১৬ বছর বয়সেই এআই রোবট কচ্ছপ বানিয়ে চমক দেখাল কিশোর

মাত্র ১৬ বছর বয়সেই পানির দূষণ শনাক্তে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে রোবট কচ্ছপ তৈরি করেছে কানাডার অন্টারিওর কিশোর ইভান বুডজ। কচ্ছপের মতো পানির নিচে চলতে সক্ষম এই রোবটের নাম দেওয়া হয়েছে ‘বার্ট’। পানিতে থাকা ক্ষতিকর উপাদান শনাক্তের পাশাপাশি পরিবেশ পর্যবেক্ষণেও এটি ব্যবহার করা যেতে পারে।
বিজ্ঞাপন
‘বার্ট’ তৈরির ভাবনা ইভানের মাথায় আসে ২০২৪ সালের গ্রীষ্মে। কানাডায় দাদা-দাদির বাড়ির সুইমিংপুলে প্রথমবার রোবটটি পানিতে নামিয়ে অবশ্য সমস্যায় পড়তে হয় তাকে। পানিতে নামানোর পর সেটি সরাসরি তলিয়ে যাচ্ছিল। পানির গভীরতা নিয়ন্ত্রণ কিংবা সঠিকভাবে সাঁতার কাটার ক্ষমতাও ছিল না।
এর আগে পরিবারের সঙ্গে অন্টারিওর একটি দুর্গম এলাকায় ক্যাম্পিংয়ের সময় পানিতে একটি স্ন্যাপিং কচ্ছপকে স্বাভাবিকভাবে চলতে দেখেছিল ইভান। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই কচ্ছপের সাঁতারের কৌশল অনুসরণ করে পানির নিচে চলতে সক্ষম একটি রোবট তৈরির পরিকল্পনা করেন তিনি।
সাধারণ পানির নিচের অনেক রোবট পাখা কিংবা উচ্চচাপের পানির প্রবাহ ব্যবহার করে চলাচল করে। এতে পানির নিচে শব্দ ও অতিরিক্ত নড়াচড়া তৈরি হতে পারে, যা জলজ প্রাণী ও সংবেদনশীল পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণে ইভান কচ্ছপের প্রাকৃতিক চলনকে অনুসরণ করে ‘বার্ট’ তৈরি করেন।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
রোবটটি ঘণ্টায় প্রায় ০.৫ মাইল গতিতে চলতে পারে। ইভানের তৈরি এই যন্ত্রে রয়েছে একটি ক্ষুদ্র কম্পিউটার, সামনের দিকে ক্যামেরা এবং পরিবেশগত ঝুঁকি শনাক্তের জন্য প্রশিক্ষিত এআই ব্যবস্থা। দীর্ঘ সময় কাজ করার সুবিধার জন্য এতে একটি সৌর প্যানেলও যুক্ত করা হয়েছে।
নিজস্ব পরীক্ষায় কৃত্রিমভাবে তৈরি প্রবাল বিবর্ণতার নমুনা শনাক্তে ‘বার্ট’ ৯৬ শতাংশ নির্ভুলতা দেখিয়েছে। তবে এই ফল নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে পরিচালিত পরীক্ষার ভিত্তিতে পাওয়া। বাস্তব সমুদ্র বা প্রাকৃতিক প্রবালপ্রাচীরে দীর্ঘ সময় ধরে একই মাত্রার নির্ভুলতা বজায় থাকবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
সুইমিংপুলের পাশাপাশি অন্টারিও হ্রদেও রোবটটির কার্যকারিতা পরীক্ষা করেছেন ইভান। ঘোলাটে পানির মধ্যেও কাজ করার জন্য এতে শব্দতরঙ্গভিত্তিক একটি যন্ত্র যুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র কণার আকার ও গঠন বিশ্লেষণের জন্য বিশেষ আলোকচিত্র প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
এসব তথ্য এআইয়ের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করে পানিতে থাকা কোনো কণা মাইক্রোপ্লাস্টিক কি না, তা শনাক্তের চেষ্টা করে ‘বার্ট’।
বিজ্ঞান মেলায় সেরা
ইভানের উদ্ভাবন ইতোমধ্যে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় স্বীকৃতি পেয়েছে। ২০২৫ সালের কানাডা-ব্যাপী বিজ্ঞান মেলায় উদ্ভাবন বিভাগে সেরা প্রকল্পের পুরস্কার পায় ‘বার্ট’। ওই প্রতিযোগিতায় প্রায় ২৫ হাজার শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছিল।
বিজ্ঞাপন
একই বছরের সেপ্টেম্বরে লাটভিয়ার রিগায় অনুষ্ঠিত ইউরোপীয় ইউনিয়নের তরুণ বিজ্ঞানী প্রতিযোগিতায় প্রথম পুরস্কারও অর্জন করে ইভান। এতে ৪০টি দেশের ১৪ থেকে ২০ বছর বয়সী শিক্ষার্থীরা অংশ নেয়। পুরস্কার হিসেবে সে পায় ৭ হাজার ইউরো।
এ ছাড়া ইতিবাচক ফলাফলের জন্য গর্ডন ই. মুর পুরস্কার হিসেবে ৫০ হাজার ডলার এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্পূর্ণ অর্থায়নে ভ্রমণের সুযোগসহ এলিসন স্কলার্স পুরস্কারও পেয়েছে ইভান।
এখনো রয়েছে সীমাবদ্ধতা
বিজ্ঞাপন
‘বার্ট’ এখনো নিজে থেকে তাৎক্ষণিকভাবে গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে না। এটি আগে থেকে নির্ধারিত একটি অনুসন্ধানপথ অনুসরণ করে। তবে রোবটটি পরিচালনার জন্য কোনো দড়ি বা দূরনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার প্রয়োজন হয় না।
এই ব্যবস্থার সুবিধা হলো, রোবটটি তুলনামূলকভাবে শান্তভাবে পানির নিচে কাজ করতে পারে। তবে কোনো অস্বাভাবিক বস্তু বা পরিস্থিতি শনাক্ত করলেও সেটির কাছে গিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে পরীক্ষা করার সক্ষমতা এখনো তৈরি হয়নি।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
পরবর্তী ধাপে রোবটটির মাধ্যমে সরাসরি পানির নমুনা সংগ্রহের ব্যবস্থা করতে চান ইভান। একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশের বাইরে প্রাকৃতিক জলাশয়ে আরও পরীক্ষা চালানোর পরিকল্পনাও রয়েছে তার।
ভবিষ্যতে রোবটের বহর
বিজ্ঞাপন
ইভানের লক্ষ্য শুধু একটি রোবট তৈরি করা নয়। ভবিষ্যতে একই ধরনের একাধিক রোবট কচ্ছপ একসঙ্গে পানিতে নামিয়ে বড় কোনো জলাশয় বা প্রবালপ্রাচীরের বিস্তৃত এলাকা পর্যবেক্ষণের পরিকল্পনা রয়েছে তার।
‘বার্ট’ তৈরিতে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগার বা বড় প্রতিষ্ঠানের গবেষণা বাজেট ব্যবহার করা হয়নি। ক্ষুদ্র কম্পিউটার, ক্যামেরা ও সহজলভ্য বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ব্যবহার করেই রোবটটি তৈরি করেছে ইভান।
তবে পরীক্ষায় পাওয়া ৯৬ শতাংশ নির্ভুলতাকে চূড়ান্ত সাফল্য হিসেবে দেখছে না সে। বরং ভবিষ্যতের আরও উন্নত পরীক্ষা ও গবেষণার ভিত্তি হিসেবে এই ফলাফলকে কাজে লাগাতে চায় ১৬ বছর বয়সী এই উদ্ভাবক।








