Logo

গণভবনের শেষ কৌশলও ঠেকাতে পারেনি ৫ আগস্টের জনজোয়ার

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
৫ আগস্ট, ২০২৬, ১৪:৫৫
গণভবনের শেষ কৌশলও ঠেকাতে পারেনি ৫ আগস্টের জনজোয়ার
ছবি: সংগৃহীত

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের শেষ পর্যায়ে ছাত্র-জনতার ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঠেকাতে গণভবনে একাধিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক ও কৌশল নির্ধারণ করা হলেও শেষ পর্যন্ত তা ব্যর্থ হয়।

বিজ্ঞাপন

আজ (৫ আগস্ট) সেই ঘটনার দুই বছর পূর্ণ হলো। এই সময়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপিত বিভিন্ন সাক্ষ্য ও নথিতে আন্দোলনের শেষ কয়েক দিনের ঘটনাপ্রবাহের নানা দিক প্রকাশ্যে এসেছে।

রাজসাক্ষ্যে সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন জানান, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই থেকে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বাসভবনে নিয়মিত একটি কোর কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হতো। এসব বৈঠকে সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকতেন। সেখানে আন্দোলনের পরিস্থিতি মোকাবিলা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন কৌশল নিয়ে আলোচনা হতো। তার দাবি, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের আটকের প্রস্তাবও ওই বৈঠকগুলোতে উঠে এসেছিল।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

আদালতে দেওয়া সাবেক পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের রাজসাক্ষ্য এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপিত বিভিন্ন সাক্ষ্য ও তথ্য অনুযায়ী, আন্দোলন দমনে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সর্বোচ্চ পর্যায়ে ধারাবাহিক পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। তবে ৫ আগস্ট রাজধানীতে ছাত্র-জনতার ব্যাপক সমাগমের মুখে শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে এবং তিনি দেশ ত্যাগ করেন।

বিজ্ঞাপন

তিনি আরও জানান, ৪ আগস্ট সকালে গণভবনে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে নিরাপত্তা সমন্বয় কমিটির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, তিন বাহিনীর প্রধান, গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাসহ মোট ২৭ জন উপস্থিত ছিলেন। সেখানে চলমান আন্দোলন দমন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।

রাজসাক্ষ্যে উল্লেখ করা হয়, একই দিন রাতে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠায় আবারও গণভবনে জরুরি বৈঠক ডাকা হয়। সেই বৈঠকে শেখ হাসিনার পাশাপাশি শেখ রেহানা, তিন বাহিনীর প্রধান, র‌্যাবের মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অংশ নেন। বৈঠকে ৫ আগস্ট ঘোষিত ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঠেকাতে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সমন্বিত মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে তিনি আদালতকে জানান।

চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন বলেন, বৈঠক শেষে তিনি সেনাবাহিনীর অপারেশন কন্ট্রোল রুমে যান। সেখানে রাজধানীর প্রবেশপথগুলোতে অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত হয়। তবে ৫ আগস্ট সকাল থেকেই উত্তরা, যাত্রাবাড়ী, সাভার, গাজীপুরসহ বিভিন্ন দিক থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষ ঢাকায় প্রবেশ করতে থাকেন। পরে তিনি জানতে পারেন, দুপুরের মধ্যেই শেখ হাসিনা আর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকবেন না।

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া সাক্ষ্যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক ও বর্তমান বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম আন্দোলনের অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতির কথাও তুলে ধরেন।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, ৩ আগস্ট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সরকার পতনের এক দফা ঘোষণা এবং দেশব্যাপী অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়। এরপর ৪ আগস্ট শাহবাগের কর্মসূচি থেকে প্রথমে ৬ আগস্ট ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঘোষণা করা হলেও পরে তা একদিন এগিয়ে ৫ আগস্ট নির্ধারণ করা হয়। তিনি আদালতে বলেন, আন্দোলনের সমন্বয়কদের হত্যা বা গুমের আশঙ্কা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার সম্ভাবনার তথ্য পাওয়ার পরই কর্মসূচির তারিখ পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, আন্দোলন সফল করতে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছিল। পাশাপাশি সম্ভাব্য নতুন সরকার গঠন নিয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে আলোচনা এবং তাকে সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়ার বিষয়টিও আদালতে উল্লেখ করেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

৫ আগস্ট ভোর থেকেই দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে হাজার হাজার মানুষ রাজধানীর উদ্দেশে রওনা হন। বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাধা ও গুলির ঘটনাও ঘটে বলে বিভিন্ন সাক্ষ্যে উঠে এসেছে। তবে একপর্যায়ে রাজধানীর বিভিন্ন সড়ক জনসমুদ্রে পরিণত হয় এবং শাহবাগ থেকে গণভবনের দিকে বিশাল মিছিল অগ্রসর হয়।

এই পরিস্থিতির মধ্যেই শেখ হাসিনা গণভবন ত্যাগ করে হেলিকপ্টারযোগে দেশ ছাড়েন। তার সঙ্গে ছিলেন শেখ রেহানাও। এরপর রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মানুষ বিজয় উদযাপন করে এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বাস্তবতার সূচনা হয়।

জুলাই-আগস্টের ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরবর্তীতে পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু হয়। ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপিত তদন্ত প্রতিবেদন, সাক্ষ্য ও বিভিন্ন নথিতে আন্দোলন দমনে তৎকালীন সরকারের পদক্ষেপ, প্রশাসনের ভূমিকা এবং ৪ ও ৫ আগস্টের ঘটনাবলির বিস্তারিত বিবরণ উঠে এসেছে। একই সঙ্গে আন্দোলনের নেতৃত্ব কীভাবে পরিস্থিতি বিবেচনায় নিজেদের কৌশল পরিবর্তন করেছিল এবং শেষ পর্যন্ত কীভাবে জনসমর্থনের ঢেউ সৃষ্টি হয়েছিল, সে বিষয়েও আদালতে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উপস্থাপিত হয়েছে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD