ধনীদের একদিনের বিলাসে যত কার্বন নিঃসরণ, দরিদ্রের এক বছরের সমান

বিশ্বের অতি ধনীদের জীবনযাপন ও ভোগের কারণে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ দরিদ্র জনগোষ্ঠীর তুলনায় অনেক বেশি। বৈশ্বিক জলবায়ু সংকট তৈরিতে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখা এই ধনী শ্রেণিই আবার সংকটের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে নিজেদের সুরক্ষিত রাখার সামর্থ্য রাখে। অন্যদিকে, তুলনামূলকভাবে কম কার্বন নিঃসরণকারী দরিদ্র মানুষেরাই জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ পরিণতির শিকার হচ্ছেন। সোমবার (২৬ অক্টোবর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরেছে আন্তর্জাতিক বৈষম্যবিরোধী সংস্থা অক্সফাম।
বিজ্ঞাপন
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ১ শতাংশ মানুষের সংখ্যা প্রায় ৮০ লাখ। তাদের বার্ষিক গড় আয় ৪ লাখ ৪২ হাজার ডলার। এই জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত কার্বন নিঃসরণ বিশ্বের দরিদ্রতম ৩৫০ কোটি মানুষের মোট নিঃসরণের চেয়েও বেশি।
এতে আরও বলা হয়েছে, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ০.১ শতাংশ মানুষের একজন বছরে যুক্তরাষ্ট্রের একজন গড় মানুষের তুলনায় ৪৮ গুণ বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO₂) নিঃসরণ করেন।
অক্সফাম আমেরিকার জলবায়ু ন্যায়বিচারবিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা র্যাচেল কার্লে বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অতি ধনীরা কীভাবে অসমানুপাতিক হারে জলবায়ু সংকট সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখছেন, তা আমরা দেখতে পাচ্ছি। একই সঙ্গে তারা জলবায়ু সংকটের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে নিজেদের অনেকটাই সুরক্ষিত রাখতে পারেন। এমনকি, যে সংকট তৈরিতে তাদের ভূমিকা রয়েছে, সেই সংকটের কারণে সৃষ্ট দুর্যোগ থেকেও তারা মুনাফা অর্জন করছেন।”
বিজ্ঞাপন
আয়ভিত্তিক কার্বন নিঃসরণের হিসাব নির্ধারণে অক্সফাম জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিশ্লেষণের বিভিন্ন মডেল এবং স্টকহোম এনভায়রনমেন্ট ইনস্টিটিউটের তৈরি ভোগভিত্তিক কার্বন নিঃসরণসংক্রান্ত তথ্যভান্ডার ব্যবহার করেছে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় কার্বন নিঃসরণ কমানোকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। চলতি মাসে জাতিসংঘ সতর্ক করে জানিয়েছে, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে সীমিত রাখতে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। এ লক্ষ্য অর্জনে ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী কার্বন নিঃসরণ ১৮ শতাংশ কমাতে হবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন গবেষণায় বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণের বড় অংশের জন্য ধনী দেশগুলোকে দায়ী করা হয়েছে। তবে অক্সফামের প্রতিবেদন বলছে, শুধু দেশগুলোর মধ্যে নয়, একই দেশের ধনী ও দরিদ্র মানুষের মধ্যেও নিঃসরণের ক্ষেত্রে ব্যাপক ব্যবধান রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
এর উদাহরণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। চীনের পর দেশটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম কার্বন নিঃসরণকারী। তবে দেশটির সব নাগরিক সমান পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ করেন না।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ধনী ০.১ শতাংশ মানুষের একজন মাত্র ১১৮ দশমিক ৩ দিনে যে পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ করেন, তা দেশটির দরিদ্রতম অর্ধেক মানুষের গত ৩০ বছরের মোট নিঃসরণের চেয়েও বেশি।
যুক্তরাষ্ট্রের দরিদ্রতম অর্ধেক মানুষের বার্ষিক গড় আয় ২৫ হাজার ৬০০ ডলার। বিপরীতে, দেশটির সবচেয়ে ধনী ০.১ শতাংশ মানুষের বার্ষিক গড় আয় প্রায় ১৯ লাখ ৮০ হাজার ডলার।
বিজ্ঞাপন
কার্বন নিঃসরণের অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে ব্যক্তিগত জেটবিমানের কথা উল্লেখ করেছে অক্সফাম। সংস্থাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে এসব বিমানের কারণে ১ কোটি ৬০ লাখ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসৃত হয়েছে। এই পরিমাণ নিঃসরণ ২০ লাখেরও বেশি বাড়ির এক বছরের জ্বালানি ব্যবহারের সমান।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিশ্বের সব ব্যক্তিগত জেটবিমান মাত্র দুই সেকেন্ডে যে পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ করে, তা বিশ্বের দরিদ্রতম ৫০ শতাংশ মানুষের একজনের এক বছরের নিঃসরণের চেয়েও বেশি। এই জনগোষ্ঠীর একজনের বার্ষিক গড় আয় মাত্র ১ হাজার ৫০০ ডলার।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
বিশ্বে ব্যক্তিগত জেটবিমানের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি যুক্তরাষ্ট্রে। বিশ্বের মোট ব্যক্তিগত জেটবিমানের ৬৮ শতাংশই যুক্তরাষ্ট্র থেকে উড্ডয়ন করে। অক্সফামের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ব্যক্তিগত জেটবিমানগুলো মোট ৬৫ লাখ ঘণ্টারও বেশি সময় আকাশে উড়েছে।
বিজ্ঞাপন
র্যাচেল কার্লে বলেন, ‘অতি ধনীদের জীবনযাপন ও ভোগের ধরন সাধারণ মানুষের চেয়ে অনেকটাই আলাদা। অতি ধনীরা দূষণকারী শিল্প ও প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করার ক্ষেত্রেও তুলনামূলকভাবে বেশি জড়িত।’
অক্সফামের প্রতিবেদনে এমন ২১৭টি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যেগুলো জলবায়ু বিপর্যয় সৃষ্টি করে, এ ধরনের বিপর্যয় মোকাবিলার প্রস্তুতি থেকে অথবা বিপর্যয়ের পর পুনরুদ্ধার কার্যক্রমের মাধ্যমে মুনাফা অর্জন করে।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে এসব প্রতিষ্ঠান গড়ে ১৮০ কোটি ডলার মুনাফা করেছে। একই সময়ে শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে ১০০ কোটি ডলারেরও বেশি অর্থ বিতরণ করেছে তারা।
বিজ্ঞাপন
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অতি ধনীদের বিপুল কার্বন নিঃসরণ জলবায়ু পরিবর্তনের গতি বাড়াচ্ছে। এর ফলে জলবায়ুজনিত ক্ষয়ক্ষতিও ক্রমেই বাড়ছে।
বিভিন্ন আয়গোষ্ঠীর কার্বন নিঃসরণের প্রভাব নির্ধারণে একাধিক মডেল ব্যবহার করেছেন গবেষকরা। তাদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১৯৯০ সাল থেকে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ২০ শতাংশের জন্য দায়ী বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ১ শতাংশ মানুষ। বৈশ্বিক জনসংখ্যায় তাদের অংশের তুলনায় এই অবদান ২০ গুণ বেশি।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
এ ছাড়া বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ১ শতাংশ মানুষের কার্বন নিঃসরণ একজন গড় মানুষের তুলনায় চরম তাপপ্রবাহের মতো ঘটনা সৃষ্টিতে ৩৪ গুণ বেশি অবদান রেখেছে।
বিজ্ঞাপন
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ১ শতাংশ মানুষের এক বছরের কার্বন নিঃসরণের কারণে ভবিষ্যতে আনুমানিক ১৯ লাখ অতিরিক্ত মানুষের মৃত্যু হতে পারে। এসব মৃত্যুর অন্যতম কারণ হবে তীব্র তাপপ্রবাহ।
অক্সফামের প্রতিবেদনে জলবায়ু সংকটের একটি বড় বৈপরীত্য তুলে ধরা হয়েছে। যাদের কার্বন নিঃসরণ সবচেয়ে বেশি, তারাই আবার জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে নিজেদের সুরক্ষিত রাখার ক্ষেত্রে সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন।
অন্যদিকে, নিম্ন আয়ের মানুষের জলবায়ুজনিত দুর্যোগ ও চরম আবহাওয়ার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি। দুর্যোগের পর জীবন ও সম্পদ পুনর্গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থও অনেকের হাতে থাকে না।
এর বিপরীতে, ধনী ব্যক্তিরা তুলনামূলক নিরাপদ এলাকায় বসবাস করতে পারেন। দুর্যোগের সময় নিজেদের সুরক্ষায় বিপুল অর্থ ব্যয় করার সামর্থ্যও তাদের রয়েছে। ব্যক্তিগত অগ্নিনির্বাপণকর্মী নিয়োগ, জেনারেটরের ব্যবস্থা কিংবা জরুরি পরিস্থিতিতে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে পারেন তারা।
ফলে জলবায়ু সংকট তৈরিতে যাদের অবদান সবচেয়ে বেশি, তারা এর ক্ষতিকর প্রভাব থেকে নিজেদের অনেকটাই রক্ষা করতে পারেন। অথচ সংকটের জন্য তুলনামূলকভাবে কম দায়ী দরিদ্র মানুষদেরই প্রায়ই সবচেয়ে ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করতে হয়।
জলবায়ু সংকটের বোঝা আরও ন্যায্যভাবে বণ্টনের লক্ষ্যে অতি ধনীদের ওপর কর আরোপের প্রস্তাব দিয়েছে অক্সফাম।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যক্তিগত জেটবিমানের ব্যবহারসহ উচ্চমাত্রার কার্বন নিঃসরণ ঘটায়—এমন বিলাসবহুল পণ্য ও কর্মকাণ্ডের ওপর কর আরোপ করা যেতে পারে। এতে এসব পণ্যের অতিরিক্ত ব্যবহার নিরুৎসাহিত হবে এবং কার্বন নিঃসরণ কমাতে সহায়তা করবে।
এ ছাড়া জীবাশ্ম জ্বালানি খাতের কোম্পানিগুলোর অস্বাভাবিক মুনাফার ওপর বিশেষ কর আরোপের প্রস্তাবও দিয়েছে সংস্থাটি।
অক্সফামের মতে, এসব কর থেকে সংগৃহীত অর্থ জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলা এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় ব্যবহার করা যেতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোতে জলবায়ু অর্থায়ন বাড়ানো এবং বিভিন্ন অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার উপযোগী অবকাঠামো ও ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
র্যাচেল কার্লে বলেন, ‘আমরা আশা করি, মানুষ বুঝতে পারবেন যে বৈষম্য কমানোর পাশাপাশি পৃথিবী ও এর মানুষের সুরক্ষায় কাজ করার অনেক সুযোগ রয়েছে। দূষণকারীদের কর্মকাণ্ডের কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির দায় নিতে হবে।’








