Logo

বেনজীরকে দেশে ফেরাতে দুবাইয়ে মামলার নথিপত্র পাঠাচ্ছে দুদক

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১৫ জুন, ২০২৬, ১৮:২১
বেনজীরকে দেশে ফেরাতে দুবাইয়ে মামলার নথিপত্র পাঠাচ্ছে দুদক
ছবি: সংগৃহীত

দুবাইয়ে আটক সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় আইনি ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে তার বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর নথি, তদন্ত প্রতিবেদন, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চূড়ান্ত করা হচ্ছে। এসব নথি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কূটনৈতিক চ্যানেলে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে।

বিজ্ঞাপন

সোমবার (১৫ জুন) দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আকতারুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে চলমান দুর্নীতি ও অন্যান্য মামলার নথিপত্র প্রস্তুতের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে। আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে প্রয়োজনীয় দলিলপত্র কূটনৈতিক মাধ্যমে প্রেরণ করা হবে।

এদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিভিত্তিক ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে যে, ইন্টারপোলের সহযোগিতায় বেনজীর আহমেদকে আটক করা হয়েছে। এ বিষয়ে এনসিবি আবুধাবি বাংলাদেশের এনসিবির কাছে একটি আনুষ্ঠানিক বার্তাও পাঠিয়েছে বলে জানা গেছে।

বিজ্ঞাপন

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ‘আন্তর্জাতিক বিচারিক সহযোগিতা বিষয়ক’ ফেডারেল আইন অনুযায়ী গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তির প্রত্যর্পণ চাইলে বাংলাদেশকে ৩০ দিনের মধ্যে আনুষ্ঠানিক আবেদন করতে হবে। এই আবেদন অবশ্যই কূটনৈতিক মাধ্যমে পাঠাতে হবে এবং তার সঙ্গে প্রয়োজনীয় সব আইনি নথিপত্র সংযুক্ত করতে হবে।

প্রত্যর্পণ আবেদনের সঙ্গে যেসব তথ্য পাঠাতে হবে তার মধ্যে রয়েছে— অভিযুক্ত ব্যক্তির পরিচয়, জাতীয়তা, ঠিকানা, ছবি ও অন্যান্য শনাক্তকারী তথ্য, তার বিরুদ্ধে প্রযোজ্য আইন, অপরাধের বিবরণ, সম্ভাব্য শাস্তি, আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, তদন্ত প্রতিবেদন এবং আদালতের সংশ্লিষ্ট আদেশ।

যদি কোনো মামলায় আদালতের রায় হয়ে থাকে, তাহলে সেই রায়ের সত্যায়িত কপিও জমা দিতে হবে। পাশাপাশি অপরাধ সংঘটনের স্থান, অভিযোগের প্রকৃতি এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনা নির্দিষ্ট অভিযোগের তথ্যও যুক্ত করতে হবে। আরবি ভাষায় অনূদিত এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সত্যায়িত নথিপত্র জমা দেওয়ার বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেছে আমিরাত কর্তৃপক্ষ।

বিজ্ঞাপন

দুদক সূত্র জানায়, বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে বর্তমানে মোট ছয়টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এর মধ্যে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, সম্পদের তথ্য গোপন, পাসপোর্ট জালিয়াতি এবং অর্থ পাচারের অভিযোগ রয়েছে। এসব মামলার মধ্যে কয়েকটিতে তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে এবং অন্তত একটি মামলায় অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে।

ইন্টারপোলের মাধ্যমে তাকে গ্রেপ্তারের উদ্যোগ শুরু হয় ২০২৫ সালের প্রথম দিকে। দুদকের আবেদনের ভিত্তিতে বাংলাদেশ পুলিশের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো ইন্টারপোলের কাছে রেড নোটিশ জারির অনুরোধ জানায়। পরে ২০২৫ সালের ১০ এপ্রিল ইন্টারপোল বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে রেড নোটিশ জারি করে।

বিজ্ঞাপন

দুদকের অনুসন্ধানে উঠে আসে, সম্পদের হিসাব জমা দেওয়ার সময় বেনজীর আহমেদ ঘোষিত সম্পদের বাইরে বিপুল পরিমাণ সম্পদের তথ্য গোপন করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তদন্তে দাবি করা হয়, তিনি কয়েক কোটি টাকার সম্পদের উৎস ব্যাখ্যা করতে ব্যর্থ হয়েছেন এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সম্পদ আয়বহির্ভূত হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

এছাড়া তার বিরুদ্ধে পাসপোর্ট সংক্রান্ত জালিয়াতির অভিযোগও তদন্তাধীন রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সরকারি উচ্চপদে দায়িত্ব পালন করলেও তিনি বিভিন্ন সময়ে ব্যক্তিগত চাকরিজীবী পরিচয় ব্যবহার করে সাধারণ পাসপোর্ট সংগ্রহ করেছেন। সংশ্লিষ্ট পাসপোর্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও এ ঘটনায় মামলা করা হয়েছে।

দুদকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন জেলায় বেনজীর আহমেদ ও তার পরিবারের নামে বিপুল পরিমাণ জমি, বাড়ি ও অন্যান্য সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেছে। ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর এবং বান্দরবানসহ বিভিন্ন এলাকায় শত শত বিঘা জমির তথ্য অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। পাশাপাশি বিদেশেও তার সম্পদের খোঁজ পাওয়া গেছে বলে দাবি করেছে সংস্থাটি।

বিজ্ঞাপন

দুবাইয়ে অবস্থিত দুটি ফ্ল্যাট এবং কয়েকটি ব্যাংক হিসাবও এরই মধ্যে জব্দ করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এসব সম্পদের উৎস এবং মালিকানা সম্পর্কেও তদন্ত চলছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জাতীয় সংসদে দেওয়া এক বক্তব্যে জানান, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর বেনজীর আহমেদকে আইনের আওতায় আনতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হয়। ইন্টারপোলের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগের মাধ্যমে রেড নোটিশ জারি এবং পরবর্তী গ্রেপ্তার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, গত ১২ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাতের এনসিবি আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশকে অবহিত করে যে বেনজীর আহমেদকে সেখানে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তিনি বর্তমানে আমিরাতের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে রয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রত্যর্পণ সংক্রান্ত সব নথি যথাযথভাবে প্রস্তুত করে পাঠানো। আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া সফলভাবে সম্পন্ন হলে সাবেক এই পুলিশ প্রধানকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারিক কার্যক্রমের মুখোমুখি করা সম্ভব হতে পারে।

বর্তমানে দুদক, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ সদরদপ্তরের এনসিবি এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সমন্বিতভাবে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ার প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি এগিয়ে নিচ্ছে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD