Logo

প্রাথমিক শিক্ষায় আসছে বড় রূপান্তর, বাজেটে থাকছে নতুন উদ্যোগ

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
৯ জুন, ২০২৬, ১৪:৪৫
প্রাথমিক শিক্ষায় আসছে বড় রূপান্তর, বাজেটে থাকছে নতুন উদ্যোগ
ছবি : জনবাণী গ্রাফিক্স

দেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে আধুনিক, দক্ষতাভিত্তিক ও প্রযুক্তিনির্ভর কাঠামোয় রূপ দিতে আসন্ন জাতীয় বাজেটে একাধিক বড় উদ্যোগের প্রতিফলন ঘটতে পারে। শিক্ষার্থীদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে মিড-ডে মিল কর্মসূচির সম্প্রসারণ, বিনামূল্যে ইউনিফর্ম ও শিক্ষা উপকরণ বিতরণ, ডিজিটাল শ্রেণিকক্ষ স্থাপন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ জোরদার এবং শিক্ষা অবকাঠামোর উন্নয়নের মতো বিষয়গুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সরকার প্রাথমিক শিক্ষাকে শুধু পাঠ্যবই ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না। বরং শিশুদের প্রযুক্তি জ্ঞান, সৃজনশীল চিন্তা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের প্রস্তুতির সঙ্গে শিক্ষা কার্যক্রমকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে শিক্ষা ব্যবস্থার প্রায় সব স্তরে পরিবর্তনের ভিত্তি গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

স্মার্ট শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তি তৈরির পরিকল্পনা

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের মতে, সরকারের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো একটি সমন্বিত ‘স্মার্ট এডুকেশন ইকোসিস্টেম’ গড়ে তোলা। এই ব্যবস্থায় প্রযুক্তি, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও শিক্ষা প্রশাসনকে একই কাঠামোর আওতায় এনে ধাপে ধাপে শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন করা হবে।

বিজ্ঞাপন

নীতিনির্ধারকদের ভাষ্য, আধুনিক বিশ্বে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখতে হলে শিক্ষার্থীদের শুধু পাঠ্যজ্ঞান নয়, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা এবং সৃজনশীল চিন্তাভাবনার বিকাশও জরুরি। তাই নতুন প্রজন্মকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করতে শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেছেন, সরকার এমন একটি শিক্ষা কাঠামো গড়ে তুলতে চায়, যা আন্তর্জাতিক মানের, দক্ষতাভিত্তিক এবং কর্মমুখী হবে। তার মতে, আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা একদিনে তৈরি করা সম্ভব নয়; বরং ধাপে ধাপে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে তা বাস্তবায়ন করতে হবে।

বিজ্ঞাপন

ডিজিটাল শ্রেণিকক্ষ নির্মাণে গুরুত্ব

আসন্ন বাজেটে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রযুক্তিনির্ভর শ্রেণিকক্ষ গড়ে তোলার বিষয়টি অগ্রাধিকার পেতে পারে। এ পরিকল্পনার আওতায় বিদ্যালয়গুলোতে ডিজিটাল কনটেন্ট ব্যবহারের সুযোগ বাড়ানো, ইন্টারঅ্যাকটিভ শিক্ষণ পদ্ধতি চালু করা এবং উন্নত ইন্টারনেট ও প্রযুক্তিগত সংযোগ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আধুনিক শিক্ষণ পদ্ধতি চালুর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পাঠ গ্রহণ আরও সহজ ও আকর্ষণীয় হবে। পাশাপাশি শিক্ষকরা পাঠদানে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ পাবেন।

বিজ্ঞাপন

এ লক্ষ্যে বিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তি সরঞ্জাম সরবরাহ এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্যও বাজেটে বাড়তি বরাদ্দের সম্ভাবনা রয়েছে।

শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নে গুরুত্ব

শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নের ক্ষেত্রে শিক্ষককে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তাই প্রযুক্তি ব্যবহারে সক্ষমতা বৃদ্ধি, আধুনিক শিক্ষণ পদ্ধতি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন এবং পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের জন্য শিক্ষক প্রশিক্ষণ কার্যক্রমকে আরও বিস্তৃত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, উন্নত প্রযুক্তি ও আধুনিক শ্রেণিকক্ষের পাশাপাশি দক্ষ শিক্ষক নিশ্চিত করা না গেলে কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন সম্ভব হবে না। এজন্য শিক্ষক উন্নয়ন কার্যক্রমও নতুন পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

মিড-ডে মিল কর্মসূচির জাতীয় সম্প্রসারণ

আসন্ন বাজেটে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেতে পারে শিক্ষার্থীদের জন্য মিড-ডে মিল কর্মসূচি। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে এই কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে এবং প্রাথমিক ফলাফল ইতিবাচক বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

বিজ্ঞাপন

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী বছর দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এই সুবিধার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

তাদের মতে, মিড-ডে মিল শুধু খাদ্য সহায়তা নয়; এটি শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বৃদ্ধি, ঝরে পড়ার হার কমানো, পুষ্টি নিশ্চিত করা এবং শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, বিদ্যালয়ে নিয়মিত পুষ্টিকর খাবার সরবরাহ করা গেলে দরিদ্র পরিবারের শিশুদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখা সহজ হবে এবং তাদের শেখার সক্ষমতাও বাড়বে।

বিজ্ঞাপন

এক কোটির বেশি শিক্ষার্থী পাবে ইউনিফর্ম ও স্কুলব্যাগ

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ইউনিফর্ম, জুতা, মোজা ও স্কুলব্যাগ বিতরণের একটি বৃহৎ কর্মসূচিও বাস্তবায়নের পথে রয়েছে।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, দেশের প্রায় ১ কোটি ৭ লাখ শিক্ষার্থীকে পর্যায়ক্রমে এসব উপকরণ বিনামূল্যে দেওয়া হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, জাতীয় পর্যায়ে কর্মসূচি বাস্তবায়নের আগে পরীক্ষামূলকভাবে কয়েকটি এলাকায় বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।

বিজ্ঞাপন

আগামী জুলাই ও আগস্ট মাসে শুরু হতে যাওয়া পাইলট প্রকল্পে সাড়ে তিন লাখের বেশি শিক্ষার্থীকে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথম ধাপে অন্তত এক লাখ শিক্ষার্থীর হাতে ইউনিফর্ম, জুতা, মোজা ও স্কুলব্যাগ তুলে দেওয়া হবে।

পরবর্তীতে মূল্যায়নের ভিত্তিতে ধাপে ধাপে দেশের অন্যান্য শিক্ষার্থীদেরও এই সুবিধার আওতায় আনা হবে।

বিজ্ঞাপন

মানসম্পন্ন ও টেকসই উপকরণ সরবরাহের পরিকল্পনা

পাইলট কর্মসূচির আওতায় বিতরণযোগ্য উপকরণগুলোর মান নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, শিক্ষার্থীদের ব্যবহারের উপযোগী, টেকসই এবং মানসম্পন্ন উপকরণ সরবরাহের জন্য বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

স্কুলব্যাগগুলো পানি প্রতিরোধী বা ওয়াটারপ্রুফ করার পরিকল্পনাও রয়েছে, যাতে শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ সময় ব্যবহার করতে পারে।

বিজ্ঞাপন

নীতিনির্ধারকদের মতে, পরীক্ষামূলক পর্যায়ে পাওয়া অভিজ্ঞতা ও সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করে জাতীয় পর্যায়ে কর্মসূচি বাস্তবায়নের সময় প্রয়োজনীয় সংশোধন আনা হবে।

দেশের সব উপজেলাকে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ

কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পাইলট প্রকল্পে দেশের প্রতিটি উপজেলার প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এজন্য বিভিন্ন উপজেলার একাধিক বিদ্যালয়কে পরীক্ষামূলক কার্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, দেশের ২৫ হাজারেরও বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যায়ক্রমে এই কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত হবে। যদি পরীক্ষামূলক বাস্তবায়ন সফল হয়, তাহলে আগামী বছরের শুরু থেকেই দেশব্যাপী পূর্ণাঙ্গভাবে কর্মসূচি চালু করা হতে পারে।

প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষায় বাড়তি অর্থায়নের সম্ভাবনা

এদিকে শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন সম্প্রতি জানিয়েছেন, শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ধাপে ধাপে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের।

আগামী অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষা খাতে জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ বরাদ্দের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এটি অনুমোদিত হলে প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত অর্থায়নের সুযোগ তৈরি হবে।

এই অর্থ শিক্ষা অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তি সংযোজন, শিক্ষার্থী কল্যাণ এবং বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় করা হতে পারে।

১৪ লাখ ট্যাব বিতরণের পরিকল্পনা

শিক্ষা খাতের ডিজিটাল রূপান্তরের অংশ হিসেবে বৃহৎ পরিসরে ট্যাব সরবরাহের একটি পরিকল্পনাও বিবেচনায় রয়েছে। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, পর্যায়ক্রমে প্রায় ১৪ লাখ ট্যাব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করা হতে পারে।

প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত হলে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, কারিগরি এবং মাদরাসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হবে।

আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা গঠনের পথে নতুন পদক্ষেপ

সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রযুক্তি, পুষ্টি, শিক্ষা উপকরণ, দক্ষ শিক্ষক এবং উন্নত অবকাঠামো—এই পাঁচটি উপাদানকে কেন্দ্র করেই নতুন শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের প্রস্তুতি চলছে।

সরকারের লক্ষ্য এমন একটি প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে শিশুরা শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করার জন্য নয়, বরং ভবিষ্যতের কর্মজীবন, প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্ব এবং দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠার জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করবে।

আসন্ন বাজেটে এসব উদ্যোগের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত হলে দেশের প্রাথমিক শিক্ষা খাতে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও কাঠামোগত পরিবর্তনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD