ইসরায়েলে নির্বাচন: ত্রিমুখী চাপে নেতানিয়াহু, হারাতে পারেন ক্ষমতা

ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নেসেট নির্বাচনে ভোট গ্রহণ শুরু হচ্ছে আজ মঙ্গলবার। স্থানীয় সময় সকাল ৭টায় (বাংলাদেশ সময় বেলা ১১টা) শুরু হয়ে ভোট চলবে রাত ১০টা পর্যন্ত। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এবারের নির্বাচনকে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, এই ভোটের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার বড় পরীক্ষায় পড়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু।
বিজ্ঞাপন
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ভয়াবহ হামলা ঠেকাতে ব্যর্থতা, গাজায় দীর্ঘ ও নিষ্ঠুর সামরিক অভিযান, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতার কারণে নেতানিয়াহুর ওপর জনঅসন্তোষ বেড়েছে। ভোটারদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ তাকে এসব ঘটনার জন্য দায়ী করছেন। এই অংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ হলে নির্বাচনের মধ্য দিয়েই নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের অবসান ঘটতে পারে।
তবে প্রায় ১৯ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা এই অভিজ্ঞ রাজনীতিকের রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকার দক্ষতাও কম নয়। ইসরায়েলে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির উত্থান এবং খণ্ডিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার কারণে নির্বাচনে পুরোপুরি জয়ী না হলেও সরকার গঠনের ক্ষেত্রে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে পারেন তিনি।
এবার নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ইসরায়েলের সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোট। সাম্প্রতিক জনমত জরিপে ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্যতার দিক থেকে দুজনকে প্রায় সমান অবস্থানে দেখা যাচ্ছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইয়াইর লাপিদ ও নাফতালি বেনেটের সঙ্গে জোট বেঁধেছেন আইজেনকোট। জরিপের পূর্বাভাস অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি ও তার ডানপন্থী মিত্রদের সঙ্গে আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন জোটের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
নিরাপত্তা ইস্যুতে কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত আইজেনকোটের প্রতি ডানপন্থী ও মধ্যপন্থী—দুই শিবিরেরই সমর্থন রয়েছে।
নেতানিয়াহু নির্বাচনী প্রচারে যুদ্ধকালীন নেতৃত্ব এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে মিত্রতার বিষয়টি সামনে এনেছেন। ট্রাম্প তাকে সমর্থন জানিয়েছেন এবং ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে ইসরায়েলের পাশে দাঁড়িয়েছেন। রোববার নেতানিয়াহু দাবি করেন, ট্রাম্প ইরানের হুমকি ‘চিরতরে’ নির্মূল করতে আবারও পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। তবে তার ভাষ্য অনুযায়ী, সেটি সম্ভব হবে কেবল তিনি ক্ষমতায় থাকলে।
অন্যদিকে আইজেনকোটের অভিযোগ, নেতানিয়াহু ‘ভীতি প্রদর্শন, মিথ্যাচার ও হুমকির ওপর ভিত্তি করে’ নির্বাচনী প্রচার চালাচ্ছেন। তিনি বলেন, ট্রাম্প নিশ্চয়ই ‘জনগণের দ্বারা নির্বাচিত যেকোনো নেতার সঙ্গে পূর্ণ সহযোগিতার ভিত্তিতে’ কাজ করবেন।
বিজ্ঞাপন
জনমত জরিপে উগ্র ডানপন্থী নেতা ইতামার বেন-গভিরের দল জিউইশ পাওয়ারের জনপ্রিয়তা বাড়তে দেখা গেছে। বিভিন্ন জরিপের পূর্বাভাস বলছে, নেতানিয়াহু জয়ী হলেও লিকুদ পার্টি এককভাবে সরকার গঠন করতে পারবে না। সে ক্ষেত্রে সরকার গঠনে তাকে নির্ভর করতে হবে কট্টর ডানপন্থী নেতা বেন-গভির ও বেজালেল স্মোত্রিচের ওপর। ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগে পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞার মুখেও রয়েছেন এই দুই নেতা।
তবে জরিপে এমন ইঙ্গিতও রয়েছে যে নেতানিয়াহু কিংবা আইজেনকোট—কারোরই ক্ষমতায় যাওয়ার নিশ্চিত পথ নেই। ১২০ আসনের নেসেটে কোনো পক্ষই জোট সরকার গঠন করতে না পারলে আগামী বছর নতুন নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত নেতানিয়াহু তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতায় থাকতে পারেন।
### জোট গঠনের সমীকরণ
বিজ্ঞাপন
ইসরায়েলের ইহুদি-নেতৃত্বাধীন প্রায় সব দলের মতো আইজেনকোটও ‘দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান’-এর বিরোধিতা করেন। ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে কয়েক দশকের শান্তি আলোচনার ভিত্তি ছিল এই ধারণা।
তবে ইসরায়েল-অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার সমালোচনা করেছেন আইজেনকোট। ২০২৩ সাল থেকে এ সহিংসতা বেড়েছে, যা পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্কে টানাপোড়েন সৃষ্টি করেছে। নেতানিয়াহুর অতি-ডানপন্থী জোটসঙ্গী বেন-গভির ও স্মোত্রিচের অবস্থানেরও বিরোধিতা করেন তিনি।
লিকুদ পার্টির শক্ত ঘাঁটিগুলোতে হতাশ ভোটারদের একাংশ বাড়ি বাড়ি গিয়ে অন্যদের নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে সংগঠিত করার চেষ্টা করছেন। এ ছাড়া ইসরায়েলের ইতিহাসে প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আদালতে দুর্নীতির অভিযোগের বিচার চলছে। তিনি অভিযোগ অস্বীকার করলেও এ কারণে তার অনেক সমর্থক মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।
বিজ্ঞাপন
ইসরায়েলের আরব সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটাররা—যারা নাগরিকত্বের দিক থেকে ইসরায়েলি হলেও ঐতিহ্যের দিক থেকে ফিলিস্তিনি—বিপুল সংখ্যায় ভোট দিলে জোট গঠনের জটিল সমীকরণ আইজেনকোটের পক্ষে যেতে পারে।
তবে আরব দলগুলোর সঙ্গে জোট গঠনের সম্ভাবনা নাকচ করেছেন আইজেনকোট। অভিন্ন মূল্যবোধের অভাবকে এর কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন তিনি। বিশ্লেষকেরা অবশ্য এমন পরিস্থিতির সম্ভাবনা দেখছেন, যেখানে আরব দলগুলো আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন সংখ্যালঘু সরকারকে বাইরে থেকে সমর্থন দিতে পারে। এতে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর পথ তৈরি হতে পারে।
শালোম হার্টম্যান ইনস্টিটিউটের ইসরায়েলি রাজনৈতিক বিশ্লেষক আমোৎজ আসা-এল বলেন, “আমার ধারণা, যে পক্ষই জিতুক না কেন, তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হবে খুবই সামান্য। কোনো বড় ধরনের জয়, যাকে আমরা ভূমিধস (ল্যান্ডস্লাইড) জয় বলি, তেমন হওয়ার সম্ভাবনা নেই।”
বিজ্ঞাপন
সূত্র: রয়টার্স








