বারবার প্রাক্তনের কাছে ফিরে যাওয়া বন্ধুকে যেভাবে সামলাবেন

প্রায় সবার বন্ধুমহলেই এমন কেউ না কেউ আছেন, যিনি বারবার সাবেক সঙ্গীর কাছে ফিরে যান। প্রেমে ঝগড়া, বিচ্ছেদ, বন্ধুদের কাছে কষ্টের কথা বলা, তারপর আবার সেই সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া—এভাবে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে থাকে। বন্ধুরা অনেক বোঝানোর পরও যখন তাকে আগের সম্পর্কে ফিরে যেতে দেখেন, তখন হতাশা ও মানসিক ক্লান্তি তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
বিজ্ঞাপন
তবে অস্বাস্থ্যকর সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসা সব সময় সহজ নয়। বিশেষ করে সম্পর্কে নির্যাতন থাকলে লজ্জা, পরিবার একসঙ্গে রাখার ইচ্ছা, আর্থিক নির্ভরতা কিংবা সঙ্গীর প্রতিশোধ নেওয়ার আশঙ্কা কাউকে সেই সম্পর্কেই আটকে রাখতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের পারিবারিক সহিংসতাবিষয়ক জাতীয় সম্পদকেন্দ্রের কর্মকর্তা আরলেন ভ্যাসেলের মতে, নির্যাতন মূলত ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সম্পর্কিত। নির্যাতনকারী নিজের নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কা করলে সহিংসতা আরও বাড়তে পারে। তাই নির্যাতনমূলক সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়া অনেকের জন্য জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
বন্ধুকে সাহায্য করতে গিয়ে আপনিও ক্লান্ত হয়ে পড়তে পারেন
বিজ্ঞাপন
বন্ধুর বিচ্ছেদের কষ্ট শোনা, তাকে সাহস দেওয়া এবং নিজের মূল্য বুঝতে সাহায্য করার পরও যখন তাকে আবার সেই সম্পর্কে ফিরে যেতে দেখা যায়, তখন বন্ধুত্বের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
এক নারী সেলফ সাময়িকীকে জানান, ক্ষতিকর সম্পর্ক থেকে একসময়ের ঘনিষ্ঠ বান্ধবীকে বের করে আনার চেষ্টা করেও তিনি উল্টো চাপ সৃষ্টি করা ও অন্যের ব্যক্তিগত জীবনে নাক গলানোর অভিযোগ শুনেছেন।
তার মতে, ক্ষতিকর সম্পর্কে থাকা মানুষের কষ্ট বোঝা যেমন জরুরি, তেমনি তাদের পাশে থাকা বন্ধুদের মানসিক চাপ ও অসম্মানিত হওয়ার অভিজ্ঞতাও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বিজ্ঞাপন
বারবার একই পরামর্শ দিতে গিয়ে তৈরি হয় মানসিক অবসাদ
বন্ধুরা সাধারণত প্রিয়জনের সুখ চান। তাই কেউ যখন বলেন, ‘এবার সব ঠিক হয়ে যাবে’, তখন অনেকেই আর আপত্তি করেন না। কিন্তু একই সমস্যা নিয়ে বারবার আলোচনা করতে করতে একসময় মানসিক ক্লান্তি তৈরি হতে পারে।
মিয়ামির ক্লিনিক্যাল মনোবিজ্ঞানী ক্রিস্টি ফেরারি এ ধরনের অভিজ্ঞতাকে ‘সহমর্মিতাজনিত অবসাদ’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, বন্ধুর কষ্ট বারবার দেখতে থাকা এবং নিজের পরামর্শ উপেক্ষিত হতে দেখলে হতাশা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। একসময় মনে হতে পারে, বন্ধুকে ভালো রাখার দায়িত্বও যেন নিজের কাঁধে এসে পড়েছে।
বিজ্ঞাপন
এতে মানসিক চাপ বাড়ার পাশাপাশি বন্ধুর প্রতি সম্মান ও সম্পর্কের স্বাভাবিক ভারসাম্যও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এমন অনুভূতি হওয়া মানেই আপনি খারাপ বন্ধু নন।
এক নারী জানান, সাবেক সঙ্গীর সঙ্গে বন্ধুর বারবার বিচ্ছেদ ও পুনর্মিলনের কারণে তাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব একসময় ভেঙে যায়। প্রায় দুই বছর ধরে তিনি বন্ধুর কাছ থেকে সাবেক সঙ্গীর প্রতারণা, অপমান ও গালিগালাজের কথা শুনেছেন। কিন্তু এত কিছুর পরও বন্ধুকে একই সম্পর্কে ফিরে যেতে দেখে তিনি হতাশ হয়ে পড়েন।
