শ্রমিকদের বেতন দিতে ঋণ সহায়তা চায় পোশাক শিল্প মালিকরা

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়া, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অস্থিরতার প্রভাবে দেশের তৈরি পোশাক শিল্প বর্তমানে তীব্র আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছে। এ অবস্থায় আসন্ন ঈদুল ফিতরের আগে শ্রমিকদের বেতন-বোনাস ও মার্চ মাসের অগ্রিম মজুরি পরিশোধ নিশ্চিত করতে বিশেষ ঋণ সহায়তা চেয়েছে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)।
বিজ্ঞাপন
মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) বাংলাদেশ ব্যাংক-এর গভর্নরের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে সংগঠনটি জানায়, চলমান অর্থনৈতিক চাপে অনেক কারখানা তারল্য সংকটে রয়েছে। ফলে ঈদের আগে শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে এবং শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় দ্রুত বিশেষ প্রণোদনামূলক ঋণ সহায়তা প্রয়োজন।
আরও পড়ুন: লেবু-শসার দাম কমলেও বেগুনের দাম চড়া
রপ্তানি আয় কমেছে, কমেছে কার্যাদেশ
বিজ্ঞাপন
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে তৈরি পোশাক রপ্তানি আয় ২ দশমিক ৪৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য প্রতিযোগিতা তীব্র হওয়ায় পোশাকের ইউনিট মূল্য কমেছে। পাশাপাশি ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন এবং শুল্কযুদ্ধের প্রভাব ক্রেতাদের অর্ডার কমিয়ে দিয়েছে।
২০২৫ সালের নভেম্বরে ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি খোলার পরিমাণ ১২ দশমিক ৯০ শতাংশ কমেছে, যা ভবিষ্যৎ উৎপাদনের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। অনেক ক্ষেত্রে ডেফার্ড শিপমেন্ট এবং অর্ডার পিছিয়ে যাওয়ায় কারখানাগুলো নির্ধারিত সময়মতো উৎপাদন সম্পন্ন করতে পারছে না। ফলে নগদ প্রবাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
বন্ধ ৪০০ কারখানা, ঝুঁকিতে আরও বহু প্রতিষ্ঠান
বিজ্ঞাপন
বিজিএমইএ জানিয়েছে, ইতোমধ্যে প্রায় ৪০০টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। আরও অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানা আর্থিকভাবে টিকে থাকার লড়াই করছে। উৎপাদন ব্যয় বাড়ায় উদ্যোক্তারা শ্রমিকদের বেতন, ইউটিলিটি বিল, পরিবহন খরচ এবং ব্যাংক ঋণের সুদ পরিশোধে চরম চাপে আছেন।
এ ছাড়া ফেব্রুয়ারি-মার্চ ২০২৬ সময়ে ৬০ দিনের মধ্যে প্রায় ২৫ দিন কারখানা বন্ধ থাকার সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এতে উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রম আরও মন্থর হবে এবং নগদ সংকট তীব্র আকার ধারণ করতে পারে।
চট্টগ্রাম বন্দর অচলাবস্থা ও সরবরাহ বিঘ্ন
বিজ্ঞাপন
সম্প্রতি চট্টগ্রাম বন্দরে শ্রমিকদের শাটডাউন কর্মসূচির কারণে পণ্য খালাস ও রপ্তানি কার্যক্রমে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। এতে কাঁচামাল আমদানি ও প্রস্তুত পণ্য রপ্তানিতে বিলম্ব হয়েছে। ফলে অনেক কারখানাই সময়মতো চালান পাঠাতে পারেনি, যা ক্রেতাদের আস্থায়ও প্রভাব ফেলছে।
শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধে চাপ
বিজিএমইএ বলছে, দেশের লাখ লাখ শ্রমিকের জীবিকা এই শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। ঈদের আগে বেতন-বোনাস প্রদান না করতে পারলে সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে। তাই শ্রমিকদের পাওনা সময়মতো পরিশোধ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন: ভোক্তা পর্যায়ে দাম কমল এলপি গ্যাসের
সংগঠনটি দুই মাসের বেতনের সমপরিমাণ অর্থ সহজ শর্তে ঋণ হিসেবে দেওয়ার প্রস্তাব করেছে। তাদের দাবি, ৩ মাসের গ্রেস পিরিয়ডসহ ১২ মাসে পরিশোধযোগ্য একটি বিশেষ ঋণ প্যাকেজ ঘোষণা করা হোক। এতে প্রতিষ্ঠানগুলো সাময়িক আর্থিক চাপ কাটিয়ে উঠতে পারবে এবং উৎপাদন কার্যক্রম সচল রাখা সম্ভব হবে।
শিল্প টিকিয়ে রাখতে জরুরি সহায়তা
বিজ্ঞাপন
চিঠিতে বলা হয়েছে, তৈরি পোশাক খাত দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস এবং জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। এই শিল্পে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কাজ করেন, যাদের আয় দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বিজিএমইএর মতে, সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সময়োপযোগী সহায়তা ছাড়া বর্তমান পরিস্থিতিতে শিল্পকে সচল রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা দিলে শুধু শ্রমিকদের বেতন-বোনাসই নয়, সামগ্রিক উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রমও স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হবে।
সংগঠনটি আশা প্রকাশ করেছে, বাংলাদেশ ব্যাংক দ্রুত ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেবে এবং শিল্পখাতকে এই সংকটময় সময় পার হতে প্রয়োজনীয় আর্থিক সহায়তা দেবে।
বিজ্ঞাপন








