জরিপ বিশ্লেষণে এগিয়ে বিএনপি, তবে অনিশ্চয়তায় ঘেরা ভোট

বাংলাদেশে ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়াল এক বিস্তৃত পূর্বাভাস প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৮ সালের পর এবারই প্রথম প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। একই সঙ্গে দেশের ইতিহাসে এই প্রথম ব্যালটে নেই আওয়ামী লীগ।
বিজ্ঞাপন
২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণআন্দোলনের মাধ্যমে তৎকালীন সরকারপ্রধান শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতি শুধু সরকার পরিবর্তন নয়, বরং দেশের রাজনৈতিক ভারসাম্যকেই পাল্টে দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। সেই পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে সাতটি বড় জাতীয় জরিপ বিশ্লেষণ করে ধারণা দেওয়া হয়েছে—আসন্ন নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে পারে। তবে জয় কত বড় হবে, তা নিয়ে রয়েছে ব্যাপক অনিশ্চয়তা।
জরিপে এগিয়ে বিএনপি, ব্যবধান নিয়ে ভিন্নমত
ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই), ইনোভিশন কনসাল্টিং, ন্যারেটিভ/আইআইএলডি, সিআরএফ/বিইপিওএসসহ বিভিন্ন সংস্থার জরিপ বিশ্লেষণে দেখা গেছে—হাসিনা সরকারের পতনের পর পরিচালিত সব জরিপেই জামায়াতে ইসলামীর চেয়ে বিএনপি এগিয়ে।
বিজ্ঞাপন
তবে ব্যবধান একেক জরিপে একেক রকম। যেমন ন্যারেটিভ কনসোর্টিয়ামের জরিপে দুই দলের ব্যবধান মাত্র ১.১ শতাংশ, আবার ইনোভিশনের সাম্প্রতিক প্যানেল স্টাডিতে বিএনপি এগিয়ে ২১.৮ শতাংশ পয়েন্টে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এ পার্থক্য পদ্ধতিগত। ন্যারেটিভের জরিপটি ২৯৫টি আসনের ২২ হাজার ১৭৪ জনের ওপর পরিচালিত একটি ‘স্ন্যাপশট’। অন্যদিকে ইনোভিশন পূর্বে সাক্ষাৎকার নেওয়া ৫ হাজার ১৪৭ জনের সঙ্গে পুনরায় যোগাযোগ করে সময়ের সঙ্গে মতামতের পরিবর্তন বিশ্লেষণ করেছে—যা জনমতের গতিপ্রকৃতি বোঝার ক্ষেত্রে ভিন্ন চিত্র দেয়।
বিজ্ঞাপন
আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক: কার দিকে ঝুঁকছে?
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—আওয়ামী লীগের ঐতিহ্যগত ভোটাররা কার দিকে যাচ্ছেন। অতীতে দলটি মোট ভোটের ৩৫ থেকে ৪৮ শতাংশ পর্যন্ত পেত। এখন দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় প্রায় ৪ কোটি ভোটার নতুন রাজনৈতিক বিকল্প খুঁজছেন।
সিআরএফ/বিইপিওএস জরিপের তথ্য অনুযায়ী, এ ভোটের প্রায় অর্ধেক বিএনপির দিকে যাচ্ছে। এটিই বিএনপিকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে এগিয়ে দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
তবে জামায়াতও এ ভোটের একটি বড় অংশ আকর্ষণ করছে। জরিপ বলছে, আওয়ামী লীগের সাবেক ভোটারদের প্রায় ৩০ শতাংশ ইসলামপন্থি কোনো দলকে ভোট দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। বিশ্লেষণে বলা হয়, স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক আচরণ, প্রতিক্রিয়াশীল মনোভাব বা কৌশলগত ভোট—সব মিলিয়ে এ প্রবণতা তৈরি হতে পারে।
এফপিটিপি পদ্ধতি: আসন ব্যবধানে বড় পার্থক্য
বাংলাদেশের ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট (এফপিটিপি) ব্যবস্থায় ৩০০ একক আসনে সর্বাধিক ভোট পাওয়া প্রার্থী জয়ী হন। এতে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা দল তুলনামূলকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বিজ্ঞাপন
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যদি জাতীয়ভাবে জামায়াত বিএনপির চেয়ে মাত্র ৩–৫ শতাংশ ভোটে পিছিয়েও থাকে, তবুও আসন ব্যবধান ৬০ থেকে ১০০ পর্যন্ত হতে পারে। কারণ বিএনপির সমর্থন সারা দেশে ছড়িয়ে রয়েছে, আর জামায়াতের ভোট নির্দিষ্ট অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত।
ঐতিহাসিকভাবে জামায়াত কখনো ১৮টির বেশি আসন পায়নি এবং ভোটশেয়ার ১২ শতাংশ অতিক্রম করেনি। অথচ বর্তমান কিছু জরিপে তাদের সমর্থন ২৯–৩৪ শতাংশ বলা হচ্ছে—যা হয় রাজনৈতিক বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত, নয়তো কিছু জরিপে অতিমূল্যায়নের প্রতিফলন।
বিজ্ঞাপন
ফল নির্ধারণে তিন বড় সমীকরণ
১. বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী- মনোনয়ন না পেয়ে বিএনপির ৯২ জন নেতা ৭৯টি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন। অন্তত ৪৬টি আসনে তাদের শক্তিশালী নিজস্ব ভোটব্যাংক রয়েছে।
বিশ্লেষণ বলছে, যেখানে লড়াই সরাসরি বিএনপি বনাম জামায়াত, সেখানে বিএনপি সুবিধাজনক অবস্থায়। কিন্তু ত্রিমুখী লড়াই হলে মাত্র ৩৫ শতাংশ ভোট পেয়েও জামায়াত জিততে পারে। এ বিদ্রোহীদের কারণে বিএনপি ১৫–৩০টি আসন হারাতে পারে বলে ধারণা।
বিজ্ঞাপন
২. তরুণ ভোটারদের উপস্থিতি- বর্তমানে মোট ভোটারের ৪৪ শতাংশই জেন-জি বা তরুণ প্রজন্ম—সংখ্যায় প্রায় ৫ কোটি ৬০ লাখ। প্রথমবার ভোট দিতে যাওয়া তরুণদের মধ্যে ৩৭.৪ শতাংশ জামায়াতের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন বলে এক জরিপে উঠে এসেছে।
যদি তরুণদের ভোটদানের হার জাতীয় গড়ের চেয়ে ১০–১৫ শতাংশ বেশি হয়, তবে জামায়াত উল্লেখযোগ্যভাবে লাভবান হবে। আর তারা যদি কম উপস্থিত থাকে, তবে বিএনপির সুবিধা বাড়বে।
৩. দোদুল্যমান ভোটার- বিভিন্ন জরিপে ১৫–৩৫ শতাংশ ভোটার এখনো সিদ্ধান্তহীন। ন্যারেটিভ জরিপে এ হার ১৭ শতাংশ। এদের একটি বড় অংশ রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর আস্থা হারিয়েছে।
বিজ্ঞাপন
এই ভোটাররা যদি সমানভাবে ভাগ হন, বিএনপির লিড বজায় থাকবে। কিন্তু যদি ২:১ অনুপাতে জামায়াতের দিকে ঝুঁকে পড়েন, তবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নাটকীয়ভাবে তীব্র হতে পারে।
আসন সম্ভাবনার চিত্র
বিজ্ঞাপন
মোট আসন: ৩০০ এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতার সীমা: ১৫১।
সম্ভাব্য পরিসর- বিএনপি ও জোট: ১৫৫–২১৫, জামায়াত ও এনসিপি: ৫৫–১১০, জাতীয় পার্টি: ৫–১৮, ইসলামী আন্দোলন: ২–১০ এবং অন্যান্য/স্বতন্ত্র: ১০–৩৫।
কেন্দ্রীয় প্রাক্কলন- বিএনপি ও জোট: ১৮৫, জামায়াত ও এনসিপি: ৮০, জাতীয় পার্টি: ১০, ইসলামী আন্দোলন: ৫ এবং অন্যান্য/স্বতন্ত্র: ২০।
বিজ্ঞাপন
চার সম্ভাব্য চিত্র
১. বিএনপির নিরঙ্কুশ জয় (সম্ভাবনা ৫০%) : ভোটার উপস্থিতি ৭০ শতাংশের বেশি হলে এবং আবেগী ভোট বিএনপির দিকে গেলে দলটি ১৮৫–২১৫ আসন পেতে পারে।
২. সামান্য ব্যবধানে জয় (সম্ভাবনা ২০%) : বিদ্রোহী ও তৃণমূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসন কমে ১৫৫–১৮৫-এ নামতে পারে।
৩. ঝুলন্ত সংসদ (সম্ভাবনা ২০%) : বিএনপি ১৩০–১৫৫ ও জামায়াত ৯০–১১০ আসন পেলে জোট-আলোচনার রাজনীতি শুরু হবে।
৪. জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোটের জয় (সম্ভাবনা ১০%) : তরুণ ভোটের ঢল ও বিদ্রোহীদের ব্যাপক প্রভাব থাকলে বিএনপি ১৩০-এর নিচে নামতে পারে।
দ্য নিউইয়র্ক এডিটোরিয়ালের বিশ্লেষণে মূল পূর্বাভাস—বিএনপি প্রায় ১৮৫ আসন পেয়ে সরকার গঠন করতে পারে। অন্যদিকে জামায়াত তাদের ইতিহাসের সেরা ফল করে ৬০–১০০ আসনের মধ্যে পেতে পারে এবং প্রধান বিরোধী শক্তি হয়ে উঠতে পারে।
তবে বিশ্লেষণের ভাষায়, প্রশ্ন কে জিতবে তা নয়—বরং ব্যবধান কত বড় হবে, সেটিই এখন মূল আলোচ্য। ১৭ শতাংশ দোদুল্যমান ভোটার, বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা এবং তরুণ ভোটারদের অংশগ্রহণ—এই তিন উপাদানই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ।
১২ কোটি ৮০ লাখ ভোটারের রায় শুধু সরকার নয়, আগামী এক প্রজন্মের রাজনৈতিক গতিপথ ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। তথ্য-উপাত্ত বিএনপির দিকে ইঙ্গিত দিলেও, চূড়ান্ত ফলাফলের আগে অনিশ্চয়তার জায়গাটি এখনো বড়।








