আরও ১৭ পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠাচ্ছে সরকার

আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক আনুগত্য, পারিবারিক রাজনৈতিক সম্পর্ক, নির্বাচনে অনিয়মে সম্পৃক্ততা, বিরোধী দল দমনে ভূমিকা এবং বিভিন্ন ধরনের দুর্নীতির অভিযোগে আরও ১৭ জন জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
বিজ্ঞাপন
সরকারি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ওই ১৭ কর্মকর্তার নাম প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠিয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুমোদন চেয়ে পাঠানো নথির ভিত্তিতে শিগগিরই প্রজ্ঞাপন জারি হতে পারে। সংশ্লিষ্ট একটি উচ্চপর্যায়ের সূত্র জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার কিংবা আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক আদেশ প্রকাশ হতে পারে।
বাধ্যতামূলক অবসরের জন্য বিবেচনায় থাকা কর্মকর্তারা সবাই ২০০১ সালের ৩১ মে পুলিশ ক্যাডারে যোগ দেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন তিনজন উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি), ১২ জন অতিরিক্ত ডিআইজি, একজন পুলিশ সুপার (এসপি) এবং একজন উপকমিশনার (ডিসি)।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, অধিকাংশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়া, দলীয় প্রভাব ব্যবহার করে পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন নিশ্চিত করা এবং প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে ও পরে বিরোধী রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার, হয়রানি, গুম এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনায় সম্পৃক্ততার অভিযোগও কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আনা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
তিন নারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, অতিরিক্ত ডিআইজি রেবেকা সুলতানা ও জেসমিন বেগম ২০১৮ সালে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের বাসভবন থেকে খালেদা জিয়াকে জোরপূর্বক বের করে দেওয়ার ঘটনায় ভূমিকা রাখেন।
এ ছাড়া ২০১৮ সালে একটি মামলায় দণ্ডিত হওয়ার পর আদালত থেকে কারাগারে নেওয়ার সময় খালেদা জিয়ার গাড়ির ভেতরে যুগ্ম পুলিশ কমিশনার ফরিদা ইয়াসমিন দায়িত্ব পালন করেছিলেন বলেও নথিতে উল্লেখ রয়েছে। একই সঙ্গে ডিএমপিতে কর্মরত অবস্থায় বিরোধী দলের বিরুদ্ধে পরিচালিত বিভিন্ন অভিযানে অংশ নেওয়ার অভিযোগও তার বিরুদ্ধে আনা হয়েছে।
রেবেকা সুলতানার বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ করা হয়েছে যে, তিনি রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য পলাতক আওয়ামী লীগ নেতাদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। পাশাপাশি তিনি সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন বলেও নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
ডিআইজি মোহাম্মদ আবদুল্লাহীল বাকীর বিরুদ্ধে অভিযোগ, পুলিশ সদর দপ্তরের গোপন শাখায় দায়িত্ব পালনকালে টেলিফোনে আড়ি পেতে বিরোধী দলের নেতাদের তথ্য সংগ্রহ করে তা অন্যত্র সরবরাহ করতেন। একইভাবে অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ সারোয়ার হোসেন ও বিধান ত্রিপুরার বিরুদ্ধে ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে দমন-পীড়নের অভিযোগ আনা হয়েছে।
বিধান ত্রিপুরার বিরুদ্ধে মানিকগঞ্জের পুলিশ সুপার থাকাকালে নির্বাচনী অনিয়মে সহায়তার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, ওই ভূমিকার জন্য তিনি পরবর্তীতে পুলিশের পদক লাভ করেন।
অতিরিক্ত ডিআইজি সোহেলী ফেরদৌসের বিরুদ্ধে ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময় পুলিশ সদর দপ্তরের কন্ট্রোল রুম থেকে ভোট কারসাজিতে সহায়তার অভিযোগ আনা হয়েছে। পাশাপাশি এআইজি (মিডিয়া) হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় ১৫ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ একটি তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে বলেও নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মাদক পাচার, আর্থিক অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং পেশাগত অসদাচরণের অভিযোগও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সাবেক কক্সবাজার পুলিশ সুপার ও অতিরিক্ত ডিআইজি এ কে এম ইকবাল হোসেনের বিরুদ্ধে ইয়াবা পাচারে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি নিজের ব্যবহৃত গাড়িতে ইয়াবার চালান পরিবহনে সহযোগিতা করেছিলেন।
ডিআইজি মো. ওয়ালিদ হোসেনের বিরুদ্ধে ডিএমপিতে দায়িত্ব পালনকালে বিরোধী দলের ওপর দমন-পীড়ন চালানোর পাশাপাশি পিরোজপুরের পুলিশ সুপার থাকাকালে দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
এসপি আবদুর রহিম শাহ চৌধুরীর বিরুদ্ধে একটি দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হওয়ার বিষয়টি নথিতে উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকজন কর্মকর্তাকে দুর্নীতিগ্রস্ত, সুবিধাবাদী অথবা পেশাগতভাবে অযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
নথিতে আরও বলা হয়েছে, অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ তবারক উল্লাহ, মো. হাবিবুর রহমান, ফয়সাল মাহমুদ এবং এসপি আবদুর রহিম শাহ চৌধুরীকে ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে ২০০২ সালে চাকরি থেকে অপসারণ করা হয়েছিল। পরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তারা পুনরায় চাকরিতে ফিরেছিলেন।
ডিআইজি সানা শামীনুর রহমান সম্পর্কে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তিনি ইসলামী ছাত্রশিবিরের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে নিজেকে ছাত্রলীগ-সমর্থক হিসেবে উপস্থাপন করে পদোন্নতি নিয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ছাড়া অতিরিক্ত ডিআইজি হাসিনা রহমান, কানিজ ফাতেমা এবং সুলতানা নাজমা হোসেনের পরিবারের রাজনৈতিক পরিচয়ও নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের প্রাপ্ত পদক এবং সরকারি অর্থায়নে বিদেশ সফরের তথ্যও সংযুক্ত করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
এর আগে একই ধরনের প্রক্রিয়ায় সরকার ৩৩ জন জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায়। এর মধ্যে গত ৩ মে ১৭ জন এবং ২২ এপ্রিল ১৩ জন কর্মকর্তাকে একই বিধানের আওতায় অবসরে পাঠানো হয়েছিল। নতুন করে আরও ১৭ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগের মাধ্যমে এ ধরনের প্রশাসনিক পদক্ষেপের পরিধি আরও বিস্তৃত হতে যাচ্ছে।








