Logo

কিশোর-কিশোরীর মধ্যে যৌনসম্পর্ক আর ধর্ষণ নয়! নতুন আইন পাশ

profile picture
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
২৪ মে, ২০২৬, ২০:০৯
কিশোর-কিশোরীর মধ্যে যৌনসম্পর্ক আর ধর্ষণ নয়! নতুন আইন পাশ
প্রতীকী ছবি।

কিশোর-কিশোরীদের পারস্পরিক সম্মতিতে গড়ে ওঠা যৌনসম্পর্ককে আর ধর্ষণ হিসেবে গণ্য না করার উদ্যোগ নিয়েছে নেপাল সরকার। দেশটির সরকার ১৮ বছরের কম বয়সী কিশোর-কিশোরীদের সম্মতিসূচক শারীরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শাস্তি কমানো বা নির্দিষ্ট ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে এগোচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহের সরকার এ নিয়ে নতুন আইনি কাঠামো তৈরির কাজ করছে।

বিজ্ঞাপন

নেপাল সরকার মনে করছে, সমবয়সী কিশোর-কিশোরীদের পারস্পরিক সম্মতিতে গড়ে ওঠা সম্পর্ককে ধর্ষণ বা শোষণের ঘটনার সঙ্গে এক কাতারে ফেলা ঠিক নয়। তাই বিদ্যমান আইনের পরিবর্তন এনে বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নতুন বিধান যুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

বর্তমানে নেপালের আইন অনুযায়ী, ১৮ বছরের কম বয়সী কোনও ছেলে বা মেয়ের মধ্যে যে কোনও ধরনের যৌনসম্পর্ককে ‘ধর্ষণ’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সেখানে দুই পক্ষের সম্মতি থাকলেও সেটিকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হয় না। অর্থাৎ পারস্পরিক ইচ্ছা থাকুক বা না থাকুক, শারীরিক সম্পর্ককে একইভাবে অপরাধ হিসেবে দেখা হয়।

বিজ্ঞাপন

বিশেষ করে ১৬ থেকে ১৮ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে এই আইনটি দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। কারণ নেপালে ১৮ বছর বয়সে একজনকে সাবালক হিসেবে ধরা হলেও বৈধ বিয়ের ন্যূনতম বয়স ২০ বছর। এতে আইনি জটিলতা ও অসঙ্গতি তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞ, মানবাধিকারকর্মী এবং তরুণ সমাজের একটি অংশ বহুদিন ধরে এ আইন পরিবর্তনের দাবি জানিয়ে আসছে।

সমালোচকদের মতে, বর্তমান আইন নাবালকদের সুরক্ষা দেওয়ার বদলে অনেক ক্ষেত্রে পারস্পরিক সম্মতিতে গড়ে ওঠা সম্পর্ককে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করছে। ফলে কেবল প্রেমের সম্পর্কে জড়ানোর কারণে বহু কিশোর ও তরুণকে দীর্ঘ সময় কারাভোগ করতে হচ্ছে।

এমন বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে নেপাল সরকার বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে দেখা শুরু করেছে। সরকারি টাস্কফোর্স ও আইন বিশেষজ্ঞরা বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে নতুন ফৌজদারি আইনে একটি বিশেষ ধারা যুক্ত করার সুপারিশ করেছেন। হিমালয়ঘেঁষা দেশটি এখন সেই সংশোধনী কার্যকরের পথে এগোচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

নেপালের আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে গঠিত একটি টাস্কফোর্স সুপ্রিম কোর্ট এবং বিভিন্ন আইন বিশেষজ্ঞের মতামতের ভিত্তিতে সংশোধনীর খসড়া তৈরি করেছে। বর্তমানে প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভায় পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে। একই সঙ্গে বিয়ের বৈধ বয়স ২০ থেকে কমিয়ে ১৮ করার বিষয়েও সংসদে আলোচনা চলছে।

খসড়া অনুযায়ী, যদি সম্পর্কে জড়িত দুইজনের বয়সই ১৬ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে হয় এবং তাদের বয়সের ব্যবধান নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থাকে, তাহলে সেই সম্পর্ককে আইনি স্বীকৃতি দেওয়া হবে। এ ধরনের সম্পর্ককে আর ‘ধর্ষণ’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে না। প্রস্তাবিত এই ধারার নাম রাখা হয়েছে ‘রোমিও-জুলিয়েট ধারা’।

তবে এই আইনি ছাড়কে সব ধরনের শারীরিক সম্পর্কের অনুমোদন হিসেবে দেখা যাবে না। প্রস্তাবে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, কোনও সম্পর্কের মধ্যে জোরজবরদস্তি, ব্ল্যাকমেইল, ক্ষমতার অপব্যবহার বা অর্থনৈতিক শোষণ থাকলে সেটি অপরাধ হিসেবেই গণ্য হবে। শুধুমাত্র সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় গড়ে ওঠা সম্পর্কের ক্ষেত্রেই এই আইনি সুবিধা প্রযোজ্য হবে।

বিজ্ঞাপন

নেপালে প্রায়ই দেখা যায়, কোনও অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে নিজের ইচ্ছায় সম্পর্কে জড়ালে বা প্রেম করে পালিয়ে বিয়ে করলে পরিবার তা মেনে নিতে চায় না। সামাজিক মর্যাদা কিংবা প্রতিশোধের কারণে মেয়ের পরিবার ছেলেটির বিরুদ্ধে সরাসরি ধর্ষণের মামলা করে। বর্তমান আইন অনুযায়ী ১৮ বছরের নিচে সম্মতির কোনও বৈধতা না থাকায় পারস্পরিক ইচ্ছায় সম্পর্ক হলেও ছেলেটিকে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

বিশেষ করে আন্তঃবর্ণ বা ভিন্ন জাতিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা বেশি বলে জানিয়েছে সরকারি টাস্কফোর্স। তদন্তে উঠে এসেছে, পরিবারের সদস্যরা অনেক সময় সম্মতিসূচক সম্পর্ককে কেন্দ্র করে কিশোর ছেলেদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করতে ধর্ষণ আইনের অপব্যবহার করেন। কারণ নেপালে এখনও আন্তঃবর্ণ প্রেম বা বিয়েকে অনেক পরিবার সহজভাবে নেয় না।

বিজ্ঞাপন

জাতিসংঘের শিশু অধিকার কমিটির আন্তর্জাতিক নির্দেশিকা অনুযায়ী, এই ধরনের সুরক্ষা কেবল তখনই প্রযোজ্য হবে যখন সম্পর্কের দুইজনই কিশোর-কিশোরী হবে। এই নীতির উদ্দেশ্য হচ্ছে, কোনওভাবেই যেন আইন শোষণের হাতিয়ার হয়ে না ওঠে।

অন্যদিকে, কোনও প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি যদি নাবালক বা নাবালিকার সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান, তাহলে সেটি আগের মতোই ‘বিধিবদ্ধ ধর্ষণ’ বা ‘নাবালক নিপীড়ন’ হিসেবে গণ্য হবে। কারণ একজন প্রাপ্তবয়স্কের মানসিক ও সামাজিক অবস্থান একজন কিশোর বা কিশোরীর তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী, যা ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট করে।

সহজভাবে বলতে গেলে, জাতিসংঘের নির্দেশিকায় কিশোর-কিশোরীদের পারস্পরিক সম্মতিকে নির্দিষ্ট শর্তে আইনি গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে প্রাপ্তবয়স্ক ও অপ্রাপ্তবয়স্কদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে সম্মতির কোনও আইনি বৈধতা থাকবে না। নেপাল সরকারও আন্তর্জাতিক এই মানদণ্ড অনুসরণ করেই নতুন আইনের খসড়া তৈরি করছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এদিকে সরকার স্পষ্ট জানিয়েছে, কোনও প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি যদি নাবালকের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান, তাহলে তার বিরুদ্ধে আগের মতোই কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সেখানে সম্মতির অজুহাত গ্রহণযোগ্য হবে না। একইভাবে সমবয়সী কিশোর-কিশোরীদের মধ্যেও যদি জোরপূর্বক শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের অভিযোগ ওঠে, তাহলে আইন কঠোরভাবেই কার্যকর হবে এবং সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD