Logo

এবার বাড়ছে পোলাও চালের দাম, দায় কার—রপ্তানি নাকি কৃত্রিম সংকট?

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
৩০ জুলাই, ২০২৬, ১২:১৫
এবার বাড়ছে পোলাও চালের দাম, দায় কার—রপ্তানি নাকি কৃত্রিম সংকট?
ছবি: সংগৃহীত

দেশের বাজারে সুগন্ধি বা পোলাও চালের দাম অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ায় ভোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। গত ছয় মাসে কেজিপ্রতি ৮০ থেকে ৯০ টাকা পর্যন্ত মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের প্যাকেটজাত সুগন্ধি চাল ২১০ থেকে ২৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। একই সঙ্গে খোলা পোলাও চালের দামও বেড়ে কোথাও কোথাও ২০০ টাকা কেজিতে পৌঁছেছে।

বিজ্ঞাপন

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির পেছনে দুটি বিষয় সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে। একটি হলো সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমোদন বৃদ্ধি, অন্যটি বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগ। তবে এ দুটি কারণ নিয়ে ব্যবসায়ী, রপ্তানিকারক ও ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ভিন্নমত দেখা দিয়েছে।

কয়েক মাসে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি

রাজধানীর বিভিন্ন খুচরা বাজার ঘুরে দেখা গেছে, চিনিগুঁড়া ও কালিজিরা জাতের প্যাকেটজাত পোলাও চাল ব্র্যান্ডভেদে ২১০ থেকে ২৩০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে খোলা সুগন্ধি চালের দাম ১৬০ থেকে ২০০ টাকার মধ্যে উঠানামা করছে।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিক্রেতারা জানান, পাইকারি বাজার থেকেই বেশি দামে চাল কিনতে হচ্ছে। ফলে খুচরা পর্যায়েও দাম বাড়িয়ে বিক্রি ছাড়া তাদের বিকল্প নেই। কিছু দোকানে আগে কেনা কম দামের চালও বর্তমান বাজারদরে বিক্রি করা হচ্ছে। আবার কোথাও প্যাকেটজাত চাল খুলে খোলা চাল হিসেবে বিক্রির ঘটনাও দেখা যাচ্ছে।

রপ্তানির অনুমোদনের পর বাড়ছে আলোচনা

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গত জুন ও চলতি জুলাই মাসে দুই দফায় ২৭৮টি প্রতিষ্ঠানকে মোট ৪৫ হাজার ৩২০ টন সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমোদন দিয়েছে। আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এসব চাল রপ্তানির সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

অনুমোদন পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান সর্বোচ্চ ৩০০ থেকে ৫০০ টন পর্যন্ত চাল রপ্তানির সুযোগ পেয়েছে। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে ১০০ থেকে ২০০ টনের মধ্যে অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

যদিও বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রপ্তানির অনুমোদনের আগেই সুগন্ধি চালের দাম বাড়তে শুরু করেছিল। তবে অনুমোদনের পর মূল্যবৃদ্ধির গতি আরও বেড়েছে বলে তাদের দাবি।

ভোক্তাদের অসন্তোষ

বিজ্ঞাপন

রাজধানীর মুগদা বাজারে ১৯০ টাকা কেজি দরে চিনিগুঁড়া চাল কিনে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এক ক্রেতা। তার মতে, আগে শুধু মাছ রপ্তানির কারণে দাম বাড়ার কথা শোনা যেত, এখন সুগন্ধি চালও সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে। কৃষিপ্রধান দেশে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়া এই মূল্য পরিস্থিতি হতাশাজনক বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

এক মাসেই বস্তাপ্রতি দুই হাজার টাকা বৃদ্ধি

খুচরা ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, মাত্র এক মাস আগে ভালো মানের চিনিগুঁড়া চালের ৫০ কেজির একটি বস্তা পাইকারি বাজারে প্রায় ৭ হাজার ৫০০ টাকায় পাওয়া যেত। বর্তমানে একই বস্তার দাম বেড়ে প্রায় ৯ হাজার ৫০০ টাকায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ এক মাসেই বস্তাপ্রতি প্রায় ২ হাজার টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিজ্ঞাপন

মানিকনগরের এক চাল ব্যবসায়ী জানান, পাইকারি বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ার কথা বলা হচ্ছে। চাহিদা অনুযায়ী চাল পাওয়া যাচ্ছে না। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে সামনে দাম আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।

রপ্তানিকারকদের দাবি, সংকট কৃত্রিম

বাংলাদেশ চাল রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ ইশাকুল হোসেনের মতে, রপ্তানিকে দায়ী করা ঠিক নয়। তিনি বলেন, গত এক মাসে মাত্র দুই হাজার টনের মতো সুগন্ধি চাল রপ্তানি হয়েছে, যা দেশের মোট উৎপাদনের তুলনায় খুবই কম।

বিজ্ঞাপন

তার দাবি, দেশে বছরে অন্তত ১০ লাখ টন সুগন্ধি চাল উৎপাদিত হয়। অভ্যন্তরীণ চাহিদা প্রায় চার লাখ টন হওয়ায় ছয় লাখ টনের মতো উদ্বৃত্ত থাকে। ফলে সীমিত পরিমাণ রপ্তানির কারণে বাজারে সংকট সৃষ্টি হওয়ার কথা নয়। বরং কিছু মিল মালিক চাল মজুত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।

কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের ভিন্ন ব্যাখ্যা

অন্যদিকে দেশের অন্যতম খাদ্যপণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা কৃত্রিম সংকটের অভিযোগ নাকচ করেছেন। তার মতে, সুগন্ধি ধানের উৎপাদন কমে যাওয়া, জ্বালানির ব্যয় বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি এবং বিয়ে ও সামাজিক অনুষ্ঠানের মৌসুমে চাহিদা বেড়ে যাওয়াই মূল্য বৃদ্ধির প্রধান কারণ।

বিজ্ঞাপন

তিনি বাজার স্থিতিশীল রাখতে সাময়িকভাবে সুগন্ধি চাল রপ্তানি স্থগিত রাখার পরামর্শও দিয়েছেন।

আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব

ব্যবসায়ীদের একটি অংশের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে সুগন্ধি চালের চাহিদা বাড়ায় রপ্তানিমূল্যও বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে প্রতি কেজি চাল রপ্তানির সর্বনিম্ন মূল্য ১ দশমিক ৬০ মার্কিন ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমান ডলার বিনিময় হার অনুযায়ী এর মূল্য প্রায় ১৯৭ টাকার সমান।

বিজ্ঞাপন

তাদের যুক্তি, কিছুদিন আগেও দেশের বাজারে সুগন্ধি চালের দাম রপ্তানিমূল্যের চেয়ে অনেক কম ছিল। এখন বাজার সেই ব্যবধান কিছুটা সমন্বয় করেছে।

কৃত্রিম সংকটের অভিযোগ জোরালো

অন্যদিকে ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রপ্তানিকে মূল্যবৃদ্ধির কারণ হিসেবে তুলে ধরা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

বিজ্ঞাপন

তাদের মতে, দেশের মোট উৎপাদনের তুলনায় রপ্তানির পরিমাণ খুবই সীমিত। অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পরও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ চাল উদ্বৃত্ত থাকে। তাই রপ্তানির কারণে সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হওয়ার সুযোগ কম।

আরও পড়ুন

তারা আরও মনে করেন, পরিবহন ব্যয় বা জ্বালানির অজুহাতও গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ যদি এ কারণেই দাম বাড়ত, তাহলে অন্যান্য ধরনের চালের দামও একই হারে বাড়ার কথা ছিল। ফলে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে কিছু ব্যবসায়ী অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের চেষ্টা করছেন বলেই তাদের ধারণা।

রপ্তানির ইতিহাস

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে বাণিজ্যিকভাবে সুগন্ধি চাল রপ্তানি শুরু হয় ২০০৯-১০ অর্থবছরে। প্রথম বছর রপ্তানির পরিমাণ ছিল মাত্র ৬৬৩ টন। পরে ধীরে ধীরে তা বাড়তে থাকে এবং ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রায় ১০ হাজার ৮৭৯ টনে পৌঁছে।

পরবর্তী সময়ে কয়েক বছর রপ্তানির পরিমাণ ওঠানামা করলেও ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমোদন স্থগিত রাখা হয়েছিল। এরপর আবার রপ্তানি চালু করা হয় এবং চলতি অর্থবছরে দুই দফায় প্রায় ৪৫ হাজার ৩২০ টন সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে, যা আগের সময়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।

বর্তমান পরিস্থিতিতে বাজারে মূল্যবৃদ্ধির প্রকৃত কারণ নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত থাকলেও সাধারণ ভোক্তারা দ্রুত বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন। তাদের আশা, সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা এবং বাজার তদারকি জোরদার করা হলে পোলাও চালের দাম আবারও সহনীয় পর্যায়ে ফিরে আসতে পারে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD