অবশেষে ঢাকার সড়ক থেকে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে অটোরিকশা

রাজধানী ঢাকার প্রধান সড়কগুলো থেকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা সরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে নীতিগতভাবে এগোচ্ছে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং সড়কে চলাচল আরও নিয়ন্ত্রিত করার লক্ষ্যে এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে আগামী মাসে সরকারের উচ্চপর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যেখানে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
বিজ্ঞাপন
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, রাজধানীর সড়কে অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচল দীর্ঘদিন ধরেই ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে সম্প্রতি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিনির্ভর ক্যামেরা স্থাপনের পর অন্যান্য যানবাহনের মধ্যে ট্রাফিক আইন মানার প্রবণতা বাড়লেও অটোরিকশার ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন দেখা যায়নি।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের সঙ্গে একাধিক দফা আলোচনা হয়েছে। এসব বৈঠকে রাজধানীর ট্রাফিক পরিস্থিতি, অটোরিকশার সংখ্যা, আইন অমান্যের প্রবণতা এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির সীমাবদ্ধতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। যদিও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আলোচনায় থাকায় এখনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়নি, তবে প্রধান সড়কগুলো থেকে অটোরিকশা অপসারণের বিষয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং পুলিশ প্রশাসন উভয়ই রাজধানীর প্রধান সড়কগুলোতে অটোরিকশা চলাচল সীমিত বা বন্ধ করার পক্ষে মত দিয়েছে। তবে চূড়ান্ত অনুমোদন সরকারের উচ্চপর্যায় থেকেই আসবে। এ বিষয়ে সম্ভাব্য বৈঠক আগামী মাসের মাঝামাঝি সময়ে অনুষ্ঠিত হতে পারে।
সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সবুজ সংকেত মিললে প্রথম ধাপে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ত সড়কগুলো থেকে অটোরিকশা সরানো হবে। পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে রাজধানীর অন্যান্য এলাকাতেও নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা কার্যকর করা হতে পারে। সম্ভাব্য সিদ্ধান্তের পর নগরবাসীকে অবহিত করতে গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশেরও পরিকল্পনা রয়েছে।
ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, রাজধানীতে এআই ক্যামেরা চালুর ফলে সড়কে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে। ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য, উল্টো পথে গাড়ি চালানো, লেন পরিবর্তনের অনিয়ম এবং স্টপলাইন লঙ্ঘনের মতো অপরাধ আগের তুলনায় কমেছে। প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির মাধ্যমে আইন ভঙ্গকারী যানবাহনের বিরুদ্ধে দ্রুত ই-প্রসিকিউশনও করা যাচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
তবে অটোরিকশার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এসব যানবাহনের বড় অংশের নিবন্ধন নেই, নম্বরপ্লেট নেই এবং অনেক চালকের বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্সও নেই। ফলে ক্যামেরায় অপরাধ শনাক্ত হলেও পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা গ্রহণে জটিলতা তৈরি হচ্ছে। এ কারণে প্রযুক্তিনির্ভর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার সুফল পুরোপুরি পাওয়া যাচ্ছে না।
ডিএমপির সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অটোরিকশার বেপরোয়া চলাচল, উল্টো পথে প্রবেশ, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা এবং ট্রাফিক আইন অমান্যের প্রবণতা এখনও উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। ট্রাফিক বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীতে বর্তমানে যে বিপুলসংখ্যক অটোরিকশা চলাচল করছে, তা নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে সড়কে কাঙ্ক্ষিত শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা কঠিন হবে।
সংশ্লিষ্টরা আরও বলছেন, বিষয়টি শুধু যানজট বা ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অটোরিকশাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধরনের অপরাধ সংঘটনের অভিযোগও রয়েছে। ফলে সড়ক ব্যবস্থাপনা ও জননিরাপত্তা—দুই দিক বিবেচনায়ই কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করছে ট্রাফিক বিভাগ।
বিজ্ঞাপন
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিসুর রহমান জানিয়েছেন, সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে অটোরিকশার বিষয়টি আলোচনায় আসে। তবে সময়ের সীমাবদ্ধতার কারণে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা সম্ভব হয়নি। সরকারের উচ্চপর্যায়ে পরবর্তী বৈঠকে এ বিষয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হবে এবং সেখানেই সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
তিনি বলেন, সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে ঢাকার প্রধান সড়কগুলো থেকে অটোরিকশা সরিয়ে দেওয়া হবে। অতীতে যেমন কিছু সড়কে রিকশা চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিল, তেমনি প্রয়োজন অনুযায়ী অটোরিকশার ক্ষেত্রেও ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। তবে জনবল ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে শতভাগ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা সবসময় সহজ নয়।
বিজ্ঞাপন
সম্প্রতি রাজধানীর বিভিন্ন ব্যস্ত এলাকায় দেখা গেছে, এআই ক্যামেরার নজরদারির কারণে বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেল চালকদের মধ্যে নিয়ম মেনে চলার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু অনেক অটোরিকশা এখনও সিগন্যাল অমান্য করে, উল্টো পথে চলে এবং যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা করায় সড়কে বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে।
মাঠপর্যায়ের ট্রাফিক কর্মকর্তাদের মতে, বড় যানবাহনের নিবন্ধন ও মালিকানার তথ্য সহজলভ্য হওয়ায় প্রযুক্তির মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু অটোরিকশার ক্ষেত্রে সেই সুযোগ সীমিত। ফলে প্রতিনিয়ত পৃথক অভিযান পরিচালনা করতে হচ্ছে, যা বিদ্যমান জনবল দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে কার্যকরভাবে পরিচালনা করা কঠিন।
ডিএমপির কর্মকর্তারা মনে করছেন, শুধু পুলিশি অভিযান নয়, অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে সরকারি, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পর্যায়ের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। সেই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে অল্প সময়ের মধ্যেই রাজধানীর প্রধান সড়কগুলোতে আরও সুশৃঙ্খল ট্রাফিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে।








