ঈদযাত্রায় ঘরমুখো মানুষের গলার কাঁটা দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুট

আসন্ন ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে যাত্রী ও যানবাহনের বাড়তি চাপ সামাল দেওয়া নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। ফেরিঘাটের স্বল্পতা, সীমিত সক্ষমতা, ফেরির সংখ্যা কম থাকা, সংযোগ সড়কের বেহাল অবস্থা এবং ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে ঈদযাত্রায় এই রুটে চলাচলকারী যাত্রী ও চালকদের ভোগান্তিতে পড়তে হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিজ্ঞাপন
ঘাট সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সাধারণ সময়ের তুলনায় ঈদের আগে ও পরে এই নৌরুটে যাত্রী ও যানবাহনের সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। কিন্তু সেই তুলনায় ফেরির সংখ্যা বা ঘাটের সক্ষমতা বাড়ানো হয়নি। ফলে বাড়তি চাপ সামাল দেওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
জানা গেছে, পদ্মা সেতু চালুর পর দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে যানবাহনের চাপ আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে। তবে ঈদের সময় এখনও এই রুটে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়। এরই মধ্যে পদ্মা নদীর পানি কমে যাওয়ায় বিভিন্ন স্থানে ডুবোচর দেখা দিয়েছে, যা ফেরি চলাচলে অতিরিক্ত ঝুঁকি তৈরি করছে।
দৌলতদিয়া প্রান্তে মোট সাতটি ফেরিঘাট থাকলেও বর্তমানে সচল রয়েছে মাত্র তিনটি—৩, ৪ ও ৭ নম্বর ঘাট। বাকি চারটি ঘাট দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। সচল থাকা ঘাটগুলোর পন্টুনের নিচে পানির স্তর কমে যাওয়ায় সংযোগ সড়ক অনেকটা উঁচু হয়ে গেছে। এতে করে যানবাহন ওঠানামা করতে বেশ সমস্যার মুখে পড়ছে।
বিজ্ঞাপন
মাঝেমধ্যেই দেখা যাচ্ছে, পন্টুন থেকে সংযোগ সড়কে উঠতে গিয়ে বিভিন্ন যানবাহন আটকে যাচ্ছে। ফলে ঘাটে দীর্ঘ সময় ধরে ফেরি ওঠানামা বন্ধ থাকে। অনেক ক্ষেত্রে আটকে পড়া যানবাহন সরাতে র্যাকার ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে পণ্যবাহী ট্রাকচালকদের গুনতে হচ্ছে বাড়তি খরচ।
সরেজমিনে দৌলতদিয়া ঘাট এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সচল থাকা তিনটি ঘাটের আটটি পকেট দিয়ে যানবাহন লোড ও আনলোড করা হচ্ছে। তবে মূল সড়ক থেকে পন্টুনে যাওয়ার সংযোগ সড়কগুলোর অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। ধুলোবালিতে পুরো এলাকা ঢেকে যাচ্ছে, যার কারণে যাত্রী ও চালকদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
৭ নম্বর ফেরিঘাটে দেখা যায়, পন্টুন থেকে সংযোগ সড়কটি অনেকটা খাড়া হয়ে আছে। সেখানে প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে দুটি তেলবাহী লরি পন্টুন থেকে উঠতে না পেরে আটকে ছিল। এতে দীর্ঘ সময় ধরে ওই ঘাটে ফেরি ওঠানামা বন্ধ থাকে।
ফেরিঘাটে থাকা কয়েকজন যাত্রী জানান, সাতটি ঘাটের মধ্যে মাত্র তিনটি চালু থাকায় ঈদের সময় পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তাদের মতে, যদি সচল থাকা ঘাটগুলোর একটি কোনো কারণে অচল হয়ে যায়, তাহলে যাত্রী ও যানবাহনের ভোগান্তি বহুগুণ বেড়ে যাবে। এ ছাড়া ঈদের সময় ঘাট এলাকা থেকে বাস ও ব্যাটারিচালিত মাহেন্দ্রের ভাড়া বেড়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
রয়েল এক্সপ্রেস বাসের হেলপার সবুজ সরদার বলেন, ঈদের সময় এই রুটে যানবাহন ও যাত্রীর চাপ বেড়ে যায়। কিন্তু ঘাটের বর্তমান পরিস্থিতি সেই চাপ সামাল দেওয়ার মতো নয়। উভয় প্রান্তেই ঘাট সংকট রয়েছে এবং সচল ঘাটগুলোর অবস্থাও খুব একটা ভালো নয়। এ কারণেই অনেক পরিবহন এখন পদ্মা সেতু হয়ে চলাচল করতে আগ্রহী।
বিজ্ঞাপন
৭ নম্বর ফেরিঘাট এলাকায় পেয়ারা বিক্রি করেন বরকত শেখ। তিনি বলেন, তিনটি ঘাট চালু থাকলেও ঈদের সময় চাপ সামলানো কঠিন হবে। যদি কোনো একটি ঘাট বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে বাকি দুইটি ঘাট দিয়ে এত যানবাহন পারাপার করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। তখন ফেরি এলেও ঘাট না পাওয়ায় দীর্ঘ জট তৈরি হতে পারে।
স্থানীয় এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ঈদের সময় ঘাট এলাকায় ছিনতাইয়ের আশঙ্কাও থাকে। তার অভিযোগ, বর্তমানে ঘাট এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বল এবং বেশিরভাগ সিসি ক্যামেরা অচল। একই সঙ্গে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিষয়েও প্রশাসনের কঠোর নজরদারির অভাব রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
বিজ্ঞাপন
এদিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, ঈদ উপলক্ষে যাত্রী ও যানবাহন পারাপার নির্বিঘ্ন করতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। বিআইডব্লিউটিসির দৌলতদিয়া ঘাট কার্যালয়ের সহকারী মহাব্যবস্থাপক মো. সালাহউদ্দিন জানান, ঈদের সময় এই নৌরুটে মোট ১৬টি ফেরি চলাচল করবে। বর্তমানে সচল থাকা ৩, ৪ ও ৭ নম্বর ঘাট ব্যবহার করেই যানবাহন ও যাত্রী পারাপারের ব্যবস্থা করা হবে।
তিনি বলেন, ঈদের আগে এবং ঈদ-পরবর্তী সময়ে বহরে থাকা ফেরিগুলো দিয়ে যাতে নির্বিঘ্নে পারাপার করা যায়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিষয়ে পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনজুর মোরশেদ জানান, ঈদ উপলক্ষে দৌলতদিয়া ঘাট এলাকায় যাত্রী ও যানবাহনের চাপ বেড়ে যায়। এই সময় ঘরমুখো মানুষ ও ঈদের পর কর্মস্থলে ফেরা যাত্রীদের নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, ঘাট এলাকায় পুলিশের মোবাইল পেট্রল, ফিক্সড পেট্রল এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থানে চেকপোস্ট বসানো হবে। পাশাপাশি ইউনিফর্মধারী ও সাদা পোশাকের পুলিশ সদস্য এবং গোয়েন্দা পুলিশের সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। নৌপুলিশও ঘাট এলাকায় নিরাপত্তা জোরদারে কাজ করবে।