ওই নারীর ভাষ্য অনুযায়ী, সাবেক সঙ্গীর সঙ্গে সম্পর্কে জড়ালে বন্ধুর আচরণও বদলে যেত। একসময় যে প্রতারণাকে সম্পর্ক শেষ করার যথেষ্ট কারণ মনে করতেন, পরে সেটির পক্ষেই নানা অজুহাত দিতে শুরু করেন। এমনকি সম্পর্কের বিরোধিতা করা বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগও বন্ধ করে দেন।
বিজ্ঞাপন
একপর্যায়ে ওই নারী উপলব্ধি করেন, বন্ধুকে পরামর্শ দেওয়া ও পাশে থাকাই তার দায়িত্ব। সেই পরামর্শ মেনে চলবেন কি না, তা বন্ধুর নিজের সিদ্ধান্ত।
সাবেক সঙ্গীর কাছে বারবার ফিরে যাওয়া বন্ধুকে যেভাবে সমর্থন করবেন
বন্ধুর পাশে থাকা গুরুত্বপূর্ণ, তবে নিজের মানসিক সুস্থতা ও ব্যক্তিগত সীমারেখা বজায় রাখাও জরুরি। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় কাজে আসতে পারে।
বিজ্ঞাপন
১. বন্ধু কী চায়, তা জেনে নিন
সব সময় পরামর্শ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। কখনো কখনো মানুষ শুধু নিজের কষ্টের কথা বলতে চান। তাই সরাসরি জানতে পারেন, তিনি কি আপনার পরামর্শ চান, নাকি শুধু চান আপনি তার কথা শুনুন। এতে অপ্রয়োজনীয় তর্ক ও ভুল বোঝাবুঝি কমতে পারে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
২. একই আলোচনা থেকে বিরতি নিন
বিজ্ঞাপন
একই সমস্যা নিয়ে বারবার কথা বলতে গিয়ে মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়লে তা বন্ধুকে জানান। প্রয়োজনে অন্য কোনো বিষয় নিয়ে কথা বলার বা একসঙ্গে ভিন্ন কোনো কাজ করার প্রস্তাব দিন। এতে বন্ধুত্বের মধ্যে সম্পর্কসংক্রান্ত সমস্যা ছাড়াও অন্য আনন্দের জায়গা তৈরি হবে।
৩. নিজের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট করুন
বন্ধুর যত্ন নেওয়া মানে তার সব সমস্যার সমাধানের দায়িত্ব নেওয়া নয়। আপনি যে তার পাশে থাকতে চান, কিন্তু একই পরিস্থিতি নিয়ে বারবার আলোচনা করা আপনার জন্যও কঠিন হয়ে উঠছে, তা শান্তভাবে বুঝিয়ে বলুন। নিজের মানসিক শান্তির জন্য সীমারেখা তৈরি করা স্বার্থপরতা নয়।
বিজ্ঞাপন
৪. দোষারোপ না করে পাশে থাকুন
বন্ধুকে সম্পর্ক ছাড়ার জন্য চাপ দেওয়া বা বারবার তার সিদ্ধান্তের সমালোচনা করা উল্টো তাকে আপনার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে। বরং তার অনুভূতি মন দিয়ে শুনুন এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তাকে নিজের শক্তি ও প্রয়োজন বুঝতে সাহায্য করুন।
৫. নির্যাতনের ঝুঁকি থাকলে নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিন
সম্পর্কে শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন থাকলে বিষয়টিকে শুধু প্রেমের টানাপোড়েন হিসেবে দেখা ঠিক নয়। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বস্ত ব্যক্তি, প্রশিক্ষিত কাউন্সেলর বা সংশ্লিষ্ট সহায়তা সংস্থার সাহায্য নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। তাৎক্ষণিক বিপদের আশঙ্কা থাকলে নিরাপদ স্থানে যাওয়া এবং জরুরি সহায়তা নেওয়াকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
বন্ধুকে সাহায্য করার অর্থ তার হয়ে সব সিদ্ধান্ত নেওয়া নয়। বরং এমন একটি নিরাপদ সম্পর্ক বজায় রাখা, যেখানে তিনি নিজের কথা বলতে পারেন, প্রয়োজন হলে সাহায্য চাইতে পারেন এবং একই সঙ্গে আপনি নিজের মানসিক সুস্থতাও রক্ষা করতে পারেন।
আর আপনি যদি নিজেই বারবার সাবেক সঙ্গীর কাছে ফিরে যান, তাহলে আপনার পাশে থাকা বন্ধুদের উদ্বেগ ও মানসিক চাপ বোঝার চেষ্টা করুন। তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন। কারণ সুস্থ বন্ধুত্বে যেমন সহমর্মিতা প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন পারস্পরিক সম্মান ও ব্যক্তিগত সীমারেখার স্বীকৃতি।
তথ্য সূত্র : সেল্ফ








