চিকেনস নেকে কড়া নজর দিল্লির, কৌশলগত অঞ্চলে গড়ার পরিকল্পনা

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত শিলিগুড়ি করিডর বা “চিকেনস নেক”কে ঘিরে নতুন করে সক্রিয়তা বাড়িয়েছে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার। প্রশাসনিক ও গোয়েন্দা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার, সামরিক প্রস্তুতি শক্তিশালী করা এবং একই সঙ্গে অর্থনৈতিক উন্নয়নকে সামনে রেখে উত্তরবঙ্গকে একটি বিশেষ কৌশলগত অঞ্চল হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
এই উদ্যোগ ঘিরে রাজনৈতিক মহল থেকে সাধারণ মানুষের মধ্যেও ব্যাপক আলোচনা ও কৌতূহল তৈরি হয়েছে। চিকেনস নেক নামে পরিচিত এই সরু ভূখণ্ড ভারতের মূল ভূখণ্ডকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এক পাশে বাংলাদেশ, অন্য পাশে নেপাল ও ভুটান—এই তিন দেশের সীমান্তঘেরা অঞ্চলটি দীর্ঘদিন ধরেই ভারতের নিরাপত্তা নীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত। বিশেষ করে চীনের সীমান্তঘেঁষা তিব্বতের চুম্বি উপত্যকার নিকটবর্তী অবস্থানের কারণে এর কৌশলগত গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
সম্প্রতি উত্তর দিনাজপুরের চোপড়া, আসামের ধুবড়ি এবং বিহারের কিষানগঞ্জ এলাকায় নতুন সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের খবর সামনে এসেছে। পাশাপাশি উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা নিয়ে সেনাবাহিনীর বিশেষ ইউনিটকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে বলেও জানা গেছে। একই সঙ্গে উত্তরবঙ্গের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের নিয়ন্ত্রণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব কেন্দ্রীয় সড়ক কর্তৃপক্ষের অধীনে আনা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
প্রশাসনিক সূত্রের দাবি, এসব পদক্ষেপ শুধু সামরিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার জন্য নয়। বরং উত্তরবঙ্গকে অর্থনৈতিক ও যোগাযোগের কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে তুলতে চাইছে দিল্লি। শিলিগুড়িকে কেন্দ্র করে পাহাড় ও সমতল অঞ্চলকে যুক্ত করে একটি বৃহৎ কৌশলগত অঞ্চল তৈরির পরিকল্পনা চলছে বলে জানা গেছে।
এই পরিকল্পনার আওতায় সীমান্তবর্তী সড়কগুলোকে চার লেনে উন্নিত করা, বিকল্প পাহাড়ি রাস্তা তৈরি, বিমানবন্দর ও রেল অবকাঠামোর আধুনিকীকরণ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে বাণিজ্য আরও বাড়বে। শিলিগুড়ি হয়ে উঠতে পারে বড় ধরনের পণ্য পরিবহণ ও গুদামজাত কেন্দ্র। গোয়েন্দা মহলের একাংশ মনে করছে, শুধুমাত্র সামরিক শক্তি দিয়ে চিকেনস নেকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। স্থানীয় মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং অবকাঠামোগত পরিবর্তনও জরুরি। কারণ দীর্ঘদিন ধরে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় বঞ্চনা, অনুন্নয়ন এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার অভিযোগ রয়েছে। সেই পরিস্থিতি বদলাতেই উন্নয়ন ও নিরাপত্তাকে একসঙ্গে সামনে আনছে কেন্দ্র। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে উত্তরবঙ্গে চিকিৎসা, শিক্ষা ও শিল্প খাতেও বড় বিনিয়োগের প্রস্তুতি চলছে বলে জানা গেছে। নতুন শিল্পনগরী, উন্নত হাসপাতাল, প্রযুক্তি কেন্দ্র এবং পর্যটন শিল্প গড়ে তোলার কথাও ভাবা হচ্ছে। এতে বিপুল কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর কেন্দ্রের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথ আরও সহজ হয়েছে। আগে রাজ্য ও কেন্দ্রের সম্পর্কের টানাপোড়েনের কারণে বহু প্রকল্প আটকে ছিল বলে দাবি করা হচ্ছে। এখন সেই বাধা অনেকটাই কমেছে।
তবে এই উদ্যোগ নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে। বিরোধীদের একাংশের অভিযোগ, নিরাপত্তার নামে উত্তরবঙ্গকে অতিরিক্ত সামরিকীকরণের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, যা স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রা ও পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিজ্ঞাপন
এরপরও কেন্দ্রীয় সরকারের অবস্থান স্পষ্ট—নিরাপত্তা, উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে একসঙ্গে যুক্ত করে উত্তরবঙ্গকে ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অঞ্চলে পরিণত করাই লক্ষ্য। ফলে আগামী দিনে চিকেনস নেক শুধু সীমান্ত নয়, ভারতের অর্থনীতি ও নিরাপত্তা রাজনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন








