গ্যাস সংকটে বাড়ছে চিনির দাম

দেশজুড়ে চলমান গ্যাস সংকট এবার চিনির বাজারেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। গ্যাসের চাপ কম থাকায় দেশের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি চিনি পরিশোধনকারী কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। এতে পাইকারি বাজারে চিনির সরবরাহ কমে যাওয়ার পাশাপাশি দামও বাড়তে শুরু করেছে।
বিজ্ঞাপন
ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, কারখানাগুলোর উৎপাদন দ্রুত স্বাভাবিক না হলে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে মজুত কমে গিয়ে দেশের চিনির সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে চিনির ওপর নির্ভরশীল বিভিন্ন খাদ্যপণ্য উৎপাদনেও।
তিন দিনে মণপ্রতি চিনির দাম বেড়েছে ৭০-৭৫ টাকা
দেশের অন্যতম বড় পাইকারি বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে গত তিন দিনে প্রতি মণ চিনির দাম প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ টাকা বেড়েছে।
বিজ্ঞাপন
ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার প্রতি মণ প্রস্তুত চিনি প্রায় ৩ হাজার ৭২৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে। অথচ মঙ্গলবার একই পরিমাণ চিনির দাম ছিল প্রায় ৩ হাজার ৬৫০ থেকে ৩ হাজার ৬৫৫ টাকা।
সরবরাহ পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে শনি ও রবিবার থেকে দাম আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ীরা বলছেন, কারখানাগুলোতে উৎপাদন বন্ধ থাকায় নতুন করে চিনি সরবরাহ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। যেসব কারখানায় কিছু মজুত রয়েছে, সেখান থেকেই সীমিত পরিমাণে বাজারে চিনি সরবরাহ করা হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
তিন দিন ধরে বন্ধ কয়েকটি বড় কারখানা
দেশে বছরে প্রায় ২২ লাখ টন চিনির প্রয়োজন হয়। এর ৯৮ শতাংশের বেশি বিদেশ থেকে আমদানি করা অপরিশোধিত চিনি পরিশোধনের মাধ্যমে দেশের বাজারে সরবরাহ করা হয়।
ব্যক্তিখাতের কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠী—সিটি গ্রুপ, মেঘনা গ্রুপ, এস আলম, আবদুল মোনেম ও দেশবন্ধু—দেশে অপরিশোধিত চিনি আমদানি করে নিজেদের কারখানায় পরিশোধনের পর বাজারজাত করে।
বিজ্ঞাপন
এর মধ্যে আবদুল মোনেম লিমিটেডের ঈগলু ব্র্যান্ডের কারখানা ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে আবুল খায়ের গ্রুপ অধিগ্রহণ করে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি স্মাইল ফুড লিমিটেড নামে পরিচালিত হচ্ছে।
অন্যদিকে এস আলমের চিনি কারখানার উৎপাদন গত মাস থেকেই বন্ধ রয়েছে। ব্যাংকঋণসংক্রান্ত জটিলতার কারণে দেশবন্ধু সুগার মিলও ছয় মাসের বেশি সময় ধরে উৎপাদনের বাইরে রয়েছে।
এ অবস্থায় উৎপাদনে থাকা বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরই মূলত বাজারের সরবরাহ নির্ভর করছে। কিন্তু গ্যাস সংকটের কারণে সিটি গ্রুপের তীর, মেঘনা গ্রুপের ফ্রেশ এবং আবুল খায়ের গ্রুপের স্মাইল ফুডের স্টার শিপ কারখানায়ও উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
মজুত দিয়ে চলছে সীমিত সরবরাহ
মেঘনা গ্রুপের প্রধান বিক্রয় কর্মকর্তা নাসির উদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, তাদের সব কারখানার উৎপাদন গত তিন দিন ধরে বন্ধ রয়েছে। তবে গুদামে থাকা সীমিত মজুত থেকে আপাতত বাজারে চিনি সরবরাহ করা হচ্ছে।
তিনি জানান, স্বাভাবিক সময়ে তাদের প্রতিষ্ঠান প্রতিদিন প্রায় ৫ হাজার টন চিনি সরবরাহ করত। বর্তমানে সেই পরিমাণ কমে প্রায় ২ হাজার টনে নেমে এসেছে।
বিজ্ঞাপন
তার হিসাবে, গুদামে থাকা চিনি দিয়ে আরও তিন থেকে চার দিন সরবরাহ চালিয়ে নেওয়া সম্ভব। এরপর গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে সরবরাহ বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি বলেন, প্রতিদিন যে তিন হাজার টন ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, তা অন্য উৎস থেকে পূরণ করা কঠিন। ফলে গ্যাস সংকট দীর্ঘায়িত হলে সারাদেশে চিনির সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।
খাতুনগঞ্জে সরবরাহ নিয়ে ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ
বিজ্ঞাপন
খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ী সিরাজুল ইসলাম জানান, চট্টগ্রামের বাজারে বর্তমানে মেঘনা, সিটি ও স্টার শিপ থেকে চিনি সংগ্রহ করা হচ্ছে। কিন্তু গ্যাস সংকটের কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ও সরবরাহ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
তার মতে, স্টার শিপ থেকে সরাসরি সরবরাহ না পাওয়ায় ব্যবসায়ীদের সমস্যা হচ্ছে। মেঘনা গ্রুপও মূলত গুদামে থাকা চিনি থেকে সরবরাহ দিচ্ছে।
আরেক ব্যবসায়ী ছৈয়দুল হক বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে কারখানাগুলোর উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাজারে সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে ব্যবধান তৈরি হয়েছে। স্টার শিপের ক্ষেত্রে সরবরাহ পেতে দীর্ঘ অপেক্ষার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
খাতুনগঞ্জের আরেক পাইকারি ব্যবসায়ী আলমগীর পারভেজের ভাষ্য, গ্যাস সংকটের কারণে বড় কারখানাগুলো দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে চিনির পুরো সরবরাহব্যবস্থাই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
গ্যাস সংকটের পেছনে এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন
দেশে গ্যাসের দৈনিক চাহিদা প্রায় ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের কাছাকাছি। স্বাভাবিক সময়ে দেশীয় উৎস ও আমদানি মিলিয়ে প্রায় ৩ হাজার মিলিয়ন ঘনফুটের মতো গ্যাস সরবরাহ করা হয়।
বিজ্ঞাপন
বর্তমানে সরবরাহ প্রায় ২ হাজার ১০০ থেকে ২ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে আসায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় তীব্র গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে।
পেট্রোবাংলার নিয়ন্ত্রণাধীন দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে দৈনিক প্রায় ২ হাজার ৭৫০ মিলিয়ন ঘনফুট প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলনের সক্ষমতা রয়েছে। এর পাশাপাশি এলএনজি আমদানির মাধ্যমে আরও প্রায় ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা রয়েছে।
কক্সবাজারের মহেশখালীতে থাকা সামিট ও এক্সিলারেট এনার্জির দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল থেকে সাধারণত উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়।
টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সংকট তীব্র হয়
গত ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির এলএনজি টার্মিনাল আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর ওই টার্মিনাল থেকে সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। এতে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে সরবরাহ কমে গিয়ে সংকট আরও তীব্র হয়।
আরও পড়ুন
পরে মেরামতের পর গত ৫ আগস্ট ওই টার্মিনাল থেকে আংশিকভাবে গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়। তবে বৈরী আবহাওয়ার কারণে সামিটের এফএসআরইউ থেকেও গত কয়েক দিন এলএনজি খালাস বন্ধ ছিল।
দুটি টার্মিনাল থেকে সরবরাহ কমে যাওয়ায় সারাদেশে গ্যাসের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। এর প্রভাব পড়ে বিদ্যুৎ, শিল্পকারখানা, পরিবহনসহ বিভিন্ন খাতে।
শনিবার থেকে গ্যাসের চাপ বাড়ার আশা
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার বিকেল থেকে সামিটের এফএসআরইউ থেকে আবার এলএনজি খালাস শুরু হয়েছে। এরপর পাইপলাইনে গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আরপিজিসিএলের চট্টগ্রামের উপমহাব্যবস্থাপক (এলএনজি) প্রকৌশলী মো. নাছির উদ্দীন জানিয়েছেন, আবহাওয়া স্বাভাবিক হওয়ায় সামিটের টার্মিনালে এলএনজি খালাস শুরু হয়েছে। এর ফলে জাতীয় লাইনে গ্যাস সরবরাহ বাড়তে শুরু করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
শনিবার থেকে গ্যাসের চাপ আরও বাড়তে পারে বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা।
তবে শিল্পকারখানায় গ্যাসের চাপ পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে কতটা সময় লাগবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। দ্রুত সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে চিনির কারখানাগুলোর উৎপাদন ও মজুত আরও কমে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে পাইকারি বাজারের পর খুচরা বাজারেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।








