Logo

লাইনেই কাটছে দিন-রাত: তেল সংকটে জিম্মি জনজীবন

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১৫ এপ্রিল, ২০২৬, ১৫:৫৬
লাইনেই কাটছে দিন-রাত: তেল সংকটে জিম্মি জনজীবন
ছবি: সংগৃহীত

রাজধানী ঢাকাজুড়ে জ্বালানি তেলের সংকট ক্রমশ তীব্র আকার ধারণ করছে। পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেলের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও অনেকে তেল পাচ্ছেন না। ফলে প্রতিদিন শত শত কর্মঘণ্টা অপচয় হচ্ছে, স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে এবং নগরজীবনের গতি স্থবির হয়ে পড়ছে।

বিজ্ঞাপন

বুধবার (১৫ এপ্রিল) রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রায় প্রতিটি পেট্রোল পাম্পে বাস, মাইক্রোবাস, প্রাইভেট কার, অ্যাম্বুলেন্স ও মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি। কেউ আগের রাত থেকে, কেউ ভোররাত থেকে, আবার কেউ সকালে এসে লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন। তবুও তেল পাওয়ার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

তেলের লাইনে চরম ভোগান্তি, ঢাকায় ফুয়েল পাস চালু

বিজ্ঞাপন

জ্বালানি তেল বিতরণে স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা আনতে ঢাকায় পরীক্ষামূলকভাবে মোটরসাইকেল চালকদের জন্য ‘ফুয়েল পাস’ অ্যাপ ও ওয়েবসাইট চালু করা হয়েছে। এই ব্যবস্থায় নিবন্ধন করে ব্যবহারকারীরা একটি ইউনিক কিউআর কোড পাচ্ছেন, যা নির্দিষ্ট পেট্রোল পাম্পে স্ক্যান করে তেল সংগ্রহ করা যায়।

ফুয়েল পাসধারী মোটরসাইকেল আরোহীরা সর্বোচ্চ ১ হাজার টাকার জ্বালানি তেল নিতে পারছেন। তবে সাধারণ মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীরা পাচ্ছেন সর্বোচ্চ ৫০০ টাকার তেল।

রায়েরবাজারের বাসিন্দা আতাউর রহমান ভোরে ফজরের নামাজ শেষ করে মোটরসাইকেলে তেল নিতে বের হয়েছিলেন। শাহবাগের একটি পাম্পে পৌঁছানোর আগেই দেখেন লাইন আজিজ সুপার মার্কেট ছাড়িয়ে পরীবাগ পর্যন্ত চলে গেছে। ডিপো থেকে তেলের গাড়ি না আসায় সকাল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত সরবরাহ শুরুই হয়নি। সোয়া ১১টার দিকে তেল দেওয়া শুরু হলেও তখনও তিনি লাইনে অপেক্ষা করছিলেন।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, ভোরে কাজে যাওয়ার জন্য বের হয়েছিলাম, কিন্তু দুপুরেও যেতে পারব কি না তা অনিশ্চিত। সবকিছুই এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেছে।

নীলক্ষেত, কাঁটাবন, ঢাকা কলেজ, শাহবাগ ও রাজারবাগ এলাকায়ও একই চিত্র দেখা গেছে। দীর্ঘ লাইনের কারণে অনেক সড়ক আংশিকভাবে দখল হয়ে তীব্র যানজট সৃষ্টি হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

মধুবাগের বাসিন্দা জাহিদ হোসেন বলেন, গতকাল কয়েকটি পাম্প ঘুরেও তেল পাননি। আজ আবার লাইনে দাঁড়িয়েছেন। প্রচণ্ড রোদে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।

ঢাকা-গাজীপুর রুটের ভিআইপি পরিবহনের বাসচালক চাঁন মিয়া নীলক্ষেত মোড়ে বাস রেখে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি জানান, দুপুরের পর থেকে তেল দেওয়া শুরু হবে বলে শুনেছেন, তাই সিরিয়াল দিয়ে অপেক্ষা করছেন। বাস সবসময় চালাতে না পারায় আয়ও কমে গেছে।

ইস্কাটনের হলি ফ্যামিলি হাসপাতালের সামনে অ্যাম্বুলেন্সচালক কামাল হোসেন বলেন, তেল সংকটের কারণে মুমূর্ষু রোগীদের নিয়ে দূরের পথে যেতে সাহস পাচ্ছেন না। কোথাও কোথাও সিএনজি গ্যাসেরও সংকট দেখা দিয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক কারণে তেল সংকট, জনজীবনে চরম ভোগান্তি

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আন্তর্জাতিক অস্থিরতা—বিশেষ করে ইরান-ইসরাইল যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে। এর ফলে দেশে ডিপো থেকে তেল সরবরাহ অনিয়মিত হয়ে পড়েছে। সময়মতো ও পর্যাপ্ত জ্বালানি না আসায় পাম্পগুলো গ্রাহকদের কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারছে না।

বর্তমান পরিস্থিতিতে জনজীবনে বহুমাত্রিক চাপ তৈরি হয়েছে—ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে কর্মঘণ্টা নষ্ট, পণ্য ও যাত্রী পরিবহন ব্যাহত, জরুরি যানবাহন আটকে পড়ছে, তীব্র যানজট, গরমে অসুস্থতা এবং ভোগান্তি চরম আকার ধারণ করেছে।

বিজ্ঞাপন

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, সংকট দীর্ঘায়িত হলে জাতীয় উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাবে, পরিবহন খাতের ধীরগতিতে সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হবে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে পারে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা ও জরুরি সেবাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. বদরূল ইমাম বলেন, জ্বালানি সংকটের এই সমস্যা শুধু বাংলাদেশে নয়, এটি বৈশ্বিক সমস্যা। এখন জ্বালানি সাশ্রয়ী হওয়া একটি বড় উপায়, যার মাধ্যমে কিছুটা স্বস্তি আসতে পারে। জ্বালানি ব্যবহারে কৃচ্ছ্রতা সাধন করা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে। এছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই।

বিজ্ঞাপন

তিনি আরও বলেন, চলমান সংকটে জ্বালানি তেলের অবৈধ মজুত করা অপরাধ। সরকারের আরও কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে। কিছু অবৈধ ব্যবসায়ী অবৈধভাবে মজুত করে উচ্চমূল্যে বিক্রি করছে, যা সাধারণ মানুষকে ভোগান্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

ঢাকায় জ্বালানি তেলের সংকটে চরম দুর্ভোগ, লাইনে অপেক্ষায় হাজারো মানুষ

রাজধানীতে তেলের সংকটের কারণে পেট্রোল পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন পড়েছে। অনেকে ভোর থেকে অপেক্ষা করেও তেল পাচ্ছেন না। ফলে কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, যানজট বাড়ছে এবং জরুরি সেবা ব্যাহত হচ্ছে। সরকার মোটরসাইকেলের জন্য ফুয়েল পাস চালু করলেও সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমছে না। বিশেষজ্ঞরা জ্বালানি সাশ্রয় ও অবৈধ মজুতের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD