Logo

এবার পুকুরের মাছেও মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
২২ অক্টোবর, ২০২৬, ২০:৫২
এবার পুকুরের মাছেও মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত
ছবি : জনবাণী গ্রাফিক্স

বাংলাদেশের মিঠাপানির মাছ চাষের পুকুরের তলদেশের পলি ও মাছের নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন গবেষকেরা। ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলায় ২৫টি পুকুরের ওপর পরিচালিত গবেষণায় প্রতিটি পুকুরের পলির নমুনায় এই ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। মাছের শরীরেও মিলেছে মাইক্রোপ্লাস্টিক, যা পরিবেশ, মৎস্যসম্পদ ও জনস্বাস্থ্য নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

বিজ্ঞাপন

গবেষণায় দেখা গেছে, অধিকাংশ পুকুরের তলদেশের পলিতে মাঝারি থেকে উচ্চ মাত্রার দূষণ রয়েছে। এর আগে বাংলাদেশের নদী, সমুদ্র ও ইলিশ মাছের নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেলেও চাষের পুকুরের পলি ও মাছ নিয়ে এ ধরনের সমন্বিত গবেষণা এবারই প্রথম বলে দাবি করেছেন গবেষকেরা।

গবেষণাটির শিরোনাম ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক ইন ফ্রেশওয়াটার অ্যাকুয়াকালচার: এভিডেন্স অব সেডিমেন্ট–ফিশ ট্রান্সফার অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটেড ইকোলজিক্যাল রিস্ক ইন বাংলাদেশ’। চলতি মাসে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী এনভায়রনমেন্টাল পলিউশন-এ এটি প্রকাশিত হয়েছে।

২৫টি পুকুরের পলিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক

বিজ্ঞাপন

মিঠাপানির মাছ চাষের অন্যতম প্রধান অঞ্চল ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলায় শীতকালে ২৫টি মাছের খামার থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়। গবেষণায় নেতৃত্ব দেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টের অধ্যাপক বদিউজ্জামান খান।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, মিঠাপানির চাষের মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি নিয়ে এ ধরনের গবেষণা এই প্রথম। এটি দেশের মৎস্যসম্পদের সম্ভাব্য ক্ষতি নিরূপণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

অধ্যাপক বদিউজ্জামান জানান, পুকুরের তলদেশের পলি ও মাছের মধ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি ও বৈশিষ্ট্য নির্ণয় করাই ছিল গবেষণার মূল উদ্দেশ্য। পাশাপাশি মাছের শারীরিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণের সম্পর্ক, প্লাস্টিকের রাসায়নিক গঠন এবং পরিবেশগত ঝুঁকিও মূল্যায়ন করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সাধারণত পাঁচ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিক কণাকে মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়। প্লাস্টিকের ব্যাগ, মোড়ক, দড়ি, মাছ ধরার জাল ও অন্যান্য বর্জ্য ভেঙে এসব ক্ষুদ্র কণা তৈরি হয়। পরে তা পরিবেশের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে।

গবেষণায় ত্রিশালের ২৫টি পুকুরের তলদেশের পলিতে প্রতি কেজিতে গড়ে ১১ দশমিক ০৪টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। পলিউশন লোড ইনডেক্স বা দূষণভার সূচকের মান ছিল ১ থেকে ৪ দশমিক ৫-এর মধ্যে। এই সূচকের ভিত্তিতে অধিকাংশ স্থানকে মাঝারি থেকে উচ্চ দূষণযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

গবেষকদের মতে, প্রবহমান নদীর তুলনায় পুকুরে পানির বিনিময় সীমিত। ফলে তলদেশে মাইক্রোপ্লাস্টিক দীর্ঘ সময় জমে থাকতে পারে। এতে তলদেশে খাবার খোঁজা মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর এসব কণা গ্রহণের ঝুঁকি বাড়ে। তবে মাছের প্রজাতি, খাদ্যাভ্যাস ও পুকুরের পরিবেশের ওপর নির্ভর করে কণা গ্রহণের মাত্রা ভিন্ন হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

ছয় প্রজাতির ১৫০টি মাছ পরীক্ষা

গবেষকেরা ছয় প্রজাতির মোট ১৫০টি মাছ পরীক্ষা করে ৯০টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা শনাক্ত করেছেন। প্রতিটি মাছের ক্ষেত্রে গড়ে শূন্য দশমিক ৬০টি কণা পাওয়া গেছে।

প্রজাতিভেদে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতিতে পার্থক্য দেখা গেছে। সরপুঁটি মাছে প্রতি মাছের বিপরীতে গড়ে ১ দশমিক ২০টি কণা পাওয়া গেছে। রুই ও মৃগেলের ক্ষেত্রে এই গড় ছিল শূন্য দশমিক ৬৮। অন্যদিকে কাতলা, কমন কার্প ও পাঙাশ মাছে তুলনামূলক কম কণা শনাক্ত হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

মাছের বসবাসের স্তর অনুযায়ীও কণার উপস্থিতিতে পার্থক্য দেখা যায়। তলদেশে বসবাসকারী মাছের মধ্যে মোট শনাক্ত কণার ৫২ শতাংশ পাওয়া গেছে। মধ্যবর্তী স্তরের মাছের ক্ষেত্রে এই হার ৩৫ শতাংশ এবং পানির উপরিভাগে বসবাসকারী মাছের ক্ষেত্রে ১৩ শতাংশ।

অধ্যাপক বদিউজ্জামান খান বলেন, “মাছকে প্রচুর ফিড খাওয়ানো হয়। সব ফিড যে খারাপ, তা বলছি না। তবে কিছু ফিডে এসব থাকে। অনেক সময় বন্যার পানিতে অন্য স্থানের মাইক্রোপ্লাস্টিক পুকুরে চলে আসে। মাছের পরিপাকতন্ত্রে আমরা মূলত এর উপস্থিতি দেখেছি।”

মাইক্রোপ্লাস্টিকের সম্ভাব্য উৎস কী?

বিজ্ঞাপন

গবেষণায় প্রধানত পলিথিন (পিই) ও পলিপ্রপিলিন (পিপি) পলিমার শনাক্ত হয়েছে। পলিথিন সাধারণত প্লাস্টিকের ব্যাগ ও প্যাকেজিংয়ে ব্যবহৃত হয়। পলিপ্রপিলিন ব্যবহৃত হয় বিভিন্ন পাত্র, দড়ি ও প্লাস্টিক পণ্য তৈরিতে।

গবেষকদের ধারণা, মাছের খাদ্য, খাদ্য বহনের বস্তা, মোড়ক, মাছ ধরার সরঞ্জাম, পানির পাইপ এবং গৃহস্থালি বর্জ্য থেকে এসব কণা পুকুরে প্রবেশ করতে পারে। তবে নির্দিষ্ট উৎস নিশ্চিত করতে আরও পৃথকভাবে নমুনা সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

ত্রিশাল উপজেলায় প্রায় ২২ হাজার পুকুরে মাছ চাষ হয়। বছরে সেখানে মাছ উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় ৭২ হাজার মেট্রিক টন। ফলে পুকুরে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি এ অঞ্চলের মৎস্য উৎপাদন ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

বিজ্ঞাপন

জ্যেষ্ঠ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা শাহানা নাজনীন জানান, পুকুরের পাড়ে পোলট্রি খামার থাকার কারণেও দূষণ ঘটতে পারে। তিনি বলেন, “মাছের পুকুরের পাড়ে পোলট্রির জন্য মাছ চাষে দূষণের ঘটনা ঘটতে পারে। এ নিয়ে আমরা ইতিমধ্যে অভিযান শুরু করেছি। ইতিমধ্যে একটি পুকুরের পাশ থেকে মুরগির খামার তুলে দেওয়া হয়েছে।”

মাছ থেকে মানুষের শরীরে পৌঁছানোর আশঙ্কা

গবেষকদের মতে, প্লাস্টিক বর্জ্যের যথাযথ ব্যবস্থাপনা না থাকায় মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন পরিবেশের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়েছে। মাছের পরিপাকতন্ত্রে এসব কণার উপস্থিতি পাওয়ায় খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে মানুষের শরীরেও এগুলো প্রবেশ করতে পারে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

তাঁদের ভাষ্য, “মানুষের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি আমরা দেখেছি। মাছ থেকে তাই এটি মানুষের শরীরে পৌঁছাবে না, এর কোনো নিশ্চয়তা নেই।”

গবেষকদের বক্তব্য অনুযায়ী, পলিথিনের মতো প্লাস্টিক পলিমার রান্নার তাপে সহজে সম্পূর্ণ নষ্ট হয় না। তবে মাছ খাওয়ার মাধ্যমে মাইক্রোপ্লাস্টিক মানুষের শরীরে প্রবেশের মাত্রা এবং যকৃত ও কিডনির ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব নির্দিষ্টভাবে নিরূপণ করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

এই গবেষণায় পুকুরের পলি ও মাছের মধ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া গেলেও এর সম্ভাব্য উৎস, দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত প্রভাব এবং মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর প্রকৃত ঝুঁকি নির্ধারণে আরও বিস্তৃত অনুসন্ধান জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD