জুরাসিক পার্কের তারকা স্যাম নিল আর নেই, বিশ্বজুড়ে শোক

হলিউডের কিংবদন্তি অভিনেতা এবং ‘জুরাসিক পার্ক’ চলচ্চিত্রের ড. অ্যালান গ্রান্ট চরিত্রে অভিনয়ের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত স্যাম নিল আর নেই। সোমবার (স্থানীয় সময়) অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে ৭৮ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুর খবর পরিবারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
অভিনেতার পরিবারের দেওয়া এক বিবৃতিতে জানানো হয়, স্যাম নিলের মৃত্যু আকস্মিক এবং অপ্রত্যাশিত ছিল। তবে তারা এটাও জানিয়েছেন যে, মৃত্যুর আগে তিনি ক্যানসারমুক্ত অবস্থায় ছিলেন। দীর্ঘদিন বিরল ধরনের রক্তের ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করলেও চলতি বছরের এপ্রিল মাসে তিনি চিকিৎসকদের কাছ থেকে ক্যানসারমুক্ত হওয়ার সুখবর পেয়েছিলেন।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, জীবনের শেষ মুহূর্তে স্যাম নিল তার স্বজনদের সঙ্গেই ছিলেন। তারা জানান, নিজের সারাজীবনের মতোই শান্ত ও মর্যাদাপূর্ণভাবে তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। একই সঙ্গে চিকিৎসাকালে সেবা দেওয়া সিডনির সেন্ট ভিনসেন্টস প্রাইভেট হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও সংশ্লিষ্ট কর্মীদের প্রতিও গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে তার পরিবার।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
পরিবার আরও জানিয়েছে, শোকের এই কঠিন সময়ে তাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার সুযোগ দেওয়ার জন্য সবার প্রতি অনুরোধ জানানো হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে শেষকৃত্যসহ অন্যান্য আনুষ্ঠানিক বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হবে।
প্রায় পাঁচ দশকের দীর্ঘ অভিনয়জীবনে স্যাম নিল অসংখ্য চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন সিরিজে অভিনয় করেছেন। ক্যারিয়ারে তিনি নাটক, অ্যাডভেঞ্চার, থ্রিলার, বিজ্ঞান কল্পকাহিনি এবং ঐতিহাসিক নানা ধরনের চরিত্রে অভিনয় করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষ সুনাম অর্জন করেন।
বিজ্ঞাপন
তবে তার সবচেয়ে স্মরণীয় চরিত্র নিঃসন্দেহে স্টিভেন স্পিলবার্গ পরিচালিত ‘জুরাসিক পার্ক’ চলচ্চিত্রের প্রত্নজীববিজ্ঞানী ড. অ্যালান গ্রান্ট। ১৯৯৩ সালে মুক্তি পাওয়া এই সিনেমা বিশ্বব্যাপী বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং স্যাম নিলের অভিনয়ও দর্শক-সমালোচকদের ব্যাপক প্রশংসা কুড়ায়। পরবর্তীতে এই ফ্র্যাঞ্চাইজির একাধিক চলচ্চিত্রেও তিনি একই চরিত্রে অভিনয় করেন।
এ ছাড়া ‘দ্য পিয়ানো’, ‘পিকি ব্লাইন্ডার্স’সহ আরও বহু জনপ্রিয় সিনেমা ও টেলিভিশন প্রযোজনায় তার অভিনয় দর্শকদের কাছে সমানভাবে সমাদৃত হয়।
২০২৩ সালে ‘জুরাসিক পার্ক’-এর ৩০ বছর পূর্তি উপলক্ষে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্যাম নিল বলেছিলেন, চলচ্চিত্রে অভিনয়কে তিনি কখনোই নিজের নিশ্চিত পেশা হিসেবে ভাবেননি। তার ভাষায়, অভিনয়জীবন যেন অপ্রত্যাশিতভাবে তার জীবনে এসেছে, আর এত দীর্ঘ পথচলা তাকে নিজেকেও বিস্মিত করেছে।
বিজ্ঞাপন
তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন নিউজিল্যান্ডের অভিনেতা কার্ল আরবানসহ বিনোদন অঙ্গনের বহু তারকা। কার্ল আরবান বলেন, স্যাম নিল শুধু একজন অসাধারণ অভিনেতাই ছিলেন না, তিনি নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস ছিলেন। নিজের দেশের সংস্কৃতি ও চলচ্চিত্রকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরতে তার অবদান সবসময় স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
স্যাম নিলের জন্ম উত্তর আয়ারল্যান্ডে হলেও মাত্র সাত বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে নিউজিল্যান্ডে চলে যান। পরবর্তীতে সেখানেই তার বেড়ে ওঠা এবং অভিনয়জীবনের সূচনা। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি বহু রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মাননা লাভ করেন। ১৯৯১ সালে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ‘অফিসার অব দ্য অর্ডার অব দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার’ (ওবিই) খেতাবে ভূষিত হন। ২০২২ সালে নিউজিল্যান্ড সরকার তাকে নাইটহুড প্রদান করে।
২০২৫ সালে নিউজিল্যান্ড স্ক্রিন অ্যাওয়ার্ডসে ‘স্ক্রিন লেজেন্ড’ সম্মাননা গ্রহণের সময় নিজের স্বভাবসুলভ রসবোধে তিনি বলেছিলেন, দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে যাওয়ার কারণেই হয়তো এমন সম্মান পাওয়া সম্ভব হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
হলিউডের ব্যস্ত জীবন ছাড়াও নিউজিল্যান্ডের গ্রামীণ পরিবেশে কাটানো সময় ছিল তার সবচেয়ে প্রিয়। নিজের খামারে তিনি বিভিন্ন পশুর নাম রাখতেন হলিউডের বিখ্যাত অভিনেতা-অভিনেত্রীদের নামে। এই মজার অভ্যাস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।
১৯৯৩ সালে নিউজিল্যান্ডের ওটাগো অঞ্চলে তিনি ‘টু প্যাডকস’ নামে একটি জৈব আঙুরখেত ও ওয়াইনারি প্রতিষ্ঠা করেন। বন্ধু ও পরিবারের জন্য উন্নতমানের পিনো নোয়ার ওয়াইন উৎপাদনের স্বপ্ন থেকেই এই উদ্যোগের সূচনা হয়েছিল।
অভিনয়ের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণেও তিনি ছিলেন সক্রিয়। ২০২৬ সালের শুরুতে নিউজিল্যান্ডের সেন্ট্রাল ওটাগো অঞ্চলে প্রস্তাবিত একটি শিল্পভিত্তিক স্বর্ণখনির বিরুদ্ধে একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রকাশ করেন এবং পরিবেশ রক্ষার পক্ষে সরব অবস্থান নেন।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
২০২৩ সালে স্যাম নিল প্রকাশ্যে জানান, তিনি বিরল ধরনের রক্তের ক্যানসার অ্যাঞ্জিওইমিউনোব্লাস্টিক টি-সেল লিম্ফোমা-তে আক্রান্ত হয়েছেন। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে কেমোথেরাপি গ্রহণ করেন। চিকিৎসাধীন অবস্থাতেই তিনি নিজের আত্মজীবনী ‘Did I Ever Tell You This?’ লিখে শেষ করেন, যা প্রকাশের পর পাঠকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে।
বিজ্ঞাপন
২০২৪ সালে এক সাক্ষাৎকারে মৃত্যুকে ঘিরে নিজের দৃষ্টিভঙ্গিও তুলে ধরেছিলেন তিনি। সেখানে বলেন, মৃত্যু তাকে ভীত করে না। তবে জীবনে এখনও অনেক কাজ বাকি থাকায় মৃত্যুকে তিনি কিছুটা বিরক্তিকর বলেই মনে করেন।
ব্যক্তিগত জীবনে আন্তর্জাতিক অভিনয় ব্যস্ততার কারণে পারিবারিক জীবনকে তিনি প্রায়ই রসিকতার ছলে ‘অগোছালো’ বলে উল্লেখ করতেন। তার চার সন্তান, নাতি-নাতনি এবং বিস্তৃত পরিবার রয়েছে।
স্যাম নিলের মৃত্যুতে বিশ্ব চলচ্চিত্র অঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। অভিনয়, মানবিকতা, পরিবেশ সচেতনতা এবং বহুমাত্রিক জীবনদর্শনের জন্য তিনি শুধু একজন সফল অভিনেতা হিসেবেই নন, বরং এক অনন্য ব্যক্তিত্ব হিসেবেও স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।








