Logo

সরকারি বেতন দিতে আরও ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিচ্ছে সরকার

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
২৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১৪:৪৯
সরকারি বেতন দিতে আরও ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিচ্ছে সরকার
ছবি : এআই দিয়ে তৈরি

নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অক্টোবরের বেতন এবং আগের তিন মাসের বকেয়া পরিশোধে ব্যাংক খাত থেকে আরও ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিচ্ছে সরকার। এ জন্য ১৪ দিন মেয়াদি বিশেষ ট্রেজারি বিলের নিলাম আহ্বান করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আগামী ১ নভেম্বর নতুন কাঠামো অনুযায়ী বেতন ও বকেয়া অর্থ পরিশোধের পরিকল্পনা রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বুধবার (২৮ অক্টোবর) প্রকাশিত বণিক বার্তার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকারের স্বল্পমেয়াদি অর্থের চাহিদা মেটাতে সাধারণত ৯১, ১৮২ ও ৩৬৪ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিল ইস্যু করা হয়। তবে রাজস্ব আয় ও সরকারি ব্যয়ের মধ্যে সাময়িক ঘাটতি দেখা দিলে অর্থ সংগ্রহে ১৪ দিন মেয়াদি বিশেষ ট্রেজারি বিল ব্যবহার করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের বিল ইস্যুর প্রয়োজন হয়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেট ম্যানেজমেন্ট বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে জানান, ১ নভেম্বর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতনকাঠামো অনুযায়ী বেতন দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এ জন্য অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হওয়ায় বিশেষ ট্রেজারি বিলের নিলাম ডাকা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

অক্টোবরে সরকারি ঋণ ছাড়াতে পারে ৬০ হাজার কোটি টাকা

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অক্টোবরের ২৭ তারিখ পর্যন্ত ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে ব্যাংক খাত থেকে ৫৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে সরকার। নতুন নিলামে আরও ৫ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হলে মাসটিতে মোট ঋণ উত্তোলনের পরিমাণ দাঁড়াবে ৬০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর এক মাসে এটিই হবে সর্বোচ্চ ঋণ উত্তোলন।

এর আগে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাইয়ে ব্যাংক খাত থেকে ৫৬ হাজার কোটি টাকা, আগস্টে ৫০ হাজার কোটি টাকা এবং সেপ্টেম্বরে সাড়ে ৪১ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়।

বিজ্ঞাপন

তবে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে সংগৃহীত ঋণের পুরোটা নতুন ব্যয় মেটাতে ব্যবহৃত হয় না। এর বড় অংশ আগের ঋণের মেয়াদপূর্তিতে পরিশোধ অথবা পুনঃঅর্থায়নে ব্যয় হয়। ফলে মোট ঋণ উত্তোলন এবং সরকারের প্রকৃত বা নিট ঋণের পরিমাণ এক নয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নিট ঋণের পরিমাণ ছিল ২৪ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে নেওয়া হয়েছে ২৩ হাজার ২২৭ কোটি টাকা। বাকি অর্থ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বাড়ছে ট্রেজারি বিলের সুদহার

বিজ্ঞাপন

সরকারের ঋণের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ট্রেজারি বিলের ইল্ড বা সুদহারও বেড়েছে। গত ৫ অক্টোবর ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের ইল্ড ছিল ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ। ২৬ অক্টোবর তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮ দশমিক ৫৫ শতাংশে।

অন্যদিকে, আগস্টের শেষে ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্যের পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত অর্থ থাকা সত্ত্বেও সরকারের ঋণ গ্রহণের ব্যয় বাড়ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, প্রত্যাশা অনুযায়ী রাজস্ব আয় না হওয়ায় সরকারকে ব্যাংক খাত থেকে বাড়তি ঋণ নিতে হচ্ছে। সরকারের চাহিদা অনুযায়ী ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে অর্থের জোগান দেওয়াই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব।

বিজ্ঞাপন

তিনি আরও জানান, ব্যাংক খাতের ওপর সরকারের ঋণনির্ভরতা কমাতে চলতি অর্থবছরে ৩২ হাজার কোটি টাকার শরিয়াহভিত্তিক সুকুক ইস্যুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

বাজেট ঘাটতি ও রাজস্ব আদায়ে চাপ

চলতি অর্থবছরে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। গত অর্থবছরে ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৩৪ হাজার ৫৭১ কোটি টাকা।

বিজ্ঞাপন

এদিকে, চলতি অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেই রাজস্ব আদায়ে ২৫ হাজার ৪৯১ কোটি টাকার ঘাটতি দেখা দেয়। পরবর্তী মাসগুলোতেও প্রত্যাশিত রাজস্ব আদায় না হওয়ায় সরকারের ঋণনির্ভরতা বাড়ছে।

সাবেক অর্থসচিব মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী সরকারি বেতন পরিশোধে বিশেষ ট্রেজারি বিল ইস্যুর বিষয়টিকে অর্থনীতির জন্য উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর মতে, রাজস্ব আয় না বাড়িয়ে নতুন বেতনকাঠামোসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় বাড়ানো হলে সরকারের ঋণের বোঝা দ্রুত বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাত সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী না হওয়ায় সরকারকে ধারাবাহিকভাবে ঋণ নিতে হচ্ছে। এমনকি আগের ঋণের মেয়াদপূর্তিতে অর্থ পরিশোধ করতেও নতুন ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

নতুন বেতনকাঠামোয় ব্যয় বাড়বে কত

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, নতুন বেতনকাঠামোয় সরকারি চাকরিজীবীদের সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

বর্তমানে দেশে বেসামরিক ও প্রতিরক্ষা খাতে প্রায় ২৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। পাশাপাশি পেনশনভোগীর সংখ্যা প্রায় ৯ লাখ ২৫ হাজার। চলতি অর্থবছরের বাজেটে বেতন, ভাতা ও পেনশনের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ৩১ হাজার ২৮৪ কোটি টাকা।

বিজ্ঞাপন

নতুন বেতনকাঠামো ধাপে ধাপে পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হলে সরকারের বার্ষিক ব্যয় প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা বাড়তে পারে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মুশফিকুর রহমান বলেন, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতনকাঠামো প্রয়োজন ছিল। তবে বাড়তি ব্যয়ের চাপ সামাল দিতে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানোর বিকল্প নেই।

সব মিলিয়ে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও বকেয়া পরিশোধে নতুন করে ঋণ নেওয়ার উদ্যোগ এমন সময়ে এসেছে, যখন রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি এবং সরকারি ব্যয়ের চাপ অর্থ ব্যবস্থাপনায় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে ঋণনির্ভরতা কমাতে রাজস্ব আদায় বাড়ানো এবং সরকারি ব্যয়ের সঙ্গে আয়ের ভারসাম্য নিশ্চিত করা জরুরি।

তথ্য সূত্র : বণিক বার্তা

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD