Logo

শীতের বাজারে গ্রীষ্মের উত্তাপ, ক্রেতার মুখে তপ্ত হাওয়া

profile picture
জনবাণী ডেস্ক
২৮ নভেম্বর, ২০২৫, ১০:৫৭
31Shares
শীতের বাজারে গ্রীষ্মের উত্তাপ, ক্রেতার মুখে তপ্ত হাওয়া
ছবি: সংগৃহীত

শীত পড়তে শুরু করেছে সারা বাংলাদেশে। ইতোমধ্যে উত্তর বঙ্গে শীতের হিমেল হাওয়া বইছে। ভোরে ঘন কুয়াশায় চারপাশ অন্ধকারে ছেঁয়ে যায়।

বিজ্ঞাপন

চারপাশে কিছুই দেখা যায় না। দেশে এখনো পুরোপুরি শীত নামেনি, কিন্তু বাজারে তার আগমন টের পাওয়া যাচ্ছে আগেভাগেই।

আসন্ন শীতের সবজিতে ভরপুর হয়ে উঠেছে বাজার। এ সময়টার অন্যতম আনন্দ হলো-বাজারে ঢুকতেই চোখে পড়ে নানা রঙের টাটকা সবজির সারি-লাল টমেটো, সবুজ বাঁধাকপি, ফুলকপি, গাজর, শিম, মটরশুঁটি, মুলা, বেগুন, পালংশাক আরও কত কী!

ঢাকার কাঁচাবাজারগুলোতে এখন থেকেই টাটকা শীতকালীন সবজি উঠতে শুরু করেছে। কিন্তু তাতে ভরা মৌসুমেও কমছে না সবজি বাজারের উত্তাপ।

বিজ্ঞাপন

প্রতিদিনই লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে বিভিন্ন ধরনের শাকসবজির দাম। বাজারে অধিকাংশ সবজির কেজি ৮০ টাকার বেশি। কিছু সবজির দাম ১০০ টাকার ওপরে। ভরা মৌসুমে এমন দামে হতাশ ক্রেতারা।

ক্রেতারা বলছেন, বাজারে শীতকালীন সবজির আমদানি বাড়লেও দাম এখনো কমেনি, উচ্চমূল্যেই বিক্রি হচ্ছে। বিক্রেতারা বলছেন, শীতকালীন সবজি বাজারে নতুন হওয়ায় দাম বাড়তি। শীতকালীন নতুন সবজির দাম বেশি, আবার যেসব সবজি শীতের না সেগুলোর সিজন শেষ বলেও দাম বেশি। এমনই এক পরিস্থিতি চলছে বাজারে। যেখানে সাধারণ মানুষের স্বস্তির জায়গাটাও কমে আসছে। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা উচ্চমূল্যের বাজারে হাঁসফাঁস করছে সাধারণ মানুষ। তবে যেন এদিকে নজর নেই সরকার বা সংশ্লিষ্ট কারোরই।

বিজ্ঞাপন

গত সপ্তাহে রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে দেখা যায়, প্রতি কেজি টমেটো ১২০ টাকা, দেশি টমেটো ১০০ টাকা, কাঁচা টমেটো ৮০ টাকা, দেশি গাজর ১০০ টাকা, চায়না গাজর ১৫০ টাকা, লম্বা বেগুন ১০০ টাকা, সাদা গোল বেগুন ১০০ টাকা, কালো গোল বেগুন ১২০ টাকা, শিম ১০০-১২০ টাকা, শালগম ১০০ টাকা, নতুন আলু ৬০ টাকা, পেঁয়াজপাতা ৮০ টাকা, দেশি শসা ১০০ টাকা, শসা (হাইব্রিড) ৬০-৮০ টাকা, উচ্ছে ৮০ টাকা, করলা ৮০ টাকা, কাঁকরোল ৮০ টাকা, ঢ্যাঁড়স ১০০ টাকা, পটোল (হাইব্রিড) ৬০ টাকা, দেশি পটোল ৯০-১০০ টাকা, চিচিঙ্গা ৮০ টাকা, ধুন্দল ১০০ টাকা, ঝিঙা ১০০ টাকা, বরবটি ১০০ টাকা, কচুর লতি ৮০ টাকা, মুলা ৬০ টাকা, কচুরমুখী ৭০-৮০ টাকা, কাঁচা মরিচ ১০০-১২০ টাকা, ধনেপাতা (মানভেদে) ২০০-৩৬০ টাকা, পেঁপে ৩৫-৪০ টাকা ও মিষ্টি কুমড়া ৮০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

আর মানভেদে প্রতিটি লাউ ৮০-১২০ টাকা, চাল কুমড়া ৭০-৮০ টাকা, ফুলকপি ৫০-৬০ টাকা, বাঁধাকপি ৫০-৬০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। আর প্রতি হালি কাঁচা কলা ৪০-৬০ টাকা। এ ছাড়া, প্রতি হালি লেবু বিক্রি হচ্ছে ৩০-৪০ টাকা করে।

বিজ্ঞাপন

বাজারে কাঁচা মরিচ, ধনেপাতা ও লেবু বাদ দিলে মূল সবজির মধ্যে ২০টির দাম ১০০ টাকা বা তারও ওপরে। ৬০ টাকা থেকে ১০০ টাকার মধ্যে রয়েছে মাত্র ৬ ধরনের সবজির দাম। আর ৫০ টাকা বা তার নিচে রয়েছে ৩টি সবজির দাম।

গতবছর এ সময় সবজির দাম কম ছিল। কিন্তু এ বছর যে হারে সবজির বাজার উর্ধ্বমুখী বুঝাই যাচ্ছে পুরো শীত জুড়ে ক্রেতা সাধারণ ভোগান্তিতে পড়তে হবে। অনেকেই বলছে, এ বছর একটা লম্বা সময় ধরে বিভিন্ন অঞ্চলে টানা বৃষ্টি হয়েছে। ফলে বৃষ্টির সময়ে কেউ আগাম সবজি চাষের ঝুঁকি নেননি।

এ কারণে আগাম শীতকালীন সবজি অক্টোবরের শেষে বাজারে আসা শুরু হয়েছে। তাছাড়া এখনো সিন্ডিকেট বাণিজ্য বাজার নিয়ন্ত্রণ করে যাচ্ছে নীরবভাবে। গত বছর অন্তর্বতীকালীন সরকার বাজার নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও এবছর কার্যকরী কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না বরং সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

এরই সুযোগে অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট সুযোগ নিয়ে অস্থির করে তুলেছে নিত্য প্রয়োজনীয় বাজার। যার দুরূন ভোগান্তি পড়েছে সাধারণ ক্রেতা। বিশেষ করে যারা নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত, তাদের এখন দিন আনতে পান্তা ফুটায় অবস্থা।

বাজারের আসলেই কথা হল বিভিন্ন গৃহিণীর সঙ্গে। তারা বলেন, “শীতের সবজি আছে ঠিকই, কিন্তু শীতের আনন্দ নেই। বাজারে বের হলেই মনে হয় চৈত্রের দুপুর—প্রখর রোদ, খুবই অস্বস্তিকর। শীতকালে এরকম গরম আগে কখনো অনুভব করিনি।

বিজ্ঞাপন

সিন্ডিকেটের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রভাব হলো পণ্যের দাম বৃদ্ধি। তারা কৃত্রিমভাবে সরবরাহ কমিয়ে বা অধিকাংশ মজুত নিজেদের দখলে রেখে বাজারে সংকট তৈরি করে। ফলে সাধারণ ক্রেতাকে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি দামে পণ্য কিনতে হয়। সিন্ডিকেট সাধারণত পাইকারি স্তরেই নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে খুচরা বিক্রেতারা উচ্চ দামে পণ্য কিনে কম লাভে বিক্রি করতে বাধ্য হয়।

অপরদিকে ভিন্ন পথে পণ্য সংগ্রহ করতে না পারায় তারা সিন্ডিকেটের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। সিন্ডিকেট মূলত দ্রুত মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যেই সক্রিয়। তাদের কারণে বাজার অস্থির হয়ে পড়ে—এক সময় দাম খুব বাড়ে, আবার কোনো সময় পড়ে যায়।

বিজ্ঞাপন

বিনিয়োগের স্থিতিশীল পরিবেশ না থাকলে কৃষক ও উৎপাদক পরিকল্পনা করতে পারে না, অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সিন্ডিকেট টিকে থাকতে সাধারণত প্রশাসনের কিছু অংশের সহায়তা, দুর্নীতি বা অনিয়মের পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন হয়। ফলে দুর্নীতির জাল আরও বিস্তৃত হয়, যা সামাজিক ও রাষ্ট্রিক কাঠামোকেও দুর্বল করে দেয়।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এখন পূর্ণোদ্যমে জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। নির্বাচনকে ঘিরে প্রশাসনিক তৎপরতা বাড়ছে, কর্মকর্তাদের গতিবিধি এবং রাজনৈতিক অঙ্গনের আলোচনা যেন একমাত্র কেন্দ্রবিন্দুতেই আটকে আছে—কীভাবে নির্বাচন শান্তিপূর্ণ ও সফলভাবে সম্পন্ন করা যায়। কিন্তু দেশের বাজারে পণ্যদ্রব্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি ও সাধারণ মানুষের নিত্যভোগ্য ভোগান্তি যেন সেই আলোচনার প্রান্তসীমাতেও নেই।

বিজ্ঞাপন

বিগত বছরের তুলনায় সবজির দাম এখন আকাশছোঁয়া। গত মৌসুমে যেসব সবজি মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের টেবিলে স্বচ্ছন্দে জায়গা করে নিয়েছিল, এবছর তার অর্ধেকও নাগালের মধ্যে নেই। শিম, বেগুন, পেঁয়াজ, টমেটো থেকে শুরু করে সাধারণ পাতা-সবজি—সবকিছুতেই আগুনের ছোঁয়া। প্রতিদিন বাজারে গিয়ে সাধারণ ক্রেতারা হিমশিম খাচ্ছে; অনেকে প্রয়োজনীয় পণ্য কেনার আগে হিসাব মিলাতে মিলাতে ঠান্ডা ঘাম ঝরাচ্ছে। দুই বেলা খাবার জোগাড় করাই যেন এখন যুদ্ধের সমান চ্যালেঞ্জ।

এ অবস্থায় সবচেয়ে বড় উদ্বেগ—বাজার ব্যবস্থাপনায় দৃশ্যমান মনিটরিংয়ের অভাব। প্রশাসনের নজরদারি দুর্বল হওয়ায় দাম নিয়ন্ত্রণে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়ে না।

ক্রেতাদের অভিযোগ, বাজারে সিন্ডিকেট সক্রিয়, তারা চাইলে মুহূর্তেই দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে। আর অসহায় সাধারণ মানুষ দামের চাপে পিষ্ট হলেও, তাদের স্বস্তি ফেরানোর মতো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না বললেই চলে।

বিজ্ঞাপন

বিশেষজ্ঞদের মত, নির্বাচন-মনোযোগী পরিবেশে বাজার-নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি তুলনামূলকভাবে গুরুত্ব হারিয়ে ফেলেছে। সেখানে নীতি নির্ধারণ, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ বা মাঠপর্যায়ে অভিযান—কোনোটিরই গতি তেমন নেই। ফলে মানুষের মধ্যে এক ধরনের ক্ষোভ, হতাশা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ‘নির্বাচন শেষ হলেই হয়তো হাফ ছাড়া যাবে’—এমন আশা নিয়েই অনেকেই দিন পার করছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন, বৃষ্টির অস্বাভাবিকতা ও লবণাক্ততা বৃদ্ধির ফলে কৃষিতে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে। এ সত্যকে মেনে নিতে হবে। এ পরিস্থিতিতে আধুনিক প্রযুক্তির চাষাবাদ বাড়াতে হবে। বিশেষ করে এক ফসলি জমিকে দুই বা তিন ফসলি করা এবং নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো জরুরি।

বিজ্ঞাপন

জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে খাদ্যের চাহিদা মেটাতে কৃষিতে প্রযুক্তিনির্ভর অভিযোজনের বিকল্প নেই। কম খরচে পলিথিনের শেড তৈরি করে সবজি চাষ করা সম্ভব, যা বৃষ্টি বা তাপমাত্রার পরিবর্তনে তেমন প্রভাবিত হয় না।

পাতাজাতীয় শাকসবজি, মরিচ, টমেটো, বেগুন ও শসার মতো ফসল এতে সহজে উৎপাদন করা যায়। উৎপাদন স্থিতিশীল থাকলে সবজির সরবরাহ ঠিক থাকবে, কৃষকেরাও ভালো দাম পাবেন।

দেশের রাজনৈতিক কার্যক্রম ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একইসঙ্গে মানুষের মৌলিক জীবনযাত্রার নিশ্চয়তাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। নির্বাচন আয়োজন ও বাজার নিয়ন্ত্রণ—উভয় ক্ষেত্রেই ভারসাম্য আনাই এখন সময়ের দাবি। জনগণের ক্ষুধা-দুশ্চিন্তা রাজনৈতিক উত্তাপের শব্দে যেন চাপা পড়ে না যায়—এ প্রত্যাশাই সবার।

তাছাড়া বাজার নিয়ন্ত্রণ শুধু দপ্তরের দায়িত্ব নয়; এটি সরবরাহ–ব্যবস্থাপনা, আইন প্রয়োগ, ভোক্তা অধিকার এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সমন্বয়। সঠিক পরিকল্পনা, শক্ত মনিটরিং এবং ন্যায্য বাণিজ্য নিশ্চিত করা গেলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ফিরে আসবে—বাজারে আবার ভারসাম্য তৈরি হবে।

মো: আরফাতুর রহমান (শাওন)

শিক্ষক, লেখক, কলামিস্ট ও মোটিভেশনাল বক্তা।

জেবি/এসএ
Logo

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ

মোঃ শফিকুল ইসলাম ( শফিক )

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ৫৭, ময়মনসিংহ লেন, ২০ লিংক রোড, বাংলামটর, ঢাকা-১০০০।

ফোনঃ 02-44615293

ই-মেইলঃ dailyjanobaninews@gmail.com; dailyjanobaniad@gmail.com

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৫

Developed by: AB Infotech LTD