বাজি ধরেছিলেন ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু, শেষ পর্যন্ত হারলেন দুজনই

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর রিপাবলিকান পার্টির বড় পরাজয় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অবস্থানকেও চাপে ফেলেছে। ওয়াশিংটনে নিজেদের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্রের এমন বিপর্যয়ে ইসরায়েলের ডানপন্থি রাজনীতিকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। বিশেষ করে ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ব্যবহার করা নেতানিয়াহুর জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
বিজ্ঞাপন
দীর্ঘদিন ধরে নেতানিয়াহু নিজেকে ট্রাম্পের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মিত্র হিসেবে তুলে ধরেছেন। গত বছর হোয়াইট হাউসে ফিরে ট্রাম্পও প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে আর কোনো দীর্ঘস্থায়ী ও অর্থহীন বিদেশি যুদ্ধে জড়াবেন না। কিন্তু গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ সামরিক অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেন ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু। এর পর ইরানের পাল্টা হামলায় মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বড় ধরনের সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দেয়।
নতুন করে যুদ্ধের উত্তেজনার মধ্যেই গত মঙ্গলবারের মার্কিন কংগ্রেস নির্বাচন এবং গত সপ্তাহের ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে দুই নেতা পরস্পরের প্রতি সমর্থন জানান। নিজ নিজ দেশের ভোটারদের কাছেও মিত্রের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান তারা। নেতানিয়াহু মূলত ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা ও রাজনৈতিক প্রভাবের ওপর ভরসা করেছিলেন। কিন্তু নির্বাচনের ফলাফল তাঁদের সেই হিসাবকে উল্টে দিয়েছে।
২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থি জোট পেয়েছে মাত্র ৫৩টি আসন। অথচ সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ৬১টি। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণই হারিয়েছে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি। এমনকি ঐতিহ্যগতভাবে রিপাবলিকানদের শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত টেক্সাস ও কানসাসেও ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা জয় পেয়েছেন।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ডের অধ্যাপক ও ‘ক্রিটিক্যাল ইস্যুজ পোল’-এর পরিচালক শিবলি তালহামি মার্কিন নির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করে বলেন, ‘স্পষ্টতই আমরা ইতিহাসের এক রাজনৈতিক সুনামি প্রত্যক্ষ করেছি, যা ট্রাম্পবাদের প্রতি পুরোপুরি প্রত্যাখ্যানের শামিল। তাই বিষয়টি কেবল একটি ইস্যুতে সীমাবদ্ধ নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘তবে পররাষ্ট্রনীতি ছিল এর অন্যতম প্রধান বিষয়। বিশেষ করে ইরান যুদ্ধ এবং ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন। কারণ, মার্কিন নাগরিকরা এসব বিষয়কে নিজেদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেখছেন।’
দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের সবচেয়ে শক্তিশালী কূটনৈতিক ও সামরিক সহযোগী হিসেবে ভূমিকা পালন করে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে উত্থাপিত কয়েক ডজন প্রস্তাবে ভেটো দিয়েছে ওয়াশিংটন। এসব প্রস্তাবের মধ্যে গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ বন্ধের দাবিও ছিল।
বিজ্ঞাপন
এ ছাড়া প্রতিবছর ইসরায়েলকে অন্তত ৩৮০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা দিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র। এই অর্থ ও সহযোগিতার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় অত্যাধুনিক মার্কিন অস্ত্র সংগ্রহ করতে পারে ইসরায়েল। তবে দীর্ঘদিনের এই সহায়তা এখন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ক্রমেই বিতর্কের কারণ হয়ে উঠছে।
মার্কিন নির্বাচনের এক সপ্তাহ আগে তালহামির পরিচালিত এক জনমত জরিপে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ নাগরিক মনে করেন, ইরানের বিরুদ্ধে ব্যয়বহুল ও দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ শুরু করতে ট্রাম্প প্রশাসনকে প্রভাবিত করেছে ইসরায়েল।
তালহামির ভাষ্য অনুযায়ী, ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এখন অনেক মার্কিন ভোটারের কাছে সম্পদ নয়, বরং বোঝা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘অধিকাংশ মানুষই বলেছেন, ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে ইসরায়েল একটি বিবেচ্য বিষয় হবে। এর চেয়েও বড় সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মনে করেন, ইরান যুদ্ধ তাদের ভোটে প্রভাব ফেলবে। আর তারা এই যুদ্ধের সঙ্গে ইসরায়েলের সংশ্লিষ্টতা দেখছেন।’
বিজ্ঞাপন
‘কুকুরের লেজ নাড়ানোর’ পরিস্থিতি
মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের জয় মেনে নিয়েছেন ট্রাম্প। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবের কারণে ইরান যুদ্ধও তাঁর নির্বাচনি পরাজয়ের অন্যতম কারণ হতে পারে বলে স্বীকার করেছেন তিনি। অন্যদিকে নিজের নির্বাচনি ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন নেতানিয়াহু।
গত এক সপ্তাহে লিকুদ পার্টির এই নেতা অভিযোগ করেছেন, বিদেশি শক্তিগুলো অবৈধভাবে ইসরায়েলের আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর ভোট বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে জাতীয় সরকার গঠনের ভিত্তি হিসেবে ইহুদি ভোটারদের মধ্যে নিজের দলের সাফল্যের বিষয়টি তুলে ধরছেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
