ভোটের অপেক্ষায় প্রায় ১৩ কোটি নাগরিক, প্রস্তুত নির্বাচন কমিশন

আগামীকাল বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত টানা ভোটগ্রহণ চলবে। একজন প্রার্থীর মৃত্যুজনিত কারণে শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচন স্থগিত হওয়ায় এবার ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনকে ঘিরে সবধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
বিজ্ঞাপন
ইসির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ জন, নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ১ হাজার ২৩২ জন। এদের মধ্য থেকে ২৯৯টি আসনে ১২ কোটি ১১ হাজার ৭৯৩ জন ভোটার ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাবেন।
বিজ্ঞাপন
নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ৬০টি। কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় একটি বড় দল নিবন্ধন স্থগিত রয়েছে। এবারের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে ৫০টি রাজনৈতিক দল। ২৯৯ আসনে মোট প্রার্থী ২ হাজার ২৮ জন। এর মধ্যে দলীয় প্রার্থী ১ হাজার ৭৫৫ জন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৭৩ জন। মোট নারী প্রার্থী রয়েছেন ৮১ জন।
বিদেশে অবস্থানরত নাগরিক, সরকারি কর্মচারী, ভোটগ্রহণ সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি এবং কারাগারে থাকা বন্দিদের জন্য পোস্টাল ব্যালটের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আগামীকাল বিকেল সাড়ে ৪টার মধ্যে সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে পৌঁছানো পোস্টাল ব্যালটগুলো গণনায় অন্তর্ভুক্ত হবে।
আজ বুধবার (১১ ফেব্রুয়ারি) রাতের মধ্যেই ব্যালট পেপারসহ প্রয়োজনীয় সব সরঞ্জাম ভোটকেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়া হবে। ভোটাররা দুটি আলাদা ব্যালটে ভোট দেবেন—সাদা ব্যালটটি সংসদ সদস্য নির্বাচনের জন্য এবং গোলাপি ব্যালটটি গণভোটের জন্য।
বিজ্ঞাপন
নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভোটকেন্দ্রের গোপন কক্ষে (মার্কিং প্লেস) কোনো ভোটার মোবাইল ফোন নিয়ে প্রবেশ করতে পারবেন না। ভোটকক্ষে ভোটার ছাড়া অন্য কারও প্রবেশ নিষিদ্ধ। ভোটাররাও কক্ষের ভেতরে মোবাইল ব্যবহার করতে পারবেন না। মোবাইল ফোন ব্যবহারে যে বিধিনিষেধ জারি করা হয়েছে তা মূলত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও নির্বাচন পরিচালনায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের জন্য প্রযোজ্য।
সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকদের জন্য জুলাই মাসে জারি করা নীতিমালা বহাল রয়েছে। তারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কেন্দ্রে প্রবেশ করে ছবি ও ভিডিও ধারণ করতে পারবেন। তবে ভোটকক্ষের ভেতরে সাক্ষাৎকার গ্রহণ বা সরাসরি সম্প্রচার করা যাবে না।
বিজ্ঞাপন
নির্বাচন কমিশন সংশ্লিষ্ট সবাইকে শান্তিপূর্ণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে ভোট সম্পন্ন করার আহ্বান জানিয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের আরেক সদস্য জানিয়েছেন, এবারের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি অতীতের তুলনায় বেশি হতে পারে। বিশেষ করে তরুণ ও নারী ভোটারদের অংশগ্রহণে ব্যাপক আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভোটের হার ৬৫ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বর্তমানে দেশে প্রায় ৪ কোটি তরুণ ভোটার রয়েছে। তাদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে সময়সীমা বাড়ানোসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। সারা দেশে প্রায় ১ লাখ ৮৭ হাজার ৬০৩ জন পুলিশ সদস্য, প্রায় ৬ লাখ আনসার সদস্য, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং প্রায় ১ লাখ সেনাসদস্য মোতায়েন রয়েছে।
নিরাপত্তা নিশ্চিতে তিন স্তরের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি কেন্দ্রে থাকবে স্ট্যাটিক ফোর্স। কেন্দ্রের বাইরে নিয়মিত টহলে থাকবে মোবাইল টিম। পাশাপাশি যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকবে স্ট্রাইকিং ফোর্স।
দেশজুড়ে মোট ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে প্রায় ৮ হাজার ৭৭০টি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ এবং ১৬ হাজার কেন্দ্রকে মধ্যম ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব কেন্দ্রে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
এবারের নির্বাচনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আওয়ামী লীগ অংশ নিচ্ছে না। বিগত তিনটি জাতীয় নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন মহলে বিতর্ক ছিল। ২০১৪ সালের নির্বাচন একতরফা হিসেবে পরিচিতি পায়, ২০১৮ সালের নির্বাচন ‘রাতের ভোট’ নামে আলোচিত হয় এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনও সমালোচনার মুখে পড়ে। পূর্ববর্তী নির্বাচনগুলোতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোটার ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেননি বলে অভিযোগ ছিল।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে তৎকালীন সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আসে। ৮ আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার শপথ নেয়। সেই সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের প্রায় দেড় বছর পর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন, যা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।








