ঢাকার শিল্পে বাড়ছে ভোলার গ্যাসের চাহিদা, যাচ্ছে ৩ মিলিয়ন ঘনফুট

ঢাকা ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলের কারখানাগুলোতে গ্যাসের চাহিদা মেটাতে ভোলা থেকে সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে প্রতিদিন ভোলা থেকে আড়াই থেকে ৩ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সিএনজি করে বিশেষ ট্যাংকারে ঢাকায় নেওয়া হচ্ছে। এসব গ্যাস ডিকম্পোজিট করে রাজধানী ও আশপাশের এলাকার প্রায় ৩০টি শিল্পকারখানায় সরবরাহ করা হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
সংশ্লিষ্টরা জানান, জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহ থেকে ভোলা থেকে ঢাকামুখী গ্যাস পরিবহণের পরিমাণ বেড়েছে। বর্তমানে প্রতিদিন ১৬ থেকে ১৭টি কাভার্ড ট্যাংকারে করে গ্যাস ভোলা থেকে ঢাকায় যাচ্ছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ইন্ট্রাকো রিফুয়েলিং স্টেশনের ব্যবস্থাপনায় এই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সুন্দরবন গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী অলিউর রহমান জানান, প্রতিদিন গড়ে আড়াই থেকে ৩ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ভোলা থেকে ঢাকায় পাঠানো হচ্ছে। কোম্পানিটির খুলনা জোনের ডিজিএম মো. মোস্তাফিজুর রহমানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার ২ দশমিক ৩১ মিলিয়ন, বুধবার ২ দশমিক ৩৮ মিলিয়ন এবং বৃহস্পতিবার ২ দশমিক ২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সিএনজি করা হয়েছে। পরে এসব গ্যাস ট্যাংকারে করে ঢাকায় পাঠানো হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ভোলার গ্যাস সিএনজি করার পর বিশেষ ট্যাংকারে করে ঢাকায় নেওয়া হয়। সেখানে তা ডিকম্পোজিট করে পাইপলাইনের মাধ্যমে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করা হচ্ছে। চাহিদা থাকলেও বর্তমানে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৫০ লাখ ঘনফুট পর্যন্ত গ্যাস নেওয়ার সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
ইন্ট্রাকোর প্রকল্প ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী আব্বাস বলেন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও ট্যাংকার সংকটের কারণে চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। প্রায় এক মাস ধরে তারা নিয়মিতভাবে ভোলা থেকে গ্যাস সংগ্রহ করছেন। বর্তমানে তাদের ৩৪টি কাভার্ড ট্যাংকার রয়েছে। এর মধ্যে প্রতিদিন ১৬ থেকে ১৭টি ট্যাংকার ভোলা থেকে ঢাকার উদ্দেশে যায়। ঢাকায় গ্যাস খালাস করার পর সেগুলো আবার ভোলায় ফিরে আসে।
ইন্ট্রাকোর তথ্য অনুযায়ী, ভোলার গ্যাস ব্যবহার করছে ঢাকার বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে রয়েছে এসিআই সল্ট, আকিজ টেক্সটাইল, স্কয়ার নিট কম্পোজিট লিমিটেড, স্কয়ার গ্রুপ, ফকির ফ্যাশন, এনজেড গ্রুপ, বেক্সিমকো লিমিটেড, গোমতি টেক্সটাইল, আসওয়াদ কম্পোজিট মিলস লিমিটেড, আল-মুসলিম, আরকে নিট, ব্লু ক্রিয়েশন, প্রতীক সিরামিকস ও এবিআর স্পিনিং মিলস লিমিটেডসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।
বিজ্ঞাপন
সূত্রের দাবি, নতুন করে আরও ১৪টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান এই সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। প্রতিদিনই নতুন নতুন শিল্পকারখানা ভোলার গ্যাস নেওয়ার জন্য যোগাযোগ করছে। তবে পর্যাপ্ত ট্যাংকার না থাকায় চাহিদার তুলনায় গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।
এদিকে ভোলার গ্যাস ঢাকায় সরবরাহের পরিমাণ বাড়ায় স্থানীয় পর্যায়ে এ নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে। স্থানীয় গ্যাস আন্দোলনের দক্ষিণাঞ্চলীয় কমিটির সভাপতি মোবাশ্বের উল্লাহ বলেন, ইন্ট্রাকো দীর্ঘদিন ধরে ভোলা থেকে গ্যাস নিচ্ছে। তবে গত মাস থেকে প্রতিষ্ঠানটি আগের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ গ্যাস নিচ্ছে।
তিনি বলেন, ভোলা জেলা শহরে আবাসিক গ্যাস সংযোগ দেওয়ার পর অবশিষ্ট গ্যাস ঢাকায় সরবরাহের সুযোগ দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা হয়নি বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
বিজ্ঞাপন
সুন্দরবন গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ডিজিএম মো. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতি ঘনমিটার গ্যাস ১৭ টাকা দরে কিনে ইন্ট্রাকো শিল্পকারখানার কাছে ৪৮ টাকা দরে বিক্রি করছে। ভোলার মজুদ গ্যাস সিএনজি করার পর ট্যাংকারে করে ঢাকায় নেওয়া হয় এবং সেখানে ডিকম্পোজিট করে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ইন্ট্রাকোর সঙ্গে সুন্দরবন গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির একটি চুক্তি হয়। সেই চুক্তি বর্তমানে বহাল রয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৫০ লাখ ঘনফুট গ্যাস নেওয়ার সুযোগ পাবে। স্থানীয়দের একটি অংশ এই চুক্তিকে ‘অসম চুক্তি’ হিসেবে উল্লেখ করে এর সমালোচনা করে আসছেন।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় তৎকালীন জ্বালানি উপদেষ্টা ফয়জুল করিম খান প্রথম দিকে ওই চুক্তি বাতিলের নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়। তবে পরবর্তীতে সেই নির্দেশ কার্যকর হয়নি। এরপর আবারও ইন্ট্রাকো ভোলা থেকে গ্যাস সংগ্রহ শুরু করে।
বিজ্ঞাপন
ভোলা থেকে ঢাকায় গ্যাস পরিবহণে সড়কপথের পাশাপাশি নৌপথও ব্যবহার করা হচ্ছে। ভোলার ইলিশা ফেরিঘাট এলাকা থেকে কার্নিভালক্রুজ ও কার্নিভাল ওয়েব নামের দুটি যাত্রীবাহী ফেরিতে প্রতিদিন গ্যাসভর্তি প্রায় ১৪টি কাভার্ড ট্যাংকার পরিবহণ করা হচ্ছে। প্রতিটি ফেরিতে প্রায় সাতটি করে ট্যাংকার ওঠানো হয়। এর বাইরে আরও দুই থেকে তিনটি ট্যাংকার সড়কপথে ঢাকার দিকে যায়।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
তবে যাত্রীবাহী ফেরিতে গ্যাসবাহী ট্যাংকার পরিবহণ নিয়ে নিরাপত্তা প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিস্ফোরক আইন অনুযায়ী যাত্রীবাহী গণপরিবহণে গ্যাস সিলিন্ডার পরিবহণের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ রয়েছে। সেই বিধিনিষেধের মধ্যেই প্রতিদিন দুটি যাত্রীবাহী ফেরিতে গ্যাসবাহী ট্যাংকার পরিবহণ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
জানা গেছে, কার্নিভাল ওয়েব দুপুর দেড়টা থেকে ২টার মধ্যে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যায়। আর কার্নিভালক্রুজ বিকেল ৫টার দিকে যাত্রা করে।
বিজ্ঞাপন
তবে এ বিষয়ে ইন্ট্রাকোর প্রকল্প ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী আব্বাস বলেন, তাদের ব্যবহৃত গাড়ি ও গ্যাসবাহী ট্যাংকারগুলো বিস্ফোরক আইনের আওতায় প্রয়োজনীয় সনদপ্রাপ্ত। কেবল অনুমোদিত ট্যাংকারের মাধ্যমেই গ্যাস পরিবহণ করা হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
তার ভাষ্য, ট্যাংকারের সংখ্যা বাড়ানো গেলে ভোলা থেকে আরও বেশি পরিমাণ গ্যাস ঢাকায় সরবরাহ করা সম্ভব হবে। এতে বর্তমানে গ্যাসের চাহিদায় থাকা আরও শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে সরবরাহ ব্যবস্থার আওতায় আনা যাবে।








