একনেকে অনুমোদন পেল ৩৩ হাজার কোটি টাকার পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প

দীর্ঘদিনের আলোচনার পর অবশেষে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পেয়েছে বহুল প্রত্যাশিত পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প। নতুন সরকারের দ্বিতীয় একনেক বৈঠকে প্রকল্পটির প্রথম ধাপের অনুমোদন দেওয়া হয়। এ ধাপে ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৩ হাজার ৪৭৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকা।
বিজ্ঞাপন
বুধবার (১৩ মে) সচিবালয়ের মন্ত্রিসভা কক্ষে অনুষ্ঠিত একনেক সভায় প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারম্যান তারেক রহমান সভাপতিত্ব করেন। সভায় মোট ১৬টি উন্নয়ন প্রকল্প উপস্থাপন করা হয়, যার মধ্যে অন্যতম ছিল পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প। সব মিলিয়ে এসব প্রকল্পে প্রায় ২৪ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকার ব্যয়ের প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, মূলত ফারাক্কা বাঁধের কারণে শুষ্ক মৌসুমে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে যে তীব্র পানিসংকট তৈরি হয়, তা মোকাবিলার লক্ষ্যেই পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘ কয়েক দশকের সমীক্ষা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও সম্ভাব্যতা যাচাই শেষে প্রকল্পটি চূড়ান্ত অনুমোদনের মুখ দেখে।
বিজ্ঞাপন
গত মাসে প্রকল্পটি বর্তমান সরকারের প্রথম একনেক সভায় উপস্থাপনের প্রস্তুতি নেওয়া হলেও শেষ মুহূর্তে তা প্রত্যাহার করা হয়েছিল। পরে প্রয়োজনীয় পর্যালোচনা শেষে এবার অনুমোদন দেওয়া হয়।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে নেওয়া ‘পদ্মা ব্যারাজ (প্রথম পর্যায়)’ প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো)। চলতি বছর থেকে শুরু হয়ে ২০৩৩ সালের জুনের মধ্যে এর কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রকল্পটির মোট সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৫০ হাজার ৪৪৩ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। তবে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি) ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সুপারিশ করায় প্রথম ধাপের জন্য প্রায় ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকার প্রস্তাব করা হয়। পুরো অর্থায়ন সরকারি তহবিল থেকে আসবে।
বিজ্ঞাপন
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ব্যারাজ নির্মাণের মাধ্যমে পদ্মা নদীতে প্রায় দুই হাজার ৯০০ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে। এই সংরক্ষিত পানি ব্যবহার করে দেশের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ নদীর প্রবাহ পুনরুজ্জীবিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
নদীগুলো হলো—হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী। শুষ্ক মৌসুমে এসব নদীতে প্রায় ৮০০ কিউসেক মিটার পানি সরবরাহ করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রথম ধাপে রাজবাড়ীর পাংশা এলাকায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ করা হবে। এতে থাকবে— ৭৮টি স্পিলওয়ে, ১৮টি আন্ডার স্লুইসগেট, মাছ চলাচলের জন্য দুটি ফিশ পাস, একটি নেভিগেশন লক এবং গাইড ও সংযোগ বাঁধ।
বিজ্ঞাপন
এছাড়া প্রকল্পের আওতায় গড়াই অফ-টেক এলাকায় ১৫টি স্পিলওয়ে, ফিশ পাস, নেভিগেশন লক এবং ৩৬ দশমিক ৬ মেগাওয়াট ক্ষমতার জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে।
চন্দনা অফ-টেকে চারটি এবং হিসনা অফ-টেকে পাঁচটি স্পিলওয়ে নির্মাণের পাশাপাশি প্রায় ১৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ অ্যাফ্লাক্স বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
প্রকল্প প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, পদ্মা ব্যারাজ ও গড়াই অফ-টেক এলাকায় স্থাপিত জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে মোট ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এছাড়া প্রথম ধাপে ১৩৫ দশমিক ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ গড়াই-মধুমতি নদী এবং ২৪৬ দশমিক ৪৬ কিলোমিটার হিসনা নদী ব্যবস্থার ড্রেজিং ও পুনঃখননের কাজও সম্পন্ন করা হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হিসনা অফ-টেক গঙ্গা নদী ব্যবস্থার পানিপ্রবাহ পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে পলি জমা কমানো এবং শুষ্ক মৌসুমে পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতেও এটি কার্যকর হবে।
বিজ্ঞাপন
প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে দেশের কৃষি ও মৎস্য খাতে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রস্তাবনায় উল্লেখ করা হয়েছে, প্রতি বছর প্রায় ২৩ লাখ ৯০ হাজার টন অতিরিক্ত ধান উৎপাদন এবং প্রায় দুই লাখ ৩৪ হাজার টন মৎস্য উৎপাদন বাড়তে পারে।
এছাড়া প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প দেশের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৩৭ শতাংশ এলাকাকে প্রভাবিত করবে। এটি চারটি বিভাগের ২৬ জেলার ১৬৩ উপজেলায় বিস্তৃত।
প্রথম ধাপ বাস্তবায়নের মাধ্যমে খুলনা, ঢাকা, রাজশাহী ও বরিশাল বিভাগের অন্তত ১৯ জেলা ও ১২০ উপজেলা সরাসরি সুবিধা পাবে। এর মধ্যে রয়েছে—কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, মাগুরা, যশোর, নড়াইল, বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, পাবনা, রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও পিরোজপুর।
দ্বিতীয় ধাপে অতিরিক্ত অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতী নদী ব্যবস্থার পুনরুদ্ধারের কাজ করা হবে।
বিজ্ঞাপন
পদ্মার ওপর ব্যারাজ নির্মাণের ধারণা নতুন নয়। প্রায় ২৫ বছর আগে তৎকালীন বিএনপি সরকার এ উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল। ১৯৬০ সাল থেকে ২০০০ সালের মধ্যে সম্ভাব্য স্থান নির্ধারণে চারটি সমীক্ষা পরিচালিত হয়।
পরবর্তীতে ২০০৫ সালে বিস্তারিত সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু হয় এবং দেশি-বিদেশি পরামর্শকদের সমন্বয়ে গঠিত একটি কনসোর্টিয়াম ২০১৩ সালে সেই সমীক্ষা সম্পন্ন করে। দীর্ঘ সময়ের পরিকল্পনা ও মূল্যায়নের পর এবার প্রকল্পটি বাস্তবায়নের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পেল।