২০২০ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজয়ের পর ট্রাম্প যেভাবে ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন, নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক অবস্থানের সঙ্গে তার মিল খুঁজে পাচ্ছেন বিশ্লেষকেরা। এমনকি নির্বাচনের ফল আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার না করার হুমকিও দিয়েছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী।
তবে সরকার গঠনের জন্য জোট নিয়ে আলোচনা শুরুর পাশাপাশি ইসরায়েলের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে এখন যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পের পরাজয়ের প্রভাব নিয়েও ভাবতে হচ্ছে। বিশেষ করে নেতানিয়াহুর সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক এই পরিস্থিতির জন্য কতটা দায়ী, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
বুধবার ইসরায়েলের বিরোধী রাজনীতির অন্যতম নেতা ইয়ার লাপিদ বলেন, নির্বাচনের পর নেতানিয়াহুর নেওয়া প্রায় সব পদক্ষেপই তাঁকে রাজনৈতিকভাবে গ্রহণের অযোগ্য করে তুলেছে। এর মধ্যে আরব দলগুলোর নেতাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করতে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংস্থা শিন বেতকে নির্দেশ দেওয়ার বিষয়টিও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের ফলাফল পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রে ভোটগ্রহণ চলার সময় এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প জানান, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ ইসরায়েলকে বছরে ৪০০ কোটি ডলারের সহায়তা দেওয়া বন্ধ করার বিষয়ে নেতানিয়াহুর সঙ্গে তাঁর সমঝোতা হয়েছে।
এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ না হলেও ট্রাম্পের মন্তব্য ঘিরে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, ইসরায়েলের প্রতি মার্কিন প্রশাসনের সমর্থন এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক চাপ নিয়ে জনঅসন্তোষ প্রশমিত করার চেষ্টা হিসেবেও এমন বক্তব্য দিয়ে থাকতে পারেন তিনি।
ইসরায়েলি সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড্যানিয়েল লেভি আলজাজিরাকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে যে গভীর পরিবর্তন ঘটছে, তার ব্যাপ্তি সম্পর্কে ইসরায়েলের মধ্যে একধরনের অস্বীকারের প্রবণতা রয়েছে।’
বিজ্ঞাপন
তাঁর মতে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে ইসরায়েল সরাসরি প্রধান ইস্যু না হলেও ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘কুকুরের লেজ নাড়ানোর’ যে ধারণা তৈরি হয়েছে, তা ভোটের ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে।
লেভি বলেন, ‘সবচেয়ে স্পষ্ট প্রভাবটি ছিল ইরান যুদ্ধের। এর একটি অংশ হলো, আরেকটি বিপর্যয়কর মধ্যপ্রাচ্য অভিযানে একজন সহজে প্রভাবিত হওয়া প্রেসিডেন্টকে টেনে নেওয়ার ক্ষেত্রে ইসরায়েলের ভূমিকা।’
তাঁর বিশ্লেষণে, এই যুদ্ধ মার্কিন জনগণের সামনে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কের বাস্তবতা এবং মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সামরিক সংঘাতে জড়ানোর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মূল্য আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের নিঃশর্ত সমর্থনে পরিবর্তন আসতে পারে। ভবিষ্যতে জোট গঠনের বিকল্প নিয়ে চিন্তা করার সময় ইসরায়েলের বিরোধী নেতাদেরও বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হতে পারে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাটিক পার্টির একটি অংশের কাছে নেতানিয়াহু আগে থেকেই অজনপ্রিয়। তবে ট্রাম্পের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক অভিযান জোরদার করার সুযোগ তৈরি করতে পারে। এর মাধ্যমে নেতানিয়াহু আবারও রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে ফিরে আসার চেষ্টা করতে পারেন বলে মনে করেন লেভি।
তিনি বলেন, ‘এখন সেই উদ্যোগ নেওয়ার ক্ষেত্রে নেতানিয়াহুর অবস্থান দুর্বল হবে। তবে সম্ভাবনাটি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়, বিশেষ করে যখন নেতৃত্বে রয়েছেন একজন ক্ষতবিক্ষত ট্রাম্প।’
নিউইয়র্কে ইসরায়েলের সাবেক রাষ্ট্রদূত ও কনসাল জেনারেল অ্যালন পিনকাসের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্পর্ক এখন গুরুত্বপূর্ণ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। তবে এই পরিবর্তনের সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে ইসরায়েলের অনেকেরই যথেষ্ট ধারণা নেই।
পিনকাস মনে করেন, ইরান যুদ্ধ এবং নির্বাচনে নিজের ও নীতিগত অবস্থানের বিরুদ্ধে পাওয়া বড় প্রত্যাখ্যানের পর ট্রাম্প কী পদক্ষেপ নেন, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। তিনি চাইলে সংঘাত আরও বাড়াতে পারেন, আবার কংগ্রেসের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টাও করতে পারেন।
তবে তাঁর মতে, ট্রাম্প যে পথই বেছে নিন না কেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ভিত্তিতে ইতিমধ্যে মৌলিক পরিবর্তন এসেছে।
পিনকাস বলেন, ‘৩৮০ কোটি ডলারের অনুদান বন্ধের বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের জনগণকে সন্তুষ্ট করার জন্য কোনো ধরনের বিনিময়মূলক সমঝোতা ছিল; এমন নানা জল্পনা থাকলেও ওই সহায়তার সঙ্গে যুক্ত অস্ত্রপ্রাপ্তির সুযোগ নিয়ে কোনো কথা বলা হয়নি।’
তিনি আরও বলেন, ‘অর্থ ছাড়া হয়তো ইসরায়েল চলতে পারবে; কিন্তু অস্ত্রের ওপর তারা নির্ভরশীল। অথচ এ বিষয়ে কিছুই বলা হয়নি। ভবিষ্যৎ কৌশলগত কোনো চুক্তির কথাও উল্লেখ করা হয়নি। সবকিছু এখনো অনিশ্চিত।’
সূত্র: আলজাজিরা








