Logo

ঋণ বিতরণ কমলেও আর্থিকভাবে শক্ত অবস্থানে বিদেশি ব্যাংক

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
৩০ জুলাই, ২০২৬, ১৬:০৪
ঋণ বিতরণ কমলেও আর্থিকভাবে শক্ত অবস্থানে বিদেশি ব্যাংক
ছবি: সংগৃহীত

দেশের ব্যাংকিং খাতে বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণ এবং বাজার অংশীদারত্ব কিছুটা কমেছে। তবে মূলধন, তারল্য, মুনাফা এবং খেলাপি ঋণের নিয়ন্ত্রণে শক্তিশালী অবস্থান ধরে রাখায় এসব ব্যাংক এখনো আর্থিকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অর্থায়ন, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন এবং রপ্তানিমুখী শিল্পে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা অব্যাহত রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিভাগ ও বিশেষ সমীক্ষা অ্যান্ড প্রকল্প বিভাগের প্রকাশিত ‘বাংলাদেশে বিদেশি ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম: প্রবণতা এবং পরিচালনাগত পর্যবেক্ষণ (জুলাই-ডিসেম্বর, ২০২৫)’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে।

দেশে ৯টি বিদেশি ব্যাংকের কার্যক্রম

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে ৯টি বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংক ৭০টি শাখা ও ৫টি উপশাখার মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। স্বাধীনতার পর থেকেই এসব ব্যাংক আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অর্থায়ন, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন, আধুনিক ব্যাংকিং সেবা এবং বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগ স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

বিজ্ঞাপন

যদিও শাখা সংখ্যা, আমানত এবং ঋণ বিতরণের দিক থেকে দেশীয় ব্যাংকের তুলনায় তাদের উপস্থিতি সীমিত, তবুও সেবার মান ও আর্থিক সক্ষমতার ক্ষেত্রে তারা উল্লেখযোগ্য অবস্থানে রয়েছে।

আমানত বেড়েছে, তবে বাজারে অংশ কমেছে

২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে বিদেশি ব্যাংকগুলোর মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৭ হাজার ৫৬৭ কোটি ৯০ লাখ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় সামান্য বেশি। তবে দেশের সামগ্রিক ব্যাংকিং খাতে আমানতের অনুপাতে বিদেশি ব্যাংকগুলোর অংশীদারত্ব ৪ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমে ৪ দশমিক ২ শতাংশে নেমে এসেছে।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

তাদের আমানতের বড় অংশ এসেছে করপোরেট গ্রাহকদের কাছ থেকে। মোট আমানতের মধ্যে চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাবের অংশ ৩৯ শতাংশ, আবাসিক বৈদেশিক মুদ্রা আমানত ১৭ শতাংশ, স্থায়ী আমানত ১৬ শতাংশ, স্পেশাল নোটিশ ডিপোজিট ৫ শতাংশ এবং অন্যান্য আমানত ২৩ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, কম খরচে তহবিল সংগ্রহের সক্ষমতা থাকায় বিদেশি ব্যাংকগুলো উচ্চ তারল্য ধরে রাখতে পারছে এবং তুলনামূলকভাবে সতর্কভাবে ঋণ বিতরণ করছে।

এক বছরে ঋণ বিতরণ কমেছে ১১ শতাংশের বেশি

বিজ্ঞাপন

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে বিদেশি ব্যাংকগুলোর মোট ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৬ হাজার ১২২ কোটি ৫০ লাখ টাকা। আগের বছর একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল প্রায় ৫১ হাজার ৯৭০ কোটি টাকা।

অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে ঋণ বিতরণ কমেছে ১১ দশমিক ৩ শতাংশ। একই সময়ে দেশের মোট ব্যাংকিং খাতে তাদের ঋণের অংশীদারত্ব ৩ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ২ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে এসেছে।

শিল্প খাতে বেশি অর্থায়ন

বিজ্ঞাপন

খাতভিত্তিক ঋণ বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিদেশি ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের ৫২ শতাংশ শিল্প খাতে দেওয়া হয়েছে। ব্যবসা ও বাণিজ্যে গেছে ২০ শতাংশ, ভোক্তা ঋণে ১৬ শতাংশ, অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক খাতে ৮ শতাংশ এবং বাকি ৪ শতাংশ অন্যান্য খাতে।

শিল্প খাতে ঋণের পরিমাণ বেড়ে ২৪ হাজার ২৬৪ কোটি ৮০ লাখ টাকায় পৌঁছেছে।

অন্যদিকে ব্যবসা ও বাণিজ্য খাতে ঋণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে ১৫ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকা থেকে ৯ হাজার ১১০ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। এদিকে কৃষি, মৎস্য ও বনজ খাতে ঋণ প্রায় দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়ে ৭২৬ কোটি টাকা থেকে ১ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকার বেশি হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, এটি উৎপাদনশীল খাতে বিদেশি ব্যাংকগুলোর আগ্রহ বাড়ার ইঙ্গিত বহন করে।

খেলাপি ঋণ কিছুটা বেড়েছে

বিদেশি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও তা এখনো দেশের অধিকাংশ স্থানীয় ব্যাংকের তুলনায় অনেক কম। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৪ দশমিক ৯ শতাংশ। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি তা বেড়ে ৬ দশমিক ১ শতাংশে পৌঁছালেও বছরের শেষে কিছুটা কমে ৫ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা

রপ্তানি ও আমদানি বাণিজ্যে বিদেশি ব্যাংকগুলোর অবদান উল্লেখযোগ্য। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর সময়ে এসব ব্যাংকের মাধ্যমে ৪ দশমিক ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রপ্তানি আয় দেশে এসেছে, যা জাতীয় রপ্তানি আয়ের প্রায় ১৮ দশমিক ৮ শতাংশ।

বিশেষ করে তৈরি পোশাক, চামড়া শিল্প এবং রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের (ইপিজেড) শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে তাদের অর্থায়ন বেশি। একই সময়ে তাদের মাধ্যমে ৪ দশমিক ২৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের আমদানি বিল নিষ্পত্তি হয়েছে, যা দেশের মোট আমদানির প্রায় ১৩ দশমিক ১ শতাংশ।

বিজ্ঞাপন

তবে প্রবাসী আয় সংগ্রহে বিদেশি ব্যাংকগুলোর অংশগ্রহণ এখনো খুবই সীমিত। আলোচ্য সময়ে তাদের মাধ্যমে এসেছে মাত্র ৪৭ দশমিক ৪২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা মোট রেমিট্যান্সের মাত্র ০.৩ শতাংশ।

মুনাফা ও মূলধনে শক্তিশালী অবস্থান

২০২৫ সালের দ্বিতীয়ার্ধে বিদেশি ব্যাংকগুলোর কর-পূর্ব মুনাফা হয়েছে ৪ হাজার ৩৯০ কোটি টাকার বেশি। কর-পরবর্তী নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৭৩৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা।

বিজ্ঞাপন

এ ছাড়া বিদেশে মুনাফা স্থানান্তরের পরিমাণ বেড়ে ১ হাজার ৩১৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা হয়েছে এবং লভ্যাংশ হিসেবে আরও ৫৬২ কোটি ৭০ লাখ টাকা পাঠানো হয়েছে। বছর শেষে এসব ব্যাংকের মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ২১৯ কোটি টাকার বেশি এবং মূলধন ও সঞ্চিতি রয়েছে ১৫ হাজার ৬১৭ কোটি টাকার বেশি।

নিয়ন্ত্রক মানদণ্ডের তুলনায় অনেক এগিয়ে

আর্থিক সক্ষমতার প্রায় সব সূচকেই বিদেশি ব্যাংকগুলো নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত ন্যূনতম মানের চেয়ে অনেক এগিয়ে রয়েছে।

আরও পড়ুন

প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাদের ক্যাপিটাল অ্যাডিকোয়েসি রেশিও ৪১.৫ শতাংশ, কমন ইকুইটি টিয়ার-১ ৩৯.২৮ শতাংশ, টিয়ার-১ ক্যাপিটাল রেশিও ৩৯.৩৪ শতাংশ, রিটার্ন অন অ্যাসেটস ৪.১৮ শতাংশ, রিটার্ন অন ইকুইটি ১৭.১২ শতাংশ, লিভারেজ রেশিও ১৭.৫৩ শতাংশ, তারল্য কাভারেজ অনুপাত ৪৫৮.৫৬ শতাংশ এবং নেট স্টেবল ফান্ডিং রেশিও ১৩২.২৮ শতাংশ।

তবে প্রভিশন কাভারেজ রেশিও আগের তুলনায় কিছুটা কমে ৭২.৩৯ শতাংশ থেকে ৬৫.৩ শতাংশে নেমে এসেছে।

ব্যাংক খাত বিশ্লেষকদের মতে, বিদেশি ব্যাংকগুলোর শক্তিশালী মূলধন, পর্যাপ্ত তারল্য, তুলনামূলক কম খেলাপি ঋণ এবং স্থিতিশীল মুনাফা কার্যকর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার প্রতিফলন। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন এবং রপ্তানিমুখী শিল্পে তাদের ভূমিকা দেশের অর্থনীতিকে সহায়তা করছে।

তবে ঋণ বিতরণে ধারাবাহিক সংকোচন এবং বাজার অংশীদারত্ব কমে যাওয়াকে ভবিষ্যতের জন্য সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, করপোরেট খাতের পাশাপাশি কৃষি, প্রযুক্তি, উৎপাদনশীল শিল্প এবং নতুন সম্ভাবনাময় খাতে অর্থায়ন বাড়ানো গেলে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বিদেশি ব্যাংকগুলোর অবদান আরও বাড়বে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং কার্যকর আর্থিক সংস্কার নিশ্চিত করা গেলে বিদেশি ব্যাংকগুলো ভবিষ্যতে দেশের উন্নয়ন ও বিনিয়োগে আরও বড় ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD