Logo

হরমুজ সংকটে কাতারের এলএনজি সরবরাহে ফের ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

profile picture
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১৮:৩৬
হরমুজ সংকটে কাতারের এলএনজি সরবরাহে ফের ঝুঁকিতে বাংলাদেশ
ছবি: সংগৃহীত

হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল সীমিত হয়ে পড়ায় বাংলাদেশের এলএনজি সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বাড়ছে। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহে ঘোষিত ‘ফোর্স মেজার’-এর মেয়াদ আবারও বাড়িয়েছে কাতারএনার্জি। এর ফলে বাংলাদেশসহ এশিয়া ও ইউরোপের কয়েকটি দেশে নির্ধারিত এলএনজি কার্গো সরবরাহ অক্টোবর পর্যন্ত বাতিল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

কাতারি সংবাদমাধ্যম দোহা নিউজ জানিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ইতালির মতো কয়েকটি দেশের এলএনজি সরবরাহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অস্বাভাবিক বা নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা পরিস্থিতির কারণে কোনো পক্ষকে নির্দিষ্ট দায় ও চুক্তিগত বাধ্যবাধকতা থেকে সাময়িক অব্যাহতি দেওয়ার ব্যবস্থাই ‘ফোর্স মেজার’ হিসেবে পরিচিত।

গত শুক্রবার ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের জন্য এলএনজি সরবরাহ বাতিলের মেয়াদ সেপ্টেম্বরের পরও বাড়িয়েছে কাতারএনার্জি। একই সময়ে পাকিস্তানি ক্রেতাদের জানানো হয়েছে, অক্টোবর পর্যন্ত তাদের জন্য নির্ধারিত কার্গো বাতিল থাকতে পারে। ইউরোপের ক্রেতারাও একই ধরনের নোটিশ পেতে শুরু করেছেন।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

ইতালির ক্ষেত্রেও সরবরাহ সংকটের চিত্র আরও স্পষ্ট হয়েছে। দেশটির প্রতিষ্ঠান এডিসন জানিয়েছে, কাতারএনার্জি তাদের নির্ধারিত অতিরিক্ত পাঁচটি এলএনজি কার্গো সরবরাহ করতে পারবে না। আদ্রিয়াটিক এলএনজি রিসিভিং টার্মিনালের জন্য নির্ধারিত এসব কার্গো বাতিল হওয়ায় ইতালিতে কাতারের সরবরাহ স্থগিত থাকার সময়সীমা ২০২৬ সালের নভেম্বরের শুরু পর্যন্ত গড়াতে পারে। এডিসনের হিসাবে, এখন পর্যন্ত বাতিল হওয়া কার্গোর সংখ্যা ২৯টি।

বিকল্প জ্বালানির দিকে ছুটছে ক্রেতারা

বিজ্ঞাপন

কাতারের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় এশিয়া ও ইউরোপের ক্রেতাদের বিকল্প উৎস খুঁজতে হচ্ছে। কেউ অন্য দেশ থেকে গ্যাস সংগ্রহের চেষ্টা করছে, কেউ বিকল্প জ্বালানিতে যাচ্ছে, আবার কেউ গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে।

হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক নৌ চলাচল কবে ফিরবে, তা নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। পশ্চিম এশিয়ার চলমান সংঘাতের কারণে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে এলএনজি পরিবহন প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। কাতার গত মার্চে প্রথমবারের মতো ফোর্স মেজার ঘোষণা করে। পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় এরপর নিয়মিতভাবে এর মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে।

কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির সেন্টার অন গ্লোবাল এনার্জি পলিসির বৈশ্বিক গবেষণা ফেলো অ্যান-সোফি করবেউ ইউরোনিউজকে বলেন, কোনো রাজনৈতিক সমাধান বা প্রধান অংশীদারদের মধ্যে সমঝোতা না হলে বর্তমান পরিস্থিতি আরও কিছুদিন চলতে পারে।

বিজ্ঞাপন

তার মতে, স্বাভাবিক রপ্তানি কার্যক্রম কবে পুরোপুরি শুরু করা যাবে, সে বিষয়ে কাতারএনার্জির কাছেও এখনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। এ কারণেই প্রতিষ্ঠানটি মাসে মাসে সরবরাহ বাতিলের মেয়াদ বাড়ানোর পথে যাচ্ছে।

কাতারের এলএনজি রপ্তানি ব্যাপকভাবে কমেছে

পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের প্রভাবে বৈশ্বিক এলএনজি বাজারেও বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। আইসিআইএসের তথ্য অনুযায়ী, সংঘাতের প্রথম ছয় মাসে কাতার মাত্র ১৮টি এলএনজি কার্গো রপ্তানি করেছে। আগের বছরের একই সময়ে দেশটি রপ্তানি করেছিল ৫০৯টি কার্গো।

বিজ্ঞাপন

ইউরোনিউজের হিসাবে, এলএনজি বিক্রি কমে যাওয়ায় কাতারের সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতি প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার।

কাতারের ঘাটতি আংশিকভাবে পূরণ করছে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মতো অন্যান্য রপ্তানিকারক দেশ। একই সময়ে নাইজেরিয়া ও মালয়েশিয়াতেও এলএনজি উৎপাদন কিছুটা বেড়েছে। তবে এসব বিকল্প উৎস দিয়ে কাতারের সরবরাহ ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।

এশিয়ার কিছু দেশ গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে বা বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বাড়িয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে। ইউরোপের কিছু দেশও স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে গ্যাস কেনার পরিবর্তে মজুত করা গ্যাস ব্যবহার করছে।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশ বেশি ঝুঁকিতে

গবেষক অ্যান-সোফি করবেউয়ের মতে, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে দীর্ঘ সময় এলএনজি সরবরাহ ব্যাহত হলে ২০২৬ সালে বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যে বড় ধরনের ধাক্কা আসতে পারে।

তার বিশ্লেষণে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ঝুঁকি একরকম নয়। পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও ভারতকে তিনি তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বাজার হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে জাপানের ঝুঁকি তুলনামূলক কম। কারণ দেশটি কাতার থেকে কম পরিমাণ এলএনজি আমদানি করে এবং তাদের দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তির বড় অংশ তেল বা যুক্তরাষ্ট্রের গ্যাসের দামের সঙ্গে সংযুক্ত।

বিজ্ঞাপন

করবেউয়ের আশঙ্কা, এলএনজি সরবরাহ পরিস্থিতি আগের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে ২০২৮ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

ইরানে যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট এলএনজি বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো। বর্তমানে এই জলপথে কিছু তেলবাহী ট্যাঙ্কার চলাচল করলেও এলএনজিবাহী জাহাজের চলাচল অনেক বেশি সীমিত।

এর অন্যতম কারণ, এলএনজি পরিবহনে ব্যবহৃত জাহাজগুলো অত্যন্ত বিশেষায়িত। ফলে দ্রুত বিকল্প জাহাজ পাওয়া কঠিন। চলমান সংঘাতের মধ্যে এসব জাহাজের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে।

কাতারএনার্জির প্রেসিডেন্ট, প্রধান নির্বাহী ও কাতার সরকারের জ্বালানিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী সায়াদ শেরিদা আল-কাবি জানিয়েছেন, রাস লাফানে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে কাতারের এলএনজি রপ্তানি সক্ষমতা অন্তত ১৭ শতাংশ কমে গেছে।

বিজ্ঞাপন

ফলে কাতারের সরবরাহ সংকট যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, ততই আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর বিকল্প জ্বালানি সংগ্রহ ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনার চাপ বাড়ছে। বাংলাদেশের মতো কাতারি এলএনজির ওপর নির্ভরশীল দেশের জন্য পরিস্থিতি তাই ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

তথ্য সূত্র: দোহা নিউজ, ইউরো নিউজ

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD