Logo

১৫৮ শিক্ষার্থীর নার্সিং কলেজে ২২ বিষয়ে শিক্ষক মাত্র একজন

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১৫ অক্টোবর, ২০২৬, ১৮:২৯
১৫৮ শিক্ষার্থীর নার্সিং কলেজে ২২ বিষয়ে শিক্ষক মাত্র একজন
ছবি: সংগৃহীত

শরীয়তপুরের ডামুড্যায় অবস্থিত আলহাজ আব্দুর রাজ্জাক নার্সিং কলেজে শিক্ষকসংকট, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের ঘাটতি, আবাসিক সমস্যাসহ নানা জটিলতায় ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষা কার্যক্রম। চার ব্যাচের ১৫৮ শিক্ষার্থীর ২২টি বিষয়ের পাঠদানের দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র একজন শিক্ষক। সাতটি ল্যাবের মধ্যে সচল রয়েছে একটি। এর সঙ্গে সরকারি বরাদ্দ ও শিক্ষাবৃত্তি আটকে থাকায় আর্থিক সংকটেও পড়েছেন শিক্ষার্থীরা।

বিজ্ঞাপন

প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে পাঁচ একর জমির ওপর ২০২৩ সালে কলেজটি নির্মাণ করা হয়। ডামুড্যা উপজেলার দক্ষিণ ডামুড্যা এলাকায় প্রতিষ্ঠিত এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো থাকলেও পর্যাপ্ত শিক্ষক, ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের সরঞ্জাম এবং প্রশাসনিক সুবিধার অভাবে শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

কলেজের চারটি ব্যাচের পাঠদান, পাঠ্যসূচি সম্পন্ন করা এবং শিক্ষার্থীদের একাডেমিক সহায়তা দেওয়ার দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে একজন শিক্ষককে। প্রয়োজনে অধ্যক্ষকেও পাঠদানে অংশ নিতে হচ্ছে। ফলে নির্ধারিত সময়ে পাঠ্যসূচি শেষ করা এবং শিক্ষার্থীদের যথাযথ প্রস্তুতি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

২২টি বিষয়ে শিক্ষক একজন, উদ্বিগ্ন শিক্ষার্থীরা

বিজ্ঞাপন

কলেজের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী অর্পিতা দাস বলেন, “আমাদের ২২টি সাবজেক্ট অথচ শিক্ষক একজন ও অধ্যক্ষ একজন। আমাদের সাবজেক্টগুলো সব ইংরেজিতে। অথচ এভাবে একজন শিক্ষকের কাছ থেকে কতটুকু শিক্ষা পাবো। এভাবে আমরা নিজেরা পড়াশোনা করে কতদূর আগাতে পারবো সেটাই চিন্তার বিষয়।”

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

শিক্ষার্থীদের আশঙ্কা, প্রয়োজনীয় শিক্ষক না থাকায় ক্লাসের পাশাপাশি পরীক্ষার প্রস্তুতি ও পেশাগত দক্ষতা অর্জনেও ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। বিশেষ করে নার্সিংয়ের মতো ব্যবহারিক জ্ঞাননির্ভর শিক্ষায় এই সংকট ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের প্রস্তুতিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

সাতটি ল্যাবের মধ্যে সচল মাত্র একটি

নার্সিং শিক্ষায় রোগীর সেবা, শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ, চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কলেজটির সাতটি ল্যাবের মধ্যে মাত্র একটি চালু রয়েছে। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাবেও ব্যবহারিক ক্লাস ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।

বিজ্ঞাপন

শিক্ষার্থী মাহিমা আক্তার বলেন, নার্সিং শিক্ষায় ব্যবহারিক জ্ঞান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনীয় ল্যাবগুলো সচল না থাকায় প্রশিক্ষণের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ছে। এতে ভবিষ্যতে পেশাগত দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তিনি শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি সব ল্যাব সচল করে পর্যাপ্ত ব্যবহারিক ক্লাস চালুর দাবি জানান।

আরেক শিক্ষার্থী আফসানা আক্তার বলেন, “আমাদের ল্যাবের যে সব সরঞ্জাম থাকার কথা, এগুলোর কিছুই নেই। যদি আমরা ল্যাবের ক্লাসগুলো না পাই তাহলে শুধুমাত্র পাঠ্য বই পড়ে কতটুকু জ্ঞান অর্জন করতে পারব।”

তিনি আরও বলেন, “এমনকি এখানে ৫০ শয্যার হাসপাতাল থাকায় ক্লিনিক্যাল যেই প্রশিক্ষণ তা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছি। এখান থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা হলেও আমরা পুরোপুরি নার্স হিসেবে গড়ে উঠতে পারবো না।”

বিজ্ঞাপন

আইবাস জটিলতায় আটকে বরাদ্দ, বন্ধ শিক্ষাবৃত্তি

শিক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি কলেজটিতে আর্থিক ও প্রশাসনিক জটিলতাও রয়েছে। প্রতিষ্ঠান চালুর পর কয়েক বছর পেরিয়ে গেলেও ইন্টিগ্রেটেড বাজেট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টিং সিস্টেমের (আইবাস) কার্যক্রম চালু হয়নি বলে জানিয়েছে কলেজ কর্তৃপক্ষ। ফলে সরকারি বরাদ্দ পাওয়া ও আর্থিক কার্যক্রম পরিচালনায় সমস্যা হচ্ছে। বন্ধ রয়েছে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাবৃত্তিও।

শিক্ষার্থী দিলরুবা দীপা বলেন, “আমরা সরকারি নার্সি কলেজে ভর্তি হয়েছি যাতে সরকারি খরচে পড়াশোনা করতে পারি। অথচ আমাদের আইবাস এখনো চালু হয়নি। বেসরকারি নার্সিংয়ে যেমন খরচ হচ্ছে আমাদেরও ঠিক একই খরচ হচ্ছে। বাসা থেকে টাকা এনে খরচ চালাতে হয়। আমরা চাই দ্রুত সময়ের মধ্যে আইবাস চালু হোক।”

বিজ্ঞাপন

সরকারি প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেও নিজেদের খরচ চালাতে পরিবারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। তাঁদের দাবি, দ্রুত আইবাস চালু করে সরকারি বরাদ্দ ও শিক্ষাবৃত্তির ব্যবস্থা কার্যকর করতে হবে।

হোস্টেলে গ্যাস-পানির সংকট, নেই নিরাপত্তাপ্রহরী

কলেজের আবাসিক ব্যবস্থাপনাতেও রয়েছে নানা সমস্যা। হোস্টেলে গ্যাস ও পানির সংকটে শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন জীবনযাপন ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি শিক্ষক, কর্মচারী ও নিরাপত্তাকর্মীর ঘাটতিও রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

শিক্ষার্থী আদিবা আক্তার বলেন, “আমাদের কলেজ এবং হোস্টেলে কোনো নিরাপত্তা প্রহরী নেই। যেকোনো সময় বহিরাগত লোকজন প্রবেশ করতে পারে। আমরা অনিরাপদ পরিবেশে পড়াশোনা করছি। এতে মানসিকভাবেও আমরা সবসময় দুশ্চিন্তায় থাকি। আমরা চাই কলেজটিতে জনবল দেওয়া হোক।”

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

শিক্ষার্থীদের মতে, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিরাপদ আবাসন, পর্যাপ্ত জনবল এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করাও জরুরি।

শিক্ষকসংকটের কথা স্বীকার করলেন কলেজের শিক্ষক

কলেজটির শিক্ষক অসিমা রানী সরকার জানান, ২২টি বিষয়ের পাঠদানের জন্য তিনি একাই দায়িত্ব পালন করছেন। অধ্যক্ষও ক্লাস নেন। সাতটি ল্যাব পরিচালনার জন্য আলাদা শিক্ষক প্রয়োজন হলেও প্রতিষ্ঠানটিতে সেই জনবল নেই। প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ঘাটতিও রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, “আমরা যেভাবে এতগুলো ক্লাস নিচ্ছি, সেটি শুধু এটি নামেই ক্লাস হয়। এখান থেকে আমাদের যেই শিক্ষার্থীরা বের হবে তারা স্কিলফুল নার্স হিসেবে গড়ে উঠতে পারবে না।”

অসিমা রানী সরকারের ভাষ্য, শিক্ষক ও সরঞ্জামের অভাবের পাশাপাশি প্রশাসনিক জটিলতাও পরিস্থিতিকে কঠিন করে তুলেছে। কলেজ চালুর পর কয়েক বছর পেরিয়ে গেলেও আইবাস কার্যকর না হওয়ায় আর্থিক ব্যবস্থাপনায় সমস্যা রয়ে গেছে।

সমস্যা সমাধানে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আশ্বাস

বিজ্ঞাপন

আলহাজ আব্দুর রাজ্জাক নার্সিং কলেজের অধ্যক্ষ (অতিরিক্ত দায়িত্ব) জাহিদ হোসেন বলেন, প্রতিষ্ঠান চালুর পর প্রয়োজনীয় জনবলের পদ সৃষ্টি ও আইবাস কোড চালু হয়নি। নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মীর অভাবেও প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় ভোগান্তি হচ্ছে।

তিনি বলেন, “আমরা বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করেছি। তারা আশ্বাস দিয়েছেন সমস্যা সমাধানের জন্য।”

শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের দাবি, দ্রুত প্রয়োজনীয় শিক্ষক নিয়োগ, সব ল্যাব সচল করা, ব্যবহারিক ও ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানো এবং প্রশাসনিক জটিলতা দূর করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে সরকারি বরাদ্দ ও শিক্ষাবৃত্তি চালু করে আবাসিক সুবিধা এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা। তাঁদের প্রত্যাশা, এসব সমস্যার সমাধান হলে শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে মানসম্মত নার্সিং শিক্ষা গ্রহণ করতে পারবেন।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD