Logo

ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও মিলছে না সিএনজি গ্যাস

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১৩ আগস্ট, ২০২৬, ২০:০৭
ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও মিলছে না সিএনজি গ্যাস
ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীর বিভিন্ন সিএনজি স্টেশনে গ্যাসের সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে অপেক্ষা করেও প্রয়োজনীয় গ্যাস না পাওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েছেন সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ব্যক্তিগত গাড়ি ও অ্যাম্বুলেন্স চালকরা। দীর্ঘ সময় গ্যাস সংগ্রহে চলে যাওয়ায় যাত্রী পরিবহন কমে যাওয়ার পাশাপাশি আয়ও কমেছে চালকদের।

বিজ্ঞাপন

বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) রাজধানীর মগবাজারের একটি সিএনজি স্টেশনে এমন চিত্র দেখা যায়। দুপুর ১২টার দিকে গ্যাসের জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক রিপন মিয়া। বিকেল সাড়ে ৩টা নাগাদও তার গাড়িতে গ্যাস নেওয়া সম্ভব হয়নি।

রিপন মিয়ার অভিযোগ, ভিআইপি ও সরকারি গাড়ি স্টেশনে এলে সেগুলোকে দ্রুত গ্যাস সরবরাহ করা হয়। অন্যদিকে সাধারণ চালকদের দীর্ঘ সময় লাইনে অপেক্ষা করতে হয়।

তিনি বলেন, প্রতিদিন শুধু গ্যাস সংগ্রহ করতেই ছয় থেকে সাত ঘণ্টা সময় চলে যাচ্ছে। এতে দিনের বড় একটি সময় যাত্রী পরিবহনের বাইরে থাকতে হচ্ছে। ফলে আয় কমলেও গাড়ির মালিককে নির্ধারিত জমার টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

গ্যাসের লাইনে কাটছে কর্মঘণ্টা

রিপন মিয়ার ভাষ্য, সকালে গ্যারেজ থেকে গাড়ি বের করার পরই তার প্রথম চিন্তা থাকে কোথা থেকে এবং কখন গ্যাস পাওয়া যাবে। এরপর মালিকের দৈনিক জমা, জ্বালানি খরচ ও অন্যান্য ব্যয় মিটিয়ে দিন শেষে হাতে কত টাকা থাকবে—এসব হিসাব করতে হয়।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

তার পাশে অপেক্ষা করছিলেন আরেক চালক আনিসুর রহমান। তিনি জানান, গ্যাসের সংকটে আগের তুলনায় কম যাত্রী পরিবহন করতে পারলেও প্রতিদিন মালিককে ১ হাজার ১০০ টাকা জমা দিতে হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

তার দাবি, জমার টাকা কম দেওয়ার কথা বললে মালিক গাড়ির চাবি রেখে চলে যেতে বলেন। ফলে গ্যাসের জন্য দীর্ঘ সময় নষ্ট হলেও নির্ধারিত জমা দেওয়ার চাপ থেকে চালকদের কোনো ছাড় নেই।

শুধু মগবাজার নয়, সংকট রাজধানীজুড়ে

চালকদের ভাষ্য অনুযায়ী, মগবাজারের পাশাপাশি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার সিএনজি স্টেশনেও একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। অনেক স্টেশনে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ির দীর্ঘ সারি তৈরি হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

কোথাও কোথাও কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষার পরও চালকরা কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ গ্যাস পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করছেন। গ্যাস সংগ্রহে দীর্ঘ সময় চলে যাওয়ায় একদিকে যেমন চালকদের আয় কমছে, অন্যদিকে সড়কে যাত্রী পরিবহনের জন্য পর্যাপ্ত সিএনজি অটোরিকশাও পাওয়া যাচ্ছে না।

এর প্রভাব পড়ছে সাধারণ যাত্রীদের ওপরও। বিশেষ করে সকালে অফিস ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগামী এবং সন্ধ্যায় কর্মস্থল থেকে ঘরমুখী মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে।

বাড়তি ভাড়া নেওয়ার অভিযোগ

বিজ্ঞাপন

গ্যাসের সংকটে অনেক সিএনজি অটোরিকশা দীর্ঘ সময় স্টেশনে আটকে থাকায় সড়কে চলাচলকারী গাড়ির সংখ্যা কমে যাচ্ছে। এতে যাত্রীরা গাড়ি পেতে সমস্যায় পড়ছেন।

কয়েকজন যাত্রীর অভিযোগ, স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া দিতে হচ্ছে। গাড়ির সংকটের সুযোগে কিছু চালক অতিরিক্ত ভাড়া দাবি করছেন বলেও তারা জানান।

অ্যাম্বুলেন্স চলাচলেও প্রভাব

বিজ্ঞাপন

গ্যাস সংকটের প্রভাব শুধু গণপরিবহন বা ব্যক্তিগত যানবাহনে সীমাবদ্ধ নেই। জরুরি রোগী পরিবহনে ব্যবহৃত অ্যাম্বুলেন্সও সমস্যায় পড়ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

অ্যাম্বুলেন্সচালক নুরু মিয়া বলেন, গ্যাসের অভাবে অনেক অ্যাম্বুলেন্স ঢাকার বাইরে দূরপাল্লার রোগী পরিবহনে যেতে পারছে না। পর্যাপ্ত গ্যাস না থাকায় কিছু অ্যাম্বুলেন্স বসিয়ে রাখতে হচ্ছে।

তার মতে, অ্যাম্বুলেন্সের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা করে ২৪ ঘণ্টা গ্যাস সরবরাহের সুযোগ রাখা হলে জরুরি রোগীদের পরিবহন আরও কার্যকরভাবে করা সম্ভব হবে।

বিজ্ঞাপন

গ্যাসের সংকটের কারণে দূরপাল্লার ট্রিপ এড়িয়ে চলতে হচ্ছে বলেও জানান তিনি। এতে রোগী ও তাদের স্বজনদের সরাসরি ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।

বাসাবাড়িতেও কমেছে গ্যাসের চাপ

রাজধানীর সিএনজি স্টেশনগুলোর পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় বাসাবাড়িতেও গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে এর প্রভাব শিল্প খাতেও পড়তে পারে। বিশেষ করে গ্যাসনির্ভর শিল্পপ্রতিষ্ঠানে উৎপাদন ব্যাহত হলে সরবরাহ ব্যবস্থার পাশাপাশি রপ্তানিমুখী শিল্পের কার্যক্রমেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সরবরাহ কমার তথ্য

সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিক সময়ে এলএনজি টার্মিনাল থেকে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক গড়ে প্রায় ১ হাজার ঘনমিটার গ্যাস সরবরাহ করা হলেও বর্তমানে তা প্রায় ৫০০ ঘনমিটারে নেমে এসেছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

তবে সরবরাহ কমে যাওয়ার সুনির্দিষ্ট কারণ নিয়ে বিভিন্ন ধরনের আলোচনা রয়েছে। চালকদের কেউ কেউ গ্যাসের দাম বাড়ানোর সম্ভাবনা এবং সরবরাহ নিয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে টানাপোড়েনকে সংকটের কারণ হিসেবে দেখছেন।

আবার কয়েকজন চালক গ্যাস সরবরাহের পেছনে একটি সিন্ডিকেট কাজ করছে বলেও অভিযোগ করেছেন। দাম বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে দর-কষাকষির কারণে সরবরাহ স্বাভাবিক হচ্ছে না বলেও কেউ কেউ দাবি করেছেন।

তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

দ্রুত সমাধান চান চালকরা

গ্যাস সংকট দ্রুত সমাধানে সরকারের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন চালকরা। তাদের দাবি, সিএনজি স্টেশনগুলোতে সরবরাহ স্বাভাবিক করার পাশাপাশি অ্যাম্বুলেন্সসহ জরুরি সেবার যানবাহনের জন্য পৃথক গ্যাস সরবরাহের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে সংকট নিরসনে নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা এবং স্টেশনগুলোতে গ্যাস বিতরণ ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনার দাবিও জানিয়েছেন তারা।

চালকদের মতে, গ্যাসের জন্য প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হলে শুধু তাদের আয়ই কমবে না, এর প্রভাব পড়বে রাজধানীর যাত্রী পরিবহন, জরুরি রোগী সেবা এবং সামগ্রিক নগরজীবনের ওপরও।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD