Logo

আজ নির্বাচন ও গণভোট : মুখিয়ে আছে দেশের কোটি কোটি নাগরিক

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ০৭:৩০
আজ নির্বাচন ও গণভোট : মুখিয়ে আছে দেশের কোটি কোটি নাগরিক
ছবি: সংগৃহীত

রক্তঝরা জুলাই আন্দোলনের পর প্রথমবারের মতো দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে আজ বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি)। দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছরের অপেক্ষা, আন্দোলন-সংগ্রাম ও রাজনৈতিক অস্থিরতার পর অনুষ্ঠিত হচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং ‘রাষ্ট্র সংস্কার সংক্রান্ত সাংবিধানিক গণভোট’। ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র কাঠামো ও রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নির্ধারণে মুখিয়ে আছে দেশের কোটি কোটি নাগরিক।

বিজ্ঞাপন

নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, এবারের নির্বাচনে তরুণ ভোটাররাই সবচেয়ে বড় প্রভাবক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। মোট ভোটারের প্রায় ৪৫ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ৩৩ বছরের মধ্যে। এছাড়া দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রবাসী বাংলাদেশিরা ডাকযোগে (পোস্টাল ব্যালট) ভোট দিয়েছেন, যা নির্বাচন ব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

২৯৯ আসনে ২,০২৮ প্রার্থীর লড়াই

এবারের সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। শেরপুর-৩ আসনে প্রার্থীর মৃত্যুজনিত কারণে ভোট স্থগিত রয়েছে। সারাদেশে মোট ২ হাজার ২৮ জন প্রার্থী নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অংশ নিয়েছেন। এর মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থী ১ হাজার ৭৫৫ জন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৭৩ জন।

বিজ্ঞাপন

মোট প্রার্থীর মধ্যে নারী প্রার্থী রয়েছেন ৮৩ জন। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ২১ হাজার ৫০৬টিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব কেন্দ্র ঘিরে বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

১২ কোটির বেশি ভোটার, দায়িত্বে প্রায় আট লাখ কর্মকর্তা

বিজ্ঞাপন

তিন দফা হালনাগাদের পর এবারের নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ জন, নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ জন এবং হিজড়া ভোটার ১ হাজার ২৩২ জন।

এ বিশাল ভোটারসমষ্টির ভোটগ্রহণ পরিচালনায় ৪২ হাজার ৭৭৯ জন প্রিজাইডিং অফিসার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার রয়েছেন ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২ জন এবং পোলিং অফিসার ৪ লাখ ৯৪ হাজার ৯৬৪ জন। সব মিলিয়ে প্রায় ৭ লাখ ৮৫ হাজার ২২৫ জন নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন।

নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা

বিজ্ঞাপন

নির্বাচন উপলক্ষে সারাদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় মোতায়েন করা হয়েছে প্রায় ৯ লাখ সদস্য। এর মধ্যে সেনাবাহিনীর সদস্য সংখ্যা ১ লাখ ৩ হাজার, পুলিশ ১ লাখ ৮৭ হাজার, আনসার ৫ লাখ ৬৭ হাজার ৮৬৮ জন, বিজিবি ৩৭ হাজার ৪৫৩ জন। পাশাপাশি নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, র‌্যাব, কোস্টগার্ড ও বিএনসিসি সদস্যরাও মাঠে রয়েছেন। সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দিয়ে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যা নির্বাচনী নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও জোরদার করেছে।

নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ জানিয়েছেন, সার্বিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সন্তোষজনক। আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে ইতোমধ্যে ৩০০টি মামলা দায়ের ও ৫০০টির বেশি তদন্ত হয়েছে। ১৩ ডিসেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত ৮৫০টি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে বলে তিনি জানান।

বিজ্ঞাপন

বিদেশি নজরদারি ও আন্তর্জাতিক আগ্রহ

এবারের নির্বাচন পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশে অবস্থান করছেন ৫৪০ জন বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিক। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২২৩ জন প্রতিনিধি ছাড়াও কমনওয়েলথ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সদস্যরা উপস্থিত রয়েছেন। আল জাজিরা, বিবিসি, রয়টার্স ও এপির মতো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রায় ১৫০ জন সাংবাদিক নির্বাচনী কার্যক্রম কভার করছেন।

নির্বাচনী ইতিহাসের প্রেক্ষাপট

বিজ্ঞাপন

স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ অনুষ্ঠিত হয় দেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এরপর বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, সামরিক শাসন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন, বর্জন ও বিতর্কের মধ্য দিয়ে ১২টি সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে।

১৯৯১ সালে গণআন্দোলনের পর সংসদীয় শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন, ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন, ২০০৮ সালে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পর উচ্চ ভোটার উপস্থিতি—প্রতিটি নির্বাচনই নিজস্ব বৈশিষ্ট্য ও বিতর্ক বহন করেছে।

২০১৪ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনগুলোতে বড় দলগুলোর বর্জন, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় এবং কম ভোটার উপস্থিতি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন ‘আমি-ডামি’ নির্বাচন হিসেবে সমালোচিত হয় এবং সেই সংসদ স্থায়ী ছিল মাত্র ছয় মাস সাত দিন।

বিজ্ঞাপন

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনের মুখে তৎকালীন সরকারপ্রধান পদত্যাগ করলে সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীতে ৮ আগস্ট নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। সেই রাজনৈতিক পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় আজকের নির্বাচনকে ঘিরে তৈরি হয়েছে বিশেষ প্রত্যাশা।

ভবিষ্যৎ নির্ধারণের দিন

বিজ্ঞাপন

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেবল প্রতিনিধিত্ব নির্ধারণের ভোট নয়; একই সঙ্গে রাষ্ট্র সংস্কার সংক্রান্ত সাংবিধানিক গণভোটও অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ফলে ভোটাররা শুধু সংসদ সদস্যই নয়, দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক কাঠামো সম্পর্কেও মতামত দিচ্ছেন।

দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম, রাজনৈতিক পালাবদল ও নতুন প্রত্যাশার প্রেক্ষাপটে আজকের দিনটিকে অনেকেই নতুন সূচনার দিন হিসেবে দেখছেন। এখন দেখার বিষয়, ভোটার উপস্থিতি, নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং ফলাফল—সব মিলিয়ে এই নির্বাচন দেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় কী বার্তা বহন করে।

জেবি/এএস
Logo

সম্পাদক ও প্রকাশকঃ

মোঃ শফিকুল ইসলাম ( শফিক )

বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়ঃ ৫৭, ময়মনসিংহ লেন, ২০ লিংক রোড, বাংলামটর, ঢাকা-১০০০।

ফোনঃ 02-44615293

ই-মেইলঃ dailyjanobaninews@gmail.com; dailyjanobaniad@gmail.com

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD