বেনজীর আহমেদকে দুবাই থেকে যেভাবে দেশে ফিরিয়ে আনবে সরকার

সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ আটক হওয়ার পর তাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সরকার জানিয়েছে, ইন্টারপোলের সহযোগিতায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং এখন প্রত্যর্পণের (এক্সট্রাডিশন) আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম সম্পন্ন করার প্রস্তুতি চলছে।
বিজ্ঞাপন
রবিবার (১৪ জুন) স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বেনজীর আহমেদের আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। পরে এক সংবাদ সম্মেলনে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আকতারুল ইসলাম জানান, সাবেক এই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বর্তমানে দুদকের দায়ের করা ছয়টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে একটি মামলায় অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে এবং আরেকটি মামলার বিচার কার্যক্রম ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ের দিকে বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসে। অভিযোগগুলোর তদন্ত শুরু হওয়ার পর তিনি দেশ ছেড়ে বিদেশে চলে যান। এরপর তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের করা হয় এবং তদন্ত কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হয়।
বিজ্ঞাপন
সরকারি সূত্রগুলো বলছে, ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে তাকে গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে ইন্টারপোলের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারির উদ্যোগ নেওয়া হয়। দুদকের আবেদনের পর বাংলাদেশ পুলিশের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) ইন্টারপোলের কাছে প্রয়োজনীয় আবেদন পাঠায়। সেই প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় আন্তর্জাতিক আইনশৃঙ্খলা সংস্থাগুলোর সহযোগিতায় তাকে দুবাইয়ে শনাক্ত ও আটক করা সম্ভব হয়েছে।
দুদকের তদন্তে আরও উঠে এসেছে, সরকারি দায়িত্বে থাকা অবস্থায় বেনজীর আহমেদ সরকারি পাসপোর্ট ব্যবহার না করে সাধারণ নাগরিক হিসেবে একাধিক পাসপোর্ট গ্রহণ করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে জালিয়াতির অভিযোগও তদন্তাধীন রয়েছে।
দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা জানান, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দায়ের করা পাঁচটি মামলায় বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ৭৬ কোটিরও বেশি টাকার অবৈধ সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব মামলার তদন্ত ও বিচার কার্যক্রমের স্বার্থে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
জাতীয় সংসদে দেওয়া বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, গত ১২ জুন বাংলাদেশ পুলিশ দুবাই কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে একটি আনুষ্ঠানিক বার্তা পেয়েছে। ওই বার্তায় এনসিবি আবুধাবি জানিয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফেডারেল আইন অনুযায়ী গ্রেপ্তারের তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ আবেদন জমা দিতে হবে।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪২০, ৪৬৭ ও ৪৬৮ ধারাসহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলা বিচারাধীন রয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ পাসপোর্ট অর্ডার, ১৯৭৩-এর ১১ ধারার অধীনেও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে এনসিবি ঢাকা আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, রেড নোটিশ-সংক্রান্ত সমন্বয় এবং গ্রেপ্তারের পরবর্তী আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, দুদক ইতোমধ্যে মামলার প্রয়োজনীয় নথিপত্র, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, তদন্ত প্রতিবেদন এবং অন্যান্য আইনি দলিল প্রস্তুত করেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পাওয়ার পর কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে প্রত্যর্পণ আবেদন সংযুক্ত আরব আমিরাতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে। এরপর দেশটির আইন অনুযায়ী বিচারিক ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে তাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার পথ সুগম হবে।
বিজ্ঞাপন
বেনজীর আহমেদ বাংলাদেশের পুলিশ প্রশাসনের অন্যতম আলোচিত কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি ২০২০ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পুলিশের সর্বোচ্চ পদ আইজিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার এবং র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) মহাপরিচালকের দায়িত্বও পালন করেছেন।
তবে তার কর্মজীবনের শেষ দিকে বিভিন্ন বিতর্ক ও অভিযোগ সামনে আসে। বিশেষ করে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র র্যাবের কয়েকজন বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। সেই নিষেধাজ্ঞার তালিকায় বেনজীর আহমেদের নামও অন্তর্ভুক্ত ছিল। সে সময় তিনি বাংলাদেশের পুলিশপ্রধান হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন।
বিজ্ঞাপন
বিশ্লেষকদের মতে, দুবাইয়ে তার আটক হওয়ার ঘটনা শুধু একটি আইনি পদক্ষেপ নয়; বরং এটি আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে দুর্নীতি ও আর্থিক অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে। এখন নজর থাকবে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া কত দ্রুত সম্পন্ন হয় এবং দেশে ফেরার পর তার বিরুদ্ধে চলমান মামলাগুলোর বিচারিক অগ্রগতি কোন দিকে এগোয়।








