার আওতায় চিকিৎসা ব্যয়ের নির্দিষ্ট অংশের আর্থিক সুবিধা পাচ্ছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের জন্য বছরে ২৭০ টাকা প্রিমিয়ামে স্বাস্থ্য ও জীবনবীমা চালু রয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসার ক্ষেত্রে একজন শিক্ষার্থী বছরে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিমা সুবিধা পেতে পারেন।

কুবির শিক্ষার্থী সাজ্জাদ হোসাইন শরিফ গত এক বছর ধরে লিউকেমিয়ায় আক্রান্ত। চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে তাঁর পরিবারকে জমি বিক্রি করতে হয়েছে। দুই মাস আগে তিনি বোনমেরু ট্রান্সপ্লান্ট করিয়েছেন, এতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা। এর একটি অংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও বিভাগের সহযোগিতায় সংগ্রহ করা হয়েছে। পুরোপুরি সুস্থ না হওয়ায় এখনো তাঁকে কেমোথেরাপিসহ অন্যান্য চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। এতে প্রতি মাসে প্রায় ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা ব্যয় হচ্ছে।

সাজ্জাদ বলেন, ‘কিছু জায়গাজমি বেচে এবং আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে সহযোগিতা নিয়ে দশ মাস চিকিৎসা করেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠীরা তাদের উদ্যোগে কিছু টাকা ম্যানেজ করে দিয়েছে। বোনমেরু ট্রান্সপ্লান্টের পর ভেবেছিলাম ভালো হয়ে যাব। প্রতি মাসে এখনও লাখ টাকা খরচ হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাস্থ্যবিমা সুবিধা থাকলে কিছুটা চাপ কম হতো।’

বিজ্ঞাপন

একই ধরনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন কুবির আরেক শিক্ষার্থী তাসনিম হক অনন্যা। ক্যানসারজনিত সমস্যা থেকে সম্প্রতি আরোগ্য লাভ করলেও এখনো প্রতি মাসে ওষুধ বাবদ তাঁর প্রায় ৬০ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে তাঁর বাবা বাড়ি তৈরির জন্য সংরক্ষণ করে রাখা জায়গা বিক্রি করেছেন। তাঁর সহপাঠীরাও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে অর্থ সংগ্রহ করে চিকিৎসায় সহযোগিতা করেছেন।

তাসনিম হক অনন্যা বলেন, ‘আমার ক্যানসারের ধরন অনেক অ্যাগ্রেসিভ ছিল। দ্রুত সময়ের মধ্যেই চিকিৎসা শুরু করতে হয়েছিল। প্রথম দিকে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা প্রয়োজন ছিল। একসময়ে টাকা এত বেশি লাগছিল যে বাবা বাড়ি তৈরির জায়গা বিক্রি করেছেন। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুরা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে টাকা ম্যানেজ করেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাস্থ্যবিমা থাকলে আমাকে এত অর্থনৈতিক চাপে পড়তে হতো না। আমাদের যেসব বন্ধুবান্ধব বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘুরে ঘুরে টাকা তুলেছে, তাদের ক্লাস-পরীক্ষাও মিস হতো না। আমি চাই স্বাস্থ্যবিমার ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় উদ্যোগ গ্রহণ করুক।’

বিজ্ঞাপন

শুধু সাজ্জাদ ও তাসনিম নন, গুরুতর অসুস্থ আরও অনেক শিক্ষার্থীকে চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে সহপাঠী, বিভাগ বা বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক উদ্যোগ এবং ক্রাউড ফান্ডিংয়ের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে বলে জানা গেছে। কেউ আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধারদেনা করছেন, আবার কেউ চিকিৎসা চালাতে বিভিন্নভাবে অর্থ সংগ্রহ করছেন। দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল চিকিৎসা তাই অনেক পরিবারের ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি করছে।

শিক্ষার্থীদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে স্বাস্থ্যবীমা চালু হলে গুরুতর অসুস্থতার সময় চিকিৎসা ব্যয়ের একটি অংশ বিমার আওতায় আসতে পারে। এতে পরিবারের আর্থিক চাপ কমার পাশাপাশি চিকিৎসার জন্য সহপাঠীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহের প্রয়োজনও কমবে।

প্রতিষ্ঠার দুই যুগ পেরিয়ে গেলেও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য স্বাস্থ্যবীমা চালু হয়নি। তবে শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জীবন ও স্বাস্থ্যবীমার ব্যবস্থা রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রগতি লাইফ ইনস্যুরেন্স লিমিটেডের মধ্যে শিক্ষক এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য সাময়িক জীবনবীমার চুক্তি স্বাক্ষর হয়। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. হায়দার আলীর উপস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও জেনিথ ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্সের মধ্যে শিক্ষক এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য জীবন ও স্বাস্থ্যবীমার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

ওই সময় শিক্ষার্থীদের জন্য দ্রুত সময়ের মধ্যে সেমিস্টারপ্রতি ১০০ টাকা প্রিমিয়ামে স্বাস্থ্যবীমা চালুর আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এরপরও শিক্ষার্থীদের জন্য বিমা চালুর দৃশ্যমান কার্যক্রম হয়নি বলে দাবি শিক্ষার্থীদের।

এদিকে দেশের কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য স্বাস্থ্যবীমা চালু রয়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২২ সালের ১ জুলাই থেকে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য ও জীবনবীমা সুবিধা চালু হয়। বছরে ২৫০ টাকা প্রিমিয়ামে শিক্ষার্থীরা এ সুবিধার আওতায় আসেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসার ক্ষেত্রে বছরে নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত এবং বহির্বিভাগের চিকিৎসাতেও বিমা সুবিধা রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষার্থীদের জন্য বছরে ২৭০ টাকা প্রিমিয়ামে স্বাস্থ্য ও জীবনবীমা চালু রয়েছে। হাসপাতালে ভর্তি হলে বছরে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিমা সুবিধা এবং বহির্বিভাগের চিকিৎসায় নির্দিষ্ট সুবিধা পাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।

শিক্ষার্থী মন্দিরা দাস বলেন, ‘ঢাবি, রাবি ও জাবির মতো কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়েও স্বাস্থ্যবিমা থাকা দরকার। বিশেষ করে শিক্ষকদের এই ক্ষেত্রে ভাবা উচিত যে, তাদের শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে, শহরে এবং বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে চাঁদা তুলে চিকিৎসার খরচ চালায়। এই ক্ষেত্রে শিক্ষক এবং প্রশাসনের আরও আন্তরিক হয়ে চিন্তা করা উচিত।’

লোক প্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী মানসুরা আফরিন বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের জন্য স্বাস্থ্যবিমা থাকা এখন সময়ের দাবি। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশির ভাগ শিক্ষার্থী মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসে। হঠাৎ বড় ধরনের চিকিৎসার খরচ তাদের পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তাই বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যবিমা চালু করা হলে শিক্ষার্থীরা আর্থিক ঝুঁকি থেকে কিছুটা সুরক্ষা পেতে পারে।’

বিজ্ঞাপন

নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এক সড়ক দুর্ঘটনায় মারাত্মকভাবে আমার ডান হাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এরপর অপারেশন, সার্জারি ও যাবতীয় চিকিৎসার খরচসহ বিপুল পরিমাণ অর্থ আমার পরিবারকে ব্যয় করতে হয়েছে। এখনো আমি চিকিৎসাধীন। হঠাৎ করে এমন খরচ পরিবারের জন্য অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।’

শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যবীমা চালুর বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র পরামর্শক ও নির্দেশনা দপ্তরের পরিচালক ড. মোহাম্মদ জুলহাস উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘আমরা এই ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে, তথ্য বিশ্লেষণ করে যদি উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হয় তাহলে নিব।’

উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন সরকার বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যবিমার ব্যাপারে একবার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সে ক্ষেত্রে ইনস্যুরেন্স কোম্পানিগুলো কিছু জটিলতা দেখিয়েছে। আমরা আবার কথা বলব। কোনো কোম্পানি আগ্রহ দেখালে আমরা তাদের সঙ্গে কাজ করব।’

বিজ্ঞাপন

ফলে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের জন্য বিমা সুবিধা চালু থাকলেও গুরুতর অসুস্থতার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের এখনো পরিবার, স্বজন ও সহপাঠীদের সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের দাবি, দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার আর্থিক ঝুঁকি কমাতে দ্রুত তাদের জন্যও কার্যকর স্বাস্থ্যবীমা চালু করা প্রয়োজন।

জেবি/আরএক্স

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD