নিরাপত্তাহীনতায় সংকটে স্বাস্থ্যখাত, আতঙ্কিত স্বাস্থ্যকর্মীরা

দেশের স্বাস্থ্যখাতে একের পর এক হামলা, হুমকি ও ভয়ভীতির ঘটনায় চিকিৎসক, কর্মকর্তা এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে চরম উদ্বেগ ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। রাজধানী থেকে জেলা-উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতাল পর্যন্ত নানা সহিংস ঘটনার কারণে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বিজ্ঞাপন
সম্প্রতি বিভিন্ন হাসপাতালে রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ভাঙচুর, চিকিৎসকদের ওপর হামলা, অস্ত্রের মুখে ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং স্বাস্থ্য প্রশাসনের কর্মকর্তাদের প্রাণনাশের হুমকির ঘটনায় চিকিৎসক সমাজের মধ্যে আতঙ্ক আরও বেড়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা যদি সারাক্ষণ হামলা বা অপমানের আশঙ্কায় থাকেন, তাহলে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে। বিশেষ করে জেলা ও উপজেলা হাসপাতালগুলোতে নিরাপত্তাহীনতা বাড়তে থাকলে পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থাই বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে।
আরও পড়ুন: দুই মাসে হামে প্রাণ গেলো ৪৫১ জনের
বিজ্ঞাপন
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বলেন, চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে দেশের স্বাস্থ্যখাতের উন্নয়ন সম্ভব নয়। তার মতে, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে রোগী, চিকিৎসক এবং প্রশাসনের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কার্যকর আইন জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে চিকিৎসকদের সুরক্ষা এবং চিকিৎসা অবহেলার অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য এখনও কোনো পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর আইন নেই। বর্তমানে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, বিএমডিসি আইন ও দণ্ডবিধির কিছু সাধারণ ধারার মাধ্যমে এসব অভিযোগ মোকাবিলার চেষ্টা করা হয়। তবে এসব আইনে চিকিৎসক ও রোগী—উভয় পক্ষের অধিকার ও সুরক্ষার বিষয়টি স্পষ্ট নয়।
জানা গেছে, ‘স্বাস্থ্যসেবা ও সুরক্ষা আইন’ নামে একটি আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কয়েক দফা খসড়া তৈরি ও সংশোধন করা হলেও শেষ পর্যন্ত সেটি কার্যকর হয়নি।
বিজ্ঞাপন
সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) ডা. জাহিদ রায়হান-কে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে চিঠি পাঠানোর ঘটনা প্রশাসনের ভেতরেও উদ্বেগ তৈরি করেছে। রাজধানীর মহাখালী এলাকায় হাসপাতালকেন্দ্রিক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের পর তার কার্যালয়ে ওই হুমকিপত্র পৌঁছায় বলে জানা গেছে।
শনিবার রাজধানীর জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান-এ (পঙ্গু হাসপাতাল) সহকারী পরিচালকের কক্ষে ঢুকে অস্ত্র প্রদর্শন করে ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় কয়েকজন যুবকের বিরুদ্ধে।
বিজ্ঞাপন
হাসপাতাল সূত্র জানায়, আউটসোর্সিং নিয়োগে নিজেদের লোক নেওয়ার চাপ সৃষ্টি করতেই তারা এ ঘটনা ঘটায়। সহকারী পরিচালক ডা. রাশেদ-এর কক্ষে ঢুকে আগ্নেয়াস্ত্র দেখিয়ে হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ঘটনায় হাসপাতালজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। শেরেবাংলা নগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মনিরুল ইসলাম জানান, ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে এবং বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে।
অন্যদিকে শুক্রবার গভীর রাতে শরীয়তপুর সদর হাসপাতাল-এ রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ হামলার ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত ১০ জন আহত হন। গুরুতর আহত চিকিৎসক নাসির ইসলাম-কে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
হাসপাতাল সূত্র জানায়, হৃদরোগে আক্রান্ত এক রোগীর মৃত্যু হলে চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ তুলে স্বজনরা জরুরি বিভাগে হামলা ও ভাঙচুর চালান। একপর্যায়ে দায়িত্বরত চিকিৎসককে ইট দিয়ে আঘাত করা হয়।
হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা মিতু আক্তার জানান, আহত চিকিৎসককে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে এবং ঘটনাটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
এর আগে গত ২০ এপ্রিল রাজধানীর জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল-এর উপপরিচালক ডা. আহমদ হোসেন-এর ওপর হামলার ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
র্যাবের তথ্য অনুযায়ী, হাসপাতালের ঠিকাদারি কাজ নিয়ে বিরোধের জেরে ভাড়াটে সন্ত্রাসীদের মাধ্যমে তার ওপর হামলা চালানো হয়। পরে এ ঘটনায় মূল হামলাকারীসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, স্বাস্থ্যখাতে দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের কারণেই বিভিন্ন মহল হুমকি ও চাপ সৃষ্টি করছে। তার দাবি, সাম্প্রতিক অনেক ঘটনার পেছনে টেন্ডার ও আউটসোর্সিং বাণিজ্য জড়িত।
বিজ্ঞাপন
মন্ত্রী জানান, আউটসোর্সিং পদ্ধতি বাতিলের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি দেশের হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা জোরদারে সিভিল ড্রেসে র্যাব মোতায়েনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুত কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়ন না হলে চিকিৎসক সমাজের আস্থা আরও কমে যাবে এবং এর প্রভাব পড়বে সামগ্রিক স্বাস্থ্যসেবায়।








