Logo

দুই শীর্ষ জেনারেল বহিষ্কার, চীনের সামরিক নেতৃত্বে বড় পরিবর্তন

profile picture
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১৭:২০
দুই শীর্ষ জেনারেল বহিষ্কার, চীনের সামরিক নেতৃত্বে বড় পরিবর্তন
ছবি: সংগৃহীত

চীনের সামরিক বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ে ধারাবাহিক শুদ্ধি অভিযানে নেতৃত্ব কাঠামো ও যুদ্ধ প্রস্তুতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। একের পর এক অভিজ্ঞ কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেওয়ায় স্বল্পমেয়াদে কমান্ড ও সামরিক অভিযান পরিচালনায় প্রভাব পড়তে পারে বলে কয়েকজন কূটনীতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক মনে করছেন। একই সময়ে এই অভিযান প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করছে বলেও বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

বিজ্ঞাপন

সেপ্টেম্বরে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি দুই শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা জেনারেল ঝাং ইউশিয়া ও জেনারেল লিউ ঝেনলিকে দল ও সামরিক বাহিনী থেকে বহিষ্কার করে। তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, রাজনৈতিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ, ক্ষমতার অপব্যবহার ও দলীয় নেতৃত্বের প্রতি অবিশ্বস্ততার মতো অভিযোগ আনা হয়েছে। তদন্ত শেষে দুজনের মামলাই সামরিক প্রসিকিউটরদের কাছে পাঠানো হয়েছে।

ঝাং ইউশিয়া ছিলেন কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনের (সিএমসি) ভাইস চেয়ারম্যান এবং প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের পর সামরিক কমান্ড কাঠামোর অন্যতম ক্ষমতাধর কর্মকর্তা। লিউ ঝেনলি ছিলেন সিএমসির জয়েন্ট স্টাফ বিভাগের প্রধান। দুজনকেই চলতি বছরের জানুয়ারিতে তদন্তের আওতায় আনা হয়েছিল এবং আগস্টের শেষ দিকে সিএমসি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।

শীর্ষ কমান্ডে শূন্যতা

বিজ্ঞাপন

রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ধারাবাহিক অপসারণের পর সাত সদস্যের কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনে এখন পাঁচটি পদ খালি রয়েছে। দ্বিতীয় সারির বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে এলেও তাদের শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতা তুলনামূলক কম। ফলে বড় ও জটিল সামরিক অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সমন্বয় এবং কমান্ড কাঠামোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

তবে এসব পরিবর্তনকে চীনের সামরিক সক্ষমতা হঠাৎ কমে যাওয়ার প্রমাণ হিসেবে দেখা যাচ্ছে না। বরং বিশ্লেষণের মূল প্রশ্ন হলো, নেতৃত্বের দ্রুত পরিবর্তন স্বল্পমেয়াদে পিএলএর অপারেশনাল প্রস্তুতি ও কমান্ড ব্যবস্থায় কী ধরনের প্রভাব ফেলে।

দুর্নীতিবিরোধী অভিযান নাকি নিয়ন্ত্রণ জোরদার?

বিজ্ঞাপন

চীনা কর্তৃপক্ষ ঝাং ও লিউয়ের বিরুদ্ধে দুর্নীতি এবং দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ সামনে এনেছে। সরকারি বিবৃতিতে তাদের বিরুদ্ধে অন্যদের পদোন্নতিতে সহায়তার বিনিময়ে অর্থ ও উপহার নেওয়া, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও পরিবারের সদস্যদের যথাযথভাবে তদারকি না করার অভিযোগও রয়েছে।

তবে রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা বিশ্লেষকদের মতে, এবারের পদক্ষেপের রাজনৈতিক দিকও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ঝাংয়ের বিরুদ্ধে দুর্নীতির পাশাপাশি দলীয় নেতৃত্বের প্রতি অবিশ্বস্ততা এবং গোষ্ঠী বা উপদল তৈরির অভিযোগকে তারা আলাদা গুরুত্ব দিচ্ছেন। এসব অভিযোগকে চীনা সামরিক বাহিনীর ওপর শি জিনপিংয়ের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবেও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।

শি জিনপিং ২০১২ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে চীনের সামরিক বাহিনীতে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান জোরদার করেছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বহু উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা তদন্ত, অপসারণ ও বহিষ্কারের মুখে পড়েছেন।

বিজ্ঞাপন

যুদ্ধ প্রস্তুতিতে কী প্রভাব?

সামরিক নেতৃত্বে অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের সরিয়ে নতুনদের দায়িত্ব দেওয়ার ফলে স্বল্পমেয়াদে কমান্ড ও সমন্বয় ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হতে পারে বলে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন। বড় সামরিক অভিযান পরিচালনায় দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, পারস্পরিক সমন্বয় এবং স্থিতিশীল কমান্ড কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় নেতৃত্বের পরিবর্তন সেসব ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে এর অর্থ চীন বড় ধরনের সামরিক অভিযান পরিচালনায় অক্ষম হয়ে পড়েছে—এমন কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো তথ্য এখনো নেই। বরং দীর্ঘমেয়াদে নতুন কর্মকর্তাদের মাধ্যমে কমান্ড কাঠামো পুনর্গঠন হলে শি জিনপিংয়ের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ আরও সুসংহত হতে পারে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।

বিজ্ঞাপন

তাইওয়ান ঘিরে নজর

চীনের সামরিক নেতৃত্বে এই পরিবর্তন এমন সময়ে ঘটছে, যখন তাইওয়ান ও দক্ষিণ-পূর্ব চীন সাগরসহ বিভিন্ন অঞ্চলে বেইজিংয়ের সামরিক তৎপরতা আন্তর্জাতিকভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। তাইওয়ানকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে চীন, আর তাইওয়ান নিজস্ব সরকার ও সামরিক বাহিনীর মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।

ফলে চীনের শীর্ষ সামরিক নেতৃত্বে বড় ধরনের রদবদল ভবিষ্যতে তাইওয়ানসংক্রান্ত সামরিক পরিকল্পনা, মহড়া বা কমান্ড প্রস্তুতিতে কোনো প্রভাব ফেলে কি না, তা আঞ্চলিক নিরাপত্তা পর্যবেক্ষকদের নজরে রয়েছে। তবে বর্তমান নেতৃত্ব পরিবর্তনের ভিত্তিতে চীনের ভবিষ্যৎ সামরিক পদক্ষেপ সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না।

বিজ্ঞাপন

সব মিলিয়ে, চীনের সামরিক বাহিনীতে চলমান শুদ্ধি অভিযান একদিকে দুর্নীতি ও শৃঙ্খলাভঙ্গের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ হিসেবে উপস্থাপিত হচ্ছে, অন্যদিকে এটি পিএলএর শীর্ষ নেতৃত্ব পুনর্গঠনের বড় প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে। এর স্বল্পমেয়াদি প্রভাব কমান্ড ও যুদ্ধ প্রস্তুতিতে কতটা পড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদে বাহিনীর নেতৃত্ব কাঠামো কীভাবে বদলায়, সেটিই এখন পর্যবেক্ষকদের অন্যতম প্রধান বিষয়।

জেবি/জেএইচআর

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD