Logo

ইরানের কাছে বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণ চান ডোনাল্ড ট্রাম্প

profile picture
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১১ আগস্ট, ২০২৬, ১২:৩৭
ইরানের কাছে বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণ চান ডোনাল্ড ট্রাম্প
ছবি: সংগৃহীত

ইরানের কাছে বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত পাঁচ দশকে ইরানের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের যে ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানি হয়েছে, তার জন্য তেহরানকে অর্থ পরিশোধ করতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

সোমবার (১০ আগস্ট) হোয়াইট হাউজে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প এ দাবি জানান। তার বক্তব্য এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার শর্ত হিসেবে ইরানের পক্ষ থেকেও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানানো হচ্ছে।

ফলে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথের নিয়ন্ত্রণ, ক্ষতিপূরণ এবং যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।

ক্ষতিপূরণ নিয়ে মুখোমুখি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান

বিজ্ঞাপন

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই নৌপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

ইরানের অবস্থান হলো, যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে এবং দেশটির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে। এসব শর্ত পূরণ না হলে হরমুজ প্রণালি পুনরায় পুরোপুরি খুলে দেওয়া হবে না বলে তেহরান জানিয়েছে।

গত জুনে স্বাক্ষরিত একটি অন্তর্বর্তী শান্তিচুক্তির কিছু শর্তের সঙ্গেও ইরানের এই অবস্থানের মিল ছিল। তবে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মতবিরোধের কারণে শেষ পর্যন্ত ওই চুক্তি টেকেনি।

বিজ্ঞাপন

এদিকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার বিষয়টি নিয়ে ইরান ও ওমানের মধ্যে আলোচনা চলছে। এর মধ্যেই ট্রাম্পের পাল্টা ক্ষতিপূরণের দাবি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, ইরান যদি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করে, তাহলে গত ৫০ বছরে ইরানের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের যে ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য ওয়াশিংটনও তেহরানের কাছে অর্থ দাবি করবে।

ইরানে নিহতের সংখ্যা নিয়ে ভিন্ন দাবি

বিজ্ঞাপন

ইরানে সাম্প্রতিক সংঘাত ও বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা নিয়েও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পক্ষ থেকে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। ট্রাম্প দাবি করেছেন, গত চার মাসে ইরানে ৫২ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে মার্কিন সেনাসদস্যদের পাশাপাশি ইরানে নিহত বেসামরিক নাগরিকদের পরিবারের জন্যও ক্ষতিপূরণের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।

অন্যদিকে ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জানুয়ারিতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে প্রায় ৩ হাজার ১১৭ জন নিহত হয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি বা হরানা ফেব্রুয়ারিতে প্রায় ৭ হাজার মানুষের মৃত্যুর তথ্য প্রকাশ করেছিল। তাদের হিসাবে নিহতদের মধ্যে প্রায় ৬ হাজার ৫০০ জন বিক্ষোভকারী ছিলেন।

বিজ্ঞাপন

তবে নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের দাবির মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। ফলে প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা নিয়ে এখনো বিতর্ক রয়েছে।

ইউএসএস কোল হামলার প্রসঙ্গও তুললেন ট্রাম্প

ট্রাম্প ২০০০ সালের অক্টোবরে ইয়েমেনে মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজ ইউএসএস কোল-এ হামলার ঘটনাটিও ক্ষতিপূরণের আলোচনায় এনেছেন। ওই হামলায় ১৭ জন মার্কিন নাবিক নিহত হয়েছিলেন। তাদের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে ইরানের ওপর চাপ প্রয়োগের কথা বলেছেন ট্রাম্প।

বিজ্ঞাপন

তবে ওই হামলার জন্য আল-কায়েদাকে দায়ী করা হয়েছিল। হামলার ঘটনায় ইরানের সরাসরি সংশ্লিষ্টতার দাবি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

এর পাশাপাশি ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ইরানকে লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন ও গাজায় প্রাণহানি এবং ক্ষয়ক্ষতির জন্যও দায়ী করার কথা বলেছেন।

হরমুজে নতুন নৌপথ নিয়ে ইরান-ওমান আলোচনা

বিজ্ঞাপন

এদিকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করার বিষয়ে ওমানের সঙ্গে আলোচনায় অগ্রগতির কথা জানিয়েছে ইরান। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেই সোমবার জানান, ওমানের সঙ্গে আলোচনা সুশৃঙ্খল ও গঠনমূলকভাবে এগোচ্ছে। দুই পক্ষ সম্ভাব্য নতুন নৌপথের একটি মানচিত্র নিয়েও ঐকমত্যে পৌঁছেছে।

তবে নতুন নৌপথ চালু করতে কিছু কারিগরি বিষয় এখনো সমাধান করা প্রয়োজন বলে জানান তিনি। নিরাপদ নৌচলাচল, পরিবেশ সুরক্ষা, সামুদ্রিক সেবা এবং অপরাধ দমনসহ বিভিন্ন বিষয়ও আলোচনায় এসেছে।

ইরানের অভিযোগ, হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ড নৌপথটিকে অনিরাপদ করে তুলেছে। তেহরান হরমুজে মার্কিন নৌ অবরোধকে আগ্রাসন হিসেবে দেখছে।

বিজ্ঞাপন

৫৫ বাণিজ্যিক জাহাজের গতিপথ পরিবর্তনের দাবি

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে হরমুজে অবরোধ পুনর্বহালের পর মার্কিন বাহিনী ৫৫টি বাণিজ্যিক জাহাজের গতিপথ পরিবর্তন করেছে।

এ ছাড়া অন্তত দুটি জাহাজকে অকার্যকর করার দাবিও করেছে মার্কিন কর্তৃপক্ষ। সামুদ্রিক গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান উইন্ডওয়ার্ডের তথ্য অনুযায়ী, অবরোধের প্রভাবে ইরানের খার্গ দ্বীপ থেকে তেল রপ্তানি কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।

বিজ্ঞাপন

খার্গ দ্বীপ ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি কেন্দ্র হওয়ায় সেখান থেকে রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের জন্যও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

হরমুজের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ট্রাম্পের দাবি

হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন অবরোধকে ট্রাম্প ‘ইস্পাতের দেয়াল’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার দাবি, বর্তমানে প্রণালিটির নিয়ন্ত্রণ মার্কিন নৌবাহিনীর হাতে রয়েছে।

আরও পড়ুন

ট্রাম্প আরও দাবি করেছেন, মার্কিন সামরিক বাহিনী হরমুজ প্রণালিকে মাইনমুক্ত করেছে এবং নৌপথটি বর্তমানে উন্মুক্ত রয়েছে।

তবে সামুদ্রিক পরিবহন-সংক্রান্ত তথ্য ট্রাম্পের দাবির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সাম্প্রতিক সময়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

কমেছে হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল

মেরিনট্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী, গত শুক্রবার হরমুজ প্রণালি দিয়ে ১৫টি জাহাজ পার হয়েছিল। শনিবার সেই সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ১১টিতে। রোববার আরও কমে মাত্র ৬টি জাহাজ ওই নৌপথ ব্যবহার করে।

তথ্য অনুযায়ী, ১৭টি জাহাজ ইরান নির্ধারিত নৌপথ ব্যবহার করেছে। আরও ১০টি জাহাজ এমন একটি রুট দিয়ে চলাচল করেছে, যেটিকে নির্দিষ্ট কোনো নৌপথ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি।

এতে বোঝা যাচ্ছে, ট্রাম্পের পক্ষ থেকে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত থাকার দাবি করা হলেও বাস্তবে ওই নৌপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল এখনো স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরেনি।

বাড়ছে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা

হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল ও এলএনজি পরিবহন হওয়ায় নৌপথটির নিরাপত্তা নিয়ে যেকোনো অস্থিরতা সরাসরি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে।

একদিকে ইরান হরমুজ খুলে দেওয়ার আগে ক্ষতিপূরণ ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছে। অন্যদিকে ট্রাম্প উল্টো ইরানের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করছেন এবং হরমুজের ওপর মার্কিন নিয়ন্ত্রণের কথা বলছেন।

এর সঙ্গে নৌপথে জাহাজ চলাচল কমে যাওয়া এবং তেল রপ্তানিতে বাধা তৈরি হওয়ার তথ্য যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।

ইরান ও ওমানের মধ্যে নৌপথ নিয়ে আলোচনা চললেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণে হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত। এই সংকট কত দ্রুত সমাধান হবে, তার ওপর শুধু মধ্যপ্রাচ্যের সামুদ্রিক নিরাপত্তাই নয়, আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ ও বিশ্ববাজারের স্থিতিশীলতাও অনেকাংশে নির্ভর করছে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD