Logo

গ্যাস সংকটের মধ্যেও কোনো কারখানা বন্ধ হয়নি: বিজিএমইএ

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১৪:০২
গ্যাস সংকটের মধ্যেও কোনো কারখানা বন্ধ হয়নি: বিজিএমইএ
ছবি: সংগৃহীত

জ্বালানি সংকটের কারণে গত দুই মাসে কোনো পোশাক কারখানা বন্ধ হয়নি বলে জানিয়েছে তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ)। সংগঠনটির সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতিরও উন্নতি হয়েছে। তবে সংকটের পূর্ণ প্রভাব বুঝতে আরও কয়েক মাস অপেক্ষা করতে হবে।

বিজ্ঞাপন

বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর উত্তরায় বিজিএমইএ কমপ্লেক্সে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি। ‘বাটেক্সপো ২০২৬’, হংকং রোডশো এবং পোশাক খাতের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

মাহমুদ হাসান খান বলেন, গত কয়েক দিনের তুলনায় গ্যাসের সরবরাহ বেড়েছে। বিদ্যুৎ বা জ্বালানি সংকটের কারণে এখন পর্যন্ত কোনো পোশাক কারখানা বন্ধ হয়নি। তবে সাম্প্রতিক সংকটের প্রকৃত অভিঘাত আগামী তিন থেকে চার মাস পর স্পষ্ট হবে।

এর আগে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে দেশের শিল্পকারখানাগুলোর উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার তথ্য উঠে এসেছিল। শিল্প পুলিশের এক মূল্যায়নে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ৪১৩টি কারখানা সংকটে পড়ার কথা বলা হয় এবং ১৭টি কারখানার ১৮টি উৎপাদন ইউনিট সাময়িকভাবে বন্ধ হওয়ার তথ্যও দেওয়া হয়েছিল। তবে বিজিএমইএ বলছে, তাদের সদস্য পোশাক কারখানাগুলোর মধ্যে গত দুই মাসে জ্বালানি সংকটের কারণে কোনো কারখানা বন্ধ হয়নি।

বিজ্ঞাপন

সংকটের প্রভাব বুঝতে সময় লাগবে

বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, পোশাকশিল্পে কোনো সংকটের প্রভাব সাধারণত তাৎক্ষণিকভাবে বোঝা যায় না। একটি কারখানা বন্ধের সিদ্ধান্তও একদিনে নেওয়া সম্ভব নয়। চলমান অর্ডার শেষ করা, শ্রমিকদের আইনগত পাওনা পরিশোধ এবং ব্যাংকের দায়-দায়িত্বসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে কারখানা বন্ধের জন্য প্রায় ছয় মাসের প্রস্তুতি প্রয়োজন হয়।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

তার ভাষ্য, গত দুই মাসে জ্বালানি সংকটের কারণে কোনো কারখানা বন্ধ হয়নি। তবে আগামী তিন থেকে চার মাসে পরিস্থিতির প্রকৃত প্রভাব বোঝা যাবে। একই সঙ্গে অতীতের কোনো ঘটনা বা দুর্ঘটনার কারণে এখন কোনো কারখানা বন্ধ হলে সেটিকে সরাসরি বর্তমান জ্বালানি সংকটের ফল হিসেবে দেখাও ঠিক হবে না।

গ্যাস সরবরাহে কিছুটা স্বস্তি

বিজ্ঞাপন

জুলাইয়ের শেষ দিক থেকে তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন শিল্পে গ্যাসের চাপ কমে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছিল। একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে সমস্যার পর জাতীয় গ্যাস সরবরাহে বড় ঘাটতি তৈরি হয়।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ১৫ সেপ্টেম্বর দুপুরে দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ ২ হাজার ৬১০ মিলিয়ন ঘনফুটে পৌঁছায়, যা সংকটের আগের স্বাভাবিক সরবরাহের কাছাকাছি। এর মধ্যে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে ১ হাজার ৬২০ মিলিয়ন এবং আমদানি করা এলএনজি থেকে ৯৯০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ হয়েছে।

১৬ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদি আমিনও জানান, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর দেশের গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে এবং এ ধারা অব্যাহত থাকার আশা করা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

মাহমুদ হাসান খান বলেন, গ্যাসের চাপ কম থাকায় ডাইং, ওয়াশিংসহ পোশাকশিল্পের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ খাত বেশি সমস্যায় পড়েছিল। সংকটের সময়ে স্বাভাবিক ৮ থেকে ১০ ঘণ্টার কাজের পাশাপাশি অনেক প্রতিষ্ঠানকে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করতে হয়েছে এবং বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হয়েছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। এরপরও সময়মতো রপ্তানি পণ্য পাঠাতে উদ্যোক্তারা চেষ্টা করেছেন।

আরও এফএসআরইউ নয়, স্থলভিত্তিক সংরক্ষণ চায় বিজিএমইএ

দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিজিএমইএ অতিরিক্ত ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউ স্থাপনের পাশাপাশি স্থলভিত্তিক এলএনজি সংরক্ষণ ও পুনর্গ্যাসীকরণ অবকাঠামো তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

মাহমুদ হাসান খান বলেন, চীনের সঙ্গে জি-টু-জি ভিত্তিতে একটি এফএসআরইউ আনার চুক্তি হয়েছে। তবে একাধিক ভাসমান টার্মিনাল স্থাপনের পাশাপাশি গ্যাস বিতরণব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। শুধু সরবরাহ বাড়ালেই হবে না, সেই গ্যাস শিল্পাঞ্চলে পৌঁছানোর অবকাঠামোও উন্নত করতে হবে।

বিজিএমইএ ছোট ও মাঝারি শিল্পে গ্যাস সংযোগ ও রেশনিংয়ে অগ্রাধিকার, ১০০ থেকে ৫০০ পিএসআই বয়লারসম্পন্ন কারখানায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সংযোগ, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে কম সুদের ‘গ্রিন লোন’ এবং উপকূলীয় এলাকায় গ্যাস অনুসন্ধান ত্বরান্বিত করার দাবিও জানিয়েছে।

সৌরবিদ্যুতে বাড়ছে আগ্রহ

বিজ্ঞাপন

জ্বালানি ব্যয় ও সরবরাহের ঝুঁকি কমাতে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে পোশাক খাত। বিজিএমইএ সভাপতি জানান, ২০১৯ সাল থেকে তার নিজের প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করা হচ্ছে এবং বর্তমানে সেখানে প্রায় ১৪ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের কথা তিনি জানান।

সংগঠনটির মতে, সদস্য কারখানাগুলোতে বড় পরিসরে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে। তবে দীর্ঘ বিনিয়োগকাল ও ঋণের সুদের হার এ খাতে বড় বাধা। এ কারণে কম সুদের গ্রিন ফাইন্যান্সের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা চলছে।

এর আগেও বিজিএমইএ জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় অতিরিক্ত এফএসআরইউ, জরুরি জ্বালানি সরবরাহ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির সরঞ্জামে শুল্ক কমানোর মতো প্রস্তাব দিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এলডিসি উত্তরণ ও ইউরোপের বাজার

এলডিসি থেকে উত্তরণের সময়সীমা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েও কথা বলেন বিজিএমইএ সভাপতি। তার মতে, অতিরিক্ত তিন বছর সময় পাওয়া গেলে এলডিসি-পরবর্তী বাণিজ্যিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুতির সুযোগ বাড়বে।

পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বা এফটিএকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথাও জানান তিনি। একই সঙ্গে কোম্পানি ও কাস্টমস আইন আধুনিকায়ন, দ্রুত এফটিএ বা ইপিএ চুক্তি এবং এলডিসি-পরবর্তী সময়ে রপ্তানি খাতে নীতিগত সহায়তা ও শুল্ক-কর কাঠামোর ধারাবাহিকতা বজায় রাখার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

বিজ্ঞাপন

হংকং ও জাপানে নতুন বাজারের সন্ধান

রপ্তানি বাজারে বৈচিত্র্য আনতে হংকংয়ে একটি রোডশোর আয়োজন করছে বিজিএমইএ। সংগঠনটির সঙ্গে এইচএসবিসির অংশীদারত্বে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর লক্ষ্য বাংলাদেশের পোশাকশিল্পকে নতুন আন্তর্জাতিক ক্রেতা ও ব্র্যান্ডের কাছে তুলে ধরা। বিজিএমইএ ও এইচএসবিসি এ বিষয়ে জুলাইয়ে একটি সমঝোতা স্মারকও সই করেছে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

জাপানের বাজারে রপ্তানি বাড়াতেও আলাদা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। জাপানি ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ করতে ‘জাপান ডেস্ক’ চালুর কথা জানিয়েছে বিজিএমইএ। জাপানি ভাষায় যোগাযোগে সক্ষম কর্মকর্তাদের সেখানে যুক্ত করা হচ্ছে।

বর্তমানে জাপানে প্রায় ৫০ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি রয়েছে বলে জানিয়ে বিজিএমইএ সভাপতি এ বাজারকে আগামী দিনে ২০০ থেকে ২৫০ কোটি ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য তুলে ধরেন।

এদিকে ২০২৬ সালের নভেম্বরে বাটেক্সপো আয়োজনের প্রস্তুতিও চলছে। বিজিএমইএর এক সাম্প্রতিক উদ্যোগে জানানো হয়েছে, সংগঠনটি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অনুষ্ঠানের উদ্বোধনে প্রধান অতিথি হওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছে এবং তিনি তা গ্রহণ করেছেন।

বিজিএমইএ বলছে, পোশাকশিল্পকে শুধু কম দামের পণ্য উৎপাদনের খাত হিসেবে নয়, বরং প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও টেকসই উৎপাদন সক্ষমতাসম্পন্ন শিল্প হিসেবে আন্তর্জাতিক বাজারে তুলে ধরতে তারা নতুন উদ্যোগ নিচ্ছে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD