নির্বাচনে পরাজয়ের পর ট্রাম্প থেকে দূরত্ব বাড়াচ্ছেন ভ্যান্স

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির বড় ধরনের পরাজয়ের পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থান থেকে কিছুটা সরে আসছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের বিষয়ে ট্রাম্পের নীতির সমালোচনা করে নিজের ভিন্ন অবস্থান তুলে ধরেছেন তিনি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই এমন কৌশল নিয়েছেন ভ্যান্স।
বিজ্ঞাপন
বুধবার (৪ নভেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া দীর্ঘ এক পোস্টে ভ্যান্স বলেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কারণেই মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় ধরনের বিপর্যয় হয়েছে। তার এই মন্তব্যকে ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান থেকে দূরত্ব তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন পর্যবেক্ষকেরা।
২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে ভ্যান্সের। মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন তিনি।
নিজের পোস্টে ভ্যান্স লেখেন, কেউ যদি মনে করেন, ইরান যুদ্ধের কারণে আগামী ছয় বছরের জন্য সিনেটের নিয়ন্ত্রণ হারানো সার্থক হয়েছে, তাহলে তিনি সেই যুক্তি তুলে ধরতে পারেন।
বিজ্ঞাপন
অন্যদিকে, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানকে শুরু থেকেই প্রয়োজনীয় বলে দাবি করে আসছেন ট্রাম্প। মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল প্রকাশের সময়ও নিজের সিদ্ধান্তের পক্ষে অবস্থান ধরে রাখেন তিনি।
বুধবার হোয়াইট হাউজে নির্মাণাধীন বলরুম পরিদর্শনের সময় সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ইরানকে ঘিরে যা করা হয়েছে, তা করা জরুরি ছিল। এখনো সেই পদক্ষেপ অব্যাহত রাখতে হচ্ছে।
ভ্যান্সের মন্তব্য নিয়ে জানতে চাইলে ট্রাম্প জানান, ভাইস প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তার কথা হয়েছে। ভ্যান্সের অবস্থান সম্পর্কে তিনি অবগত এবং তার বক্তব্য ভালো ছিল।
বিজ্ঞাপন
ট্রাম্প আরও বলেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনে ইরান যুদ্ধের প্রভাব পড়তে পারে, তা তিনি আগেই অনুমান করেছিলেন। তা সত্ত্বেও সামরিক অভিযানের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেননি।
ইরান যুদ্ধ নিয়ে আগে থেকেই আপত্তি ছিল ভ্যান্সের
বিদেশে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের বিষয়ে বরাবরই সতর্ক অবস্থানের পক্ষে ছিলেন ভ্যান্স। ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্প সামরিক অভিযান শুরু করার পরও তিনি প্রকাশ্যে জোরালো সমর্থন জানাননি।
বিজ্ঞাপন
এমনকি সংঘাত বন্ধে একটি উদ্যোগের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও পালন করেছিলেন তিনি। যদিও শেষ পর্যন্ত সেই প্রচেষ্টা সফল হয়নি।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পর ইরান যুদ্ধকে সরাসরি দায়ী করায় ট্রাম্পের সঙ্গে তার মতপার্থক্য নতুন করে সামনে এসেছে।
সাবেক মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সের চিফ অব স্টাফ মার্ক শর্ট মনে করেন, ট্রাম্পের কাছ থেকে রাজনৈতিকভাবে দূরত্ব তৈরির লক্ষ্যেই ভ্যান্সের এই বক্তব্য।
বিজ্ঞাপন
শর্টের ভাষ্য, ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও নির্বাচনের ফলাফল ভ্যান্সের প্রেসিডেন্ট হওয়ার সম্ভাবনা পুরোপুরি শেষ করে দেয়নি। তবে এই ফল তার রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার জন্য ইতিবাচক নয়।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
তার মতে, ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণের সময়ই ট্রাম্পের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে যুক্ত থাকার বিষয়টি মেনে নিয়েছিলেন ভ্যান্স।
ডেমোক্র্যাটদের প্রশ্ন, বিরোধিতা থাকলে পদত্যাগ করেননি কেন
বিজ্ঞাপন
ভ্যান্সের সাম্প্রতিক বক্তব্যের সমালোচনা করেছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। দলটির জাতীয় কমিটির মুখপাত্র রোজমেরি বোগলিন প্রশ্ন তুলেছেন, ইরান যুদ্ধের বিষয়ে শুরু থেকেই আপত্তি থাকলে ভ্যান্স কেন আরও জোরালোভাবে প্রতিবাদ করেননি?
তিনি আরও জানতে চান, যুদ্ধের বিরোধিতা করে ভ্যান্স পদত্যাগ করেননি কেন এবং মার্কিন নাগরিকদের স্বার্থে অবস্থান নেননি কেন?
বোগলিনের অভিযোগ, রাজনৈতিক সুবিধা আদায় করাই ভ্যান্সের প্রধান উদ্দেশ্য। একই সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের ব্যর্থতার দায় থেকেও তিনি নিজেকে মুক্ত রাখতে পারবেন না।
বিজ্ঞাপন
ইসরায়েল ও অভিবাসন নীতিতেও রয়েছে মতপার্থক্য
ইরান যুদ্ধের বাইরেও ইসরায়েল এবং অভিবাসন নীতি নিয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে ভ্যান্সের কিছু মতবিরোধ রয়েছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর পুনর্নির্বাচনের পক্ষে প্রকাশ্যে সমর্থন জানাননি ভ্যান্স। পাশাপাশি ইরান যুদ্ধ বন্ধে ট্রাম্পের উদ্যোগের বিরোধিতা করায় ইসরায়েল সরকারের কয়েকজন সদস্যের সমালোচনাও করেছেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
অভিবাসন নীতিতেও কিছুটা ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন এই ভাইস প্রেসিডেন্ট। তার মতে, অবৈধ শ্রমিক নিয়োগ দেওয়া ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
তবে যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে বসবাসরত অভিবাসীদের সাধারণ ক্ষমা দেওয়ার প্রস্তাবের বিরোধিতা করছেন তিনি।
৬০ শতাংশ ভোটার মনে করেন, ইরান যুদ্ধের সিদ্ধান্ত ভুল
বিজ্ঞাপন
মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) প্রকাশিত ভোটার জরিপে ইরান যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন নাগরিকদের মনোভাবের চিত্র উঠে এসেছে।
এক লাখের বেশি ভোটারের অংশগ্রহণে পরিচালিত জরিপ অনুযায়ী, প্রায় ৬০ শতাংশ ভোটার মনে করেন, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল না।
যুদ্ধের বিরোধিতাকারীদের বড় একটি অংশ কংগ্রেস নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের ভোট দিয়েছেন। তবে অধিকাংশ ভোটারের কাছে ইরান যুদ্ধই ভোট দেওয়ার প্রধান বিবেচ্য বিষয় ছিল না।
আরও পড়ুন
জরিপে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ভোটার জানিয়েছেন, কংগ্রেস নির্বাচনে তাদের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে ইরান যুদ্ধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। অন্যদিকে জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সরকারি দুর্নীতিকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করেছেন প্রায় অর্ধেক ভোটার।
ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের ভোট দেওয়া প্রায় সব ভোটারই ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের সিদ্ধান্তকে ভুল বলে মনে করেন। বিপরীতে, রিপাবলিকান প্রার্থীদের ভোট দেওয়া প্রায় ৮০ শতাংশ ভোটার সামরিক পদক্ষেপকে সঠিক বলে সমর্থন করেছেন।
২০২৮ সালের নির্বাচন ঘিরে ভ্যান্সের নতুন রাজনৈতিক হিসাব
ইরাক যুদ্ধে অংশ নেওয়া সাবেক মার্কিন মেরিন সেনা ভ্যান্স দীর্ঘদিন ধরেই বিদেশে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক সংঘাতের সমালোচনা করে আসছেন। ভাইস প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরও তিনি বলেছিলেন, ট্রাম্প প্রশাসন অতীতের মতো দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে মার্কিন সেনাদের জড়াবে না।
কিন্তু চলতি বছরের বসন্তে ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্প সামরিক অভিযান শুরু করলে ভ্যান্সের প্রতিক্রিয়া ছিল অনেকটাই নীরব। এবার মধ্যবর্তী নির্বাচনে দলের বিপর্যয়ের পর যুদ্ধের বিরোধিতার বিষয়টি সামনে আনলেন তিনি।
অবশ্য এর আগে ইরান যুদ্ধের পক্ষে যুক্তিও দিয়েছিলেন ভ্যান্স। রক্ষণশীল উপস্থাপক মেগিন কেলির পডকাস্টে তিনি বলেছিলেন, মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারলে এই যুদ্ধ সার্থক হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে ভ্যান্সের অবস্থান পরিবর্তন তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে ইরান যুদ্ধের দায় এড়িয়ে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান শক্ত করা তার জন্য সহজ হবে না।
সূত্র: এপি








